পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী.pdf/১০৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

চরিত্রমাহাত্ম্য

৯৫

যখন কাশীধামে যাত্রা করিলেন, তখন আবাল বৃদ্ধ বনিতা এমন কি গৃহস্থের কুলবধুগণ পর্যন্তও কিরুপ ব্যাকুলভাবে ক্রন্দন করিতে করিতে বীরসিংহের উপকণ্ঠস্থিত প্রান্তর পর্য্যন্ত তাঁহার অনুসরণ করিয়াছিলেন, সে দৃশ্য যিনি স্বচক্ষে দেখিয়াছেন, তিনিই উপলব্ধি করিতে পারিয়াছেন যে, বিশ্বপ্রেমের প্রতিদান এই বিশ্বেই রহিয়াছে! যিনি জগতের জন্য ক্রন্দন করেন, জগৎও তাঁহার জন্য ক্রন্দন করে! তাঁহার বিচ্ছেদ সহ্য করিতে পারে না!

 সত্য সত্যই ভগবতী মা আনন্দময়ীরূপে বীরসিংহে বিরাজমান ছিলেন। লোকের মুখে শষ্ক দেখিলে, তাঁহার হৃদয় বিগলিত হইত। নিরানন্দের ছায়া বিশ্ব হইতে বিলপ্ত হউক! বিশ্ব আনন্দে ভাসমান হউক!-বিশ্ব হাস্যে উদ্ভাসিত হউক!—এ আকাঙ্ক্ষা বিশ্বমাতার হৃদয়েই সম্ভবে! ধন্য ভগবতী দেবী! ধন্য তোমার বিশ্বপ্রেম!-ধন্য তোমার জীবসেবা।


ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ॥ চরিমাহাত্ম্য

 চরিত্রই মানব জীবনের মুকুটস্বরূপ। বিদ্যাবল ও ধনবল অপেক্ষা চরিত্রবলই শ্রেষ্ঠ। চরিত্রবান ব্যক্তি নীচকুলোদ্ভব হইলেও চরিত্রগুণে উচ্চকুলমর্য্যাদা লাভ করিয়া থাকেন। তিনি সম্পদবিহীন হইলেও লোকানুরাগরূপ অপার্থিব সম্পত্তি লাভ তাঁহারই ভাগ্যে ঘটে। ধন, মান অপেক্ষা চরিত্রের প্রাধান্যই অধিক।

 লোকের প্রবৃত্তি, সংসর্গ ও ব্যবহার আলোচনা করিলে তাহার চরিত্র নিণীত হয়। কোন্ ব্যক্তির চরিত্র কিরূপ, তাহা জানিতে হইলে তাহার কার্য্যকলাপের অনুসন্ধান প্রয়োজন। জনসমাজে উন্নতি লাভের যত উপায় আছে, বা থাকিতে পারে, চরিত্রবলই তন্মধ্যে প্রধান।

 জ্ঞানই বল, ইহা চিরন্তন সত্য। কিন্তু জ্ঞানবল অপেক্ষা চরিত্রবলই শ্রেষ্ঠ। যাহার হৃদয় আছে, অথচ সহৃদয়তা নাই; প্রতিভা আছে, সরলতা নাই; কার্য্যনৈপুণ্য আছে অথচ সাধুতা নাই; তাহার ঈদৃশ হৃদয়, প্রতিভা ও কার্য্যনিপুণতা দ্বারা জনসমাজের কি ইষ্ট সাধিত হইতে পারে? যাঁহার চিত্তে সরলতা, ধর্ম্মে অনুরাগ, গুরুজনে ভক্তি, আচরণে বিনয়, পরনিন্দায় বিরক্তি, পরোপকারে প্রবৃত্তি, মিথ্যাচরণে অশ্রদ্ধা, সর্ব্বজনে সমভাব আছে, তিনিই সচ্চরিত্র। সচ্চরিত্রের প্রতি অনুরাগ ও অসচ্চরিত্রের প্রতি বিরাগ আমাদের স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম্ম।

 চরিত্রের পবিত্রতার রক্ষা করা মানবের অবশ্যকর্তব্য কর্ম্ম। সাধুজন-প্রশংসনীয় কার্য্যকে কর্ত্তব্যকর্ম্ম কহে। কর্ত্তব্যপালনেই চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষিত হয়। কর্তব্যপালন করিতে হইলে, আত্মসংযমের প্রয়োজন, আত্মসংযম না থাকিলে লোক উচ্ছৃঙ্খল হইয়া থাকে; সুতরাং চরিত্রবান্ হইতে হইলে আত্মসংযম অভ্যাস করা