পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/১০৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবযান br) পৃথিবী ছেড়ে বাইরের আকাশের তলায় এসে সে দেখলে শূন্তপথের সাধারণ চলাচলের মার্গগুলি একেবারে জনশূন্য। কেউ কোথাও নেই। যতীন একটু বিক্ষিত হয়ে গেল। পৃথিবীর লোক না দেখতে পাক, কিন্তু অসীম ব্যোমের নানা স্থান দিয়ে বিশেষত ভূপৃষ্ঠ থেকে একশো দেড়শো গজের ওপর থেকেই মেঘপদবীর সমান্তরালে বা তদূর্ধে বহু পথ সীমা-সংখ্যাহীন অনন্তের দিকে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেচে। এই সব পথ কোনো বাধাধরা স্বরকি সিমেন্টের তৈরী রাস্ত নয়— আত্মিক জীব, দেব দেবী, উচ্চ জীবগণের গমনাগমন দ্বারা স্বনির্দিষ্ট একটা অদৃশ্ব জ্যোতিরেখা भॉएड्स | সাধারণত বিশ্বের এই রাজমার্গগুলিতে আত্মিক পুরুষেরা সর্বদা যাতায়াত করেন, কিন্তু আজ সেখানে একেবারে কেউ নেই-আরও ওপরে এসে যে স্থান ধুসরবর্ণ আত্মাদিগের অধিষ্ঠানভূমি, সেও জনহীন । যতীন বুঝতে পারলে না, এরকম ব্যাপারের কারণ কি । আজ এত বছর সে এসেচে আত্মিকলোকের তৃতীয় স্তরে—কিন্তু এমন অবস্থা সে দেখেনি কখনো । তার মনে যেন কেমন ভয়ের সঞ্চার হোল । অথচ কিসের ভয় সে নিজেই জানে না । যে একবার মরেচে, সে আর মরবে না, তবে ভয়টা কিসের ? হঠাৎ যতীন দেখলে একটি লোক যেন আতঙ্কে চারিদিকে চাইতে চাইতে ঝড়ের বেগে উড়ে দ্বিতীয় স্তরের আত্মিক লোক থেকে আরো উধ্বলোকের দিকে পালাচ্চে। পৃথিবী হোলে বল। চলতে লোকটা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্ত হয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটে পালাচ্চে। ব্যাপার কি ? এর নিশ্চয় কোনো গুরুতর কারণ আছে। যতীন তাকে কিছু বলতে গেল, কিন্তু তার পূর্বেই লোকটা অন্তৰ্হিত হোল—মনে হোল পলায়মান ব্যক্তি যেন হাতের ইঙ্গিতে তাকে কি বল্লে—কি বিষয়ে সাবধান করতে গেল । লোকটি অদৃষ্ঠ হবার কিছু পরেই যতীনের মনে হোল কী এক ভীষণ টানে তাকে নীচের দিকে যেন টেনে নিয়ে যাচ্চে। অতি ভীষণ সে টানের বেগ, তিমির-প্রসারক যেন কোন বিশাল চৌম্বক শক্তি জগৎব্রহ্মাও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তার জাল বিস্তার করেচে-যতীনের সামনে, পাশে, দূরে, চারিদিকে ঝড়ের মত কোথা থেকে সেই ভীষণ শক্তির লীলা এক মুহূর্তে ব্যাপ্ত হয়ে গেল। যতীন যেন ভীম আবর্তে তলাতল পাতালের অভিমুখে কোথায় চলেচে.তার জ্ঞান লোপ পেয়ে আসচে“কেবল এইটুকু সে লক্ষ্য করলে, শুধু সে নয়, ঝড়ের মুখে তার মত বহু জীবাত্মা কুটাের মত কোথায় চলেচে বিষম ঘূর্ণিপাকের টানে!, তারপর একটা আর্ত চীৎকার স্বর, এক কি বহু সম্মিলিত কণ্ঠের আর্তনাদ, যতীন ঠিক বুঝতে পারচে না, তার সংজ্ঞ, নেই, অতিপ্রাকৃত কী এক বিষম শক্তির-অমোঘ আকর্ষণ তাকে খেলার পুতুলে পরিণত করেচে. ভয়ানক অন্ধকার তার চারিদিকে, এই কি তলাতল পাতাল ? পৃথিবী কোথায়, বিশ্বব্রহ্মাও, চন্দ্র স্বর্য কোথায়, পুষ্প কোথায় ? করুণাদেবী কোথায়, হতভাগিনী আশা কোথায়—সব লুপ্ত, একেবারে ! কোন রসাঙলে সে চলেচে দুর্লভধ্য আকর্ষণে ।