পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


২১২ বিভূতি-রচনাবলী বকুনি খেতে হ'ল । সে সর্বদা নাকি থাকে অন্যমনস্ক, কি তাকে বলা হয় নাকি তার কানে যায় না—ইত্যাদি, তার বিরুদ্ধে বাড়ির লোকের অভিযোগ । শরৎ বুঝতে পারে না ওর দুঃখ । ঘরকন্না করে করে শরতের মন বসে গিয়েছে এই সংসারেই, যেমন তাদের বংশের পরোনো আমলের পাথরের থাম আর ভাঙা মাত্তিগুলো ক্ৰমশঃ মাটির ওপর চেপে বসতে বসতে ভেতরে সেধিয়ে যাচ্ছে ! উঠোনের রোদ এইসময় একটু পড়ল। রাজলক্ষয়ী বললে—চলো শরৎ-দি, একটু গিয়ে দীঘির ঘাটে বসি, বেশ ছায়া আছে গাছের—বেশ লাগে । শরৎ বললে, আমায় তো যেতেই হবে এ'টো বাসন মাজতে । চল ওখানে বসে গল্প করিস-—আমার কি হয়েছে জানিস—মুখ বাজে থেকে থেকে আরও মারা গেলাম । আচ্ছা তুই বল রাজলক্ষী, ভাল লাগে সকাল থেকে রাত দশটা অবধি ? কার সঙ্গে দটো কথা কই যে !—বাবা তো সব সময়েই বাইরে— —তুমি তো আবার এমন জায়গায় থাকো যে গায়ের কেউ আসতে পারে না।—এত দর আর এই বনের মধ্যিখানে । জানো শরৎ-দি, গায়ের বেী-ঝি এদিকে আসতে ভয় পায়, সাধনের বোঁ সেদিন বলছিল গড়বাড়িতে নাকি ভূত আছে— —সাধনের বৌয়ের মুন্ডু—ম্বর ! * —তোমার নাকি সয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া সে ভুতে তোমায় কিছু বলবে না। তুমি তো এই বংশের মেয়ে—রাজার মেয়ে । আমাদের মত গরীব-গরবো লোকদেরই বিপদ– ठ्-िश्– —মরবি কিস্ত মার খেয়ে আমার কাছে— কালো পায়রা দীঘির সান-বাঁধানো ভাঙা ঘাটের নিচু ধাপে বড় বড় গাছের ছায়া এসে পড়েছে পুকুরের জলে আর ঘাটের রানাতে ৷ ঘাটে ছাতিম আর অন্য অন্য গাছের ছায়া । বা-দিকে দুরে উত্তর দেউল, যদিও এখান থেকে দেখা যায় না—সামনে সেই ইটের ঢিবিটা । প্রভাস যেখান থেকে ইট নিয়ে গিয়েছে গ্রামের স্কুলের জন্যে । সামনে প্রকা’ড দীঘিটার নিথর কালো জল—জলের ওপর এখানে-ওখানে পান লস আর কলমির দাম, কোণের দিকে রাঙা নাললতার পাতা ভাসছে, যদিও এখন ওর ফুল নেই। শরৎ এ সময় রোজ বসে একাই বাসন মাজে । আজ রাজুলক্ষসীকে পেয়ে ভারি খুশী হয়েছে সে । এই ঘাটে বসে শরৎ কত স্বপ্ন দেখেছে—রোজ এই বাসন মাজবার সময়টি একা বসে বসে । নীল আকাশের তলায় ঠিক দর্পরের অলস স্তবধত ভরা ছাতিম-বন, ভাঙা ইটের রাশ আর কালো পায়রা দীঘির নিথর কালো জল—হয়তো কথনো কাক ডাকে কা-কা—কিংবা যেমন আজকাল ঘঘের সারাদপুর ধরে ডাকের বিরাম বিশ্রাম দেয় না । কি ভালই যে লাগে ! জীবনের যে একঘেয়েমির তুৰ্থা রাজলক্ষী বললে, শরৎ তা কখনো হয়তো সেভাবে বোঝে নি । এই গ্রামে এই গড়বাড়ির ইটের ভগ্নস্তপের মধ্যে সে জন্মেছে—এরই বাইরের অন্য কোন জীবনের সে কলপনা করতে পারে না । অন্ততঃ করতে পারতো না এতদিন । কিস্ত কি জানি, সম্প্রতি তার মনে কোথা থেকে বাইরের হাওয়া এসে লেগেছে—কালো দীঘির নিস্তরঙ্গ শাস্ত বক্ষ চঞ্চল হয়ে উঠেছে । প্রথমে এল তাদের অতিথিশালায় সেই বড়ো বামন, তার বাবার কাছে যে জেলার সীমানা দেখবার অপব্ব গল্প করেছিল । যা ছিল হাণবৎ আচল, অনড়—সেই নিৰিব’কার অতি শাস্ত অস্তিত্ত্বের মলে কোথায় যেন সে কি নাড়া দিয়ে গেল। তার এবং তার বাবার। বামনজ্যাঠা কত গল্প করতো তার রান্নাঘরে পি’ড়ি পেতে বসে বসে। বাইরের ঘরকন্না,