পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।

বক্তার লেখক বা কথক সুলভ আধিপত্য প্রায়ই পরোক্ষ বাচনের স্বরবৈচিত্র্যে ধ্বস্ত হয়ে যায়। এই বক্তব্যকে ডস্টয়েভস্কি-সংক্রান্ত আলোচনায় বাখতিন আরো ব্যাপ্ত, গভীর ও শানিত করে তুলেছেন। সীমারেখায় ক্ষয় যেহেতু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাচনের ক্রমবর্ধমান। দ্বিবাচনিকতাকে স্বতঃসিদ্ধ করে, প্রতিবেদন হয়ে ওঠে দ্বিস্বরিক। একই ধরনের শব্দবিন্যাসে দুটি ভিন্ন প্রকাশযুক্ত কথনক্রিয়ার উপস্থিতি আভাসিত হয় তখন। বাখতিন যেহেতু টলষ্টয়ের তুলনায় ডস্টয়েভস্কিকে উপন্যাস নামক শিল্পরূপের সার্থকতর স্থপতি বলে মনে করেন, ঐ দ্বিস্বরিক প্রতিবেদনকে তিনি প্রিয় ঔপন্যাসিকের সৃজনশীল নির্মিতির প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বস্তুত ‘Marxism and the Philosophy of Language’ বইতে বাখতিনের ধারাবাহিক চিন্তা পরিণতির একটি পর্যায় সমাপ্ত করল যেন। তিনি এই প্রত্যয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন যে প্রতিবেদন ও চেতনার মৌল স্বভাব দ্বিবাচনিক। জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের সমান্তরাল অভিব্যক্তি লক্ষ করতে করতে তিনি এবার তার প্রত্যয়কে উপন্যাসের প্রকরণ বিশ্লেষণে প্রয়োগ করলেন। ডস্টয়েভস্কির আখ্যান-প্রকরণের লক্ষণীয় অভিনবত্ব থেকে নন্দনসূত্র আবিষ্কার করতে গিয়ে বাখতিন নতুন একটি পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করেছেন: ‘বহুস্বরসঙ্গতি’ (polyphony)। সমস্ত প্রতিবেদনের বহুস্বরিকতা সম্পর্কে ডস্টয়েভস্কির তীক্ষ্ণ সচেতনতা পর্যবেক্ষণ করেই তিনি এই পরিভাষার গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুভব করেন। তিনি জানিয়েছেন, ডস্টয়েভস্কি চিত্রিত পাত্র-পাত্রীর প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি চিত্তা অন্তর্বৃতভাবে দ্বিবাচনিক, নানা ধরনের বাচনে তারা অভ্যস্ত, তাদের অস্তিত্ব সংঘর্ষে পূর্ণ। মনে হয় যেন লেখক উপন্যাসশিল্পের নিজস্ব ভাষায় চেতনার সমাজতন্ত্র নির্মাণ করেছেন। বিশেষভাবে তাঁর প্রধান চরিত্রেরা অসমাপ্য দিবাচনিক প্রক্রিয়ার শরিক হয়ে বিষয় ও আঙ্গিকের অবিচ্ছেদ্যতাকে প্রমাণ করেছে। সেই সঙ্গে উপন্যাসের অনেকান্তিকতা কোনো ধরনের বদ্ধ সমাপ্তির অসম্ভাব্যতাকেও দেখিয়ে দিচ্ছে।

 একদিকে দ্বিবাচনিক মুক্ত সমাপ্তি আর অন্যদিকে চেতনার ভাবাদর্শগত ভিত্তি: এই দুটি দিক বাখতিন লক্ষ করেছেন ডস্টয়েভস্কির উপন্যাসে। তাঁর মতে, এই মহান লেখকের প্রতিটি চরিত্রের শেকড় ভাবাদর্শে প্রোথিত; তাদের বিশ্ববীক্ষা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অভিন্ন। ঐসব চরিত্রের সামাজিক বীক্ষণে জীবনের নিভৃত মুহূর্তও স্পন্দিত হয়েছে। আসলে ডস্টয়েভস্কি তাঁর যুগের মধ্যে নিহিত দেখেছেন বিভিন্ন ভাবাদর্শবাহী উচ্চারণের আবেগত সংঘর্ষ। লক্ষ করেছেন বিপুল দ্বিবাচনিক প্রক্রিয়ার ছায়ায় সমকালের সমস্ত পরিসর আকীর্ণ। ব্যক্তি ও সমাজের পার্থক্য এবং সমান্তরালতা জনিত মিথস্ক্রিয়ায়—‘he heard both the land, recognised reigning voices of the epoch, that is, the reigning dominant ideas (official and unofficial), as well as voices still weak, ideas not yet fully emerged, latent ideas heard as yet by no one but himself, and ideas which just beginning to ripen, embryos of future world-views.’ (১৯৮৪: ৯০)। এখানে যেমন ‘বহুস্বরসঙ্গতি’ আর বিভিন্ন স্বরের দ্বিবাচনিক সংঘর্ষ বিষয়ক ধারণাকে ব্যবহার করে উপন্যাস-আলোচনার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন বাখতিন, তেমনি ‘Discourse in the Novel’ নামক পরবর্তী বিখ্যাত নিবন্ধে তিনি আরো কিছু নতুন তত্ত্ববীজ উত্থাপন করেছেন। এই

৪০