পাতা:বিভূতি রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড).djvu/২৯৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অসাধারণ সীতানাথ ডাক্তারের দোকানে বসিয়া ছিলাম। সকালবেলা । খবরের কাগজ এখনো আসিয়। পৌছে নাই—কারণ মফঃস্বল জায়গা। খবরের কাগজ না পৌঁছিলে যুদ্ধের আলোচনা ঠিক জমে না । অদূরবর্তী বাজারে প্রাভাতিক সওদা সারিয়া নবীন মুখুয্যে, শশধর মুহুরী, কেনারাম মুখুয্যে, মন্মথ মুখুয্যে, বলাই দা প্রভৃতি ভদ্রলোক সীতানাথের ডাক্তারখানায় স্নানাহারের সময় পৰ্য্যন্থ রাজনীতি আলোচনা করিয়া থাকেন। ই হার কোন চাকুরী করেন না । দু-একজন পেনসনপ্রাপ্ত সরকারী কৰ্ম্মচারী, এক-আধজনের বাপের পয়সা প্রচুর। ইহারা জার্মানি ও জাপানের সম্বন্ধে বহু ভবিষ্যদবাণী করেন, যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্বন্ধে এমন কথাবার্তা বলেন, যাহা স্বয়ং হিটলার, চাচ্চিল ও তোজোরও অজ্ঞাত। হিটলার কি ভুল করেন, চাচ্চিলের কি করা উচিত ছিল, জাপান এমনটি না করিয়া যদি এমনটি করিত তাহা হইলে কি ঘটিত—এ সকল মূল্যবান উপদেশ সৰ্ব্বদাই সেখানে উচ্চারিত হইতেছে , বর্তমানে কেনারাম মুখুয্যে বলিতেছিলেন–আরে, এই তোমাকে বলি শোনে ভায় । ভুলট হিটলারের হোলো কোথায় শোনো। ডানকার্কের যুদ্ধের পরেই— শশধর মুহুরী বলিয়া উঠিলেন—আঃ, আপনি ঐ এক শিখে রেখেচেন ডানকার্ক আর ডানকার্ক। আসল ভুল সেখানে নয়, আসল ভুল হলো— এমন সময় একটি পুরুষের হাত ধরিয়া একজন স্ত্রীলোক ডাক্তারখানার বারানাতে উঠিয়া আসিল সম্মুখের রাস্ত হইতে । পুরুষটির বয়েস চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ-পঞ্চাল্পর মধ্যে যে কোন বয়েস হইতে পারে, রোগ, পরনে খাটো ময়লা ধুতি ; মেয়েটির বয়েসও নিতাস্ত কম নয়, তবে পুরুষটির অপেক্ষ অনেক কম, ত্রিশ-বত্ৰিশের বেশি হইবে না । মেয়েটির পরনে তালি-লাগালে৷ শাড়ী, কিন্তু ময়লা নয়—মুখশ্ৰী একসময় বেশ ভালোই ছিল বোঝা যায়, দেহ খুব সম্ভবত অনাহারে ও ম্যালেরিয়ায় শীর্ণ। মেয়েটি বারান্দার প্রান্তে দাড়াইয়া বলিল—ও ডাক্তারবাবু— সীতানাথ ডাক্তার উহাদের দিকে একটু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে চাহিয়া বলিলেন—কি চাও? –বাৰু, একে একটুখানি দেখতি হবে। সীতানাথ ডাক্তার বুঝিয়াছিলেন ইহাদের দ্বারা বিশেষ কোনো অর্থাগমের আশা নাই—খত বড় কঠিন অস্থখই হউক না কেন । দুর্ভিক্ষপীড়িত চেহারা। পরনে তো ওই কাপড় । মাখা তৈলাভাবে রুক্ষ। রোগীর মধ্যে গণ্য করিয়া উৎফুল্ল হইবার কোনো কারণ নাই। তামাক টানিতে টানিতে বলিলেন—হয়েচে কি ? মেয়েটি বলিল—হবে আর কি ! ওঁর জর ছাড়ে না আজ তুমাস। তার ওপর মেছ । শরীয় একেবারে ভেঙে দিয়েচে । আমার উনি ছাড়া আর কেউ নেই। আপনি দয়া করে দেখুন।...বলিয়া মেয়েটি প্রায় কাদিয়া ফেলিল। সীতানাথ ডাক্তার বলিলেন—সরে এলো এদিকে—