বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪১০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (জৈন ও বৌদ্ধপ্রভাব)
[8০৮]
বঙ্গদেশ (জৈন ও বৌদ্ধপ্রভাব)

হইয়াছিল। এই সময়ে মগধাধিপ অজাতশত্রুর পুত্র উদায়ী গঙ্গাতটে পাটলিপুত্র নগরী স্থাপন করেন।

 প্রাচীন জৈনগ্রন্থ মতে, বীর মোক্ষের ৬০ বর্ষ পরে অর্থাৎ ৪৬৭ খৃষ্টপূর্ব্বাব্দে ১ম নন্দের অভিষেক। ইহারই চারিবর্ষ পরে প্রসিদ্ধ জৈন গণধর জম্বূস্বামী মোক্ষলাভ করেন।[]

 প্রথম নন্দের পর আরও ৭ জন নন্দ রাজত্ব করেন, কল্পকপুত্র শকটালের ভ্রাতৃগণ তাঁহাদের মন্ত্রিত্ব করেন। অবশেষে ৯ম নন্দ সিংহাসন লাভ করেন, ইঁহারই প্রধান মন্ত্রী শকটাল। এই শকটালের পুত্র স্থূলভদ্র।

 স্থূলভদ্রের কিছু পূর্ব্বে জৈনদিগের শেষ শ্রুতকেবলী ভদ্রবাহুর অভ্যুদয়। তাঁহার শিষ্য প্রশিষ্যে সমস্ত ভারত পরিব্যাপ্ত হইয়াছিল। তাঁহার কাশ্যপ-গোত্রীয় চারিজন প্রধান শিষ্য ছিল, তন্মধ্যে প্রথম শিষ্যের নাম গোদাস। এই গোদাস হইতে চারিটী শাখার সৃষ্টি,—এই চারি শাখার নাম তাম্রলিপ্তিকা, কোটিবর্ষীয়া, পুণ্ড্রবর্দ্ধনীয়া ও দাসী কর্ব্বটিয়া।[] এই শাখা চতুষ্টয়ের নাম হইতে সহজেই মনে হইবে যে, তাম্রলিপ্ত (বর্ত্তমান তমলুক্) কোটিবর্ষ (বর্ত্তমান দিনাজপুর জেলাস্থ দেওকোট পরগণা), পুণ্ড্রবর্দ্ধন (মালদহ ও বগুড়া জেলার মধ্যে) এবং কর্ব্বট[ব্যাখ্যা ১] (সম্ভবতঃ মানভূম জেলায়) অর্থাৎ দুই হাজার বর্ষেরও পূর্ব্বতন কালে বর্ত্তমান বঙ্গদেশের নানা স্থানে জৈনদিগের প্রতিপত্তি ও শ্রেণিবিভাগ ঘটিয়াছিল।

 অতঃপর চন্দ্রগুপ্তের অধিকার। চাণক্যের কৌশলে নন্দকে বিনাশ করিয়া চন্দ্রগুপ্ত ভারতের একচ্ছত্র অধিপতি হইয়াছিলেন। হেমচন্দ্রের পরিশিষ্টপর্ব্বমতে— বীরমোক্ষের ১৫৫ বর্ষ পরে অর্থাৎ ৩৭২ খৃঃ পূর্ব্বাব্দে চন্দ্রগুপ্তের অভিষেক।

 এ সময়ে বঙ্গদেশে ব্রাহ্মণাচার এক প্রকার বিলুপ্ত, সর্ব্বত্রই জৈনাচার প্রবল হইয়া উঠিয়াছে। স্বয়ং চন্দ্রগুপ্ত ভদ্রবাহুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই চন্দ্রগুপ্তের অধিকারকালেই পাটলিপুত্রে জৈনদিগের শ্রীসঙ্ঘ আহূত ও জৈন অঙ্গশাস্ত্রগুলি সংগৃহীত হয়।

 চন্দ্রগুপ্ত এক প্রকার ভারত-সম্রাট্ হইয়াছিলেন। তাঁহার পরিজনবর্গ তাঁহার অধীনে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ শাসন করিতেন। সুতরাং পাটলিপুত্রের জৈন অনুষ্ঠান সহজেই চন্দ্রগুপ্তের অধীন সামন্তগণের চেষ্টায় সমস্ত ভারতে পরিগৃহীত হইয়াছিল।


  1. পরিশিষ্ট পর্ব্ব ৪।৬১।
  2. জৈনকল্পসূত্র দ্রষ্টব্য।
  1. মূলে “দাসীখর্ব্বটীয়া” আছে। ‘কর্ব্বটীয়া’ পাঠই সাধু। মহাভারতে “কর্ব্বট” নামই আছে। (সভাপর্ব্ব ২৯।২৪)

 জৈন-প্রভাববিস্তারের সহিত সমগ্র ভারত হইতে ব্রাহ্মণ-প্রভাব অতিশয় খর্ব্ব হইয়া পড়িল। ক্ষত্রিয়-রাজগণের চেষ্টায় এরূপ পরিবর্ত্তন সাধিত হইয়াছিল বলিয়া ক্ষত্রিয়গণের উপর ব্রাহ্মণগণের জাতক্রোধ হইল, তাঁহারা পুরাণে রটাইলেন যে আর ক্ষত্রিয় নাই, ক্ষত্রিয়বংশ নির্মূল হইয়াছে। চন্দ্রগুপ্ত ব্রাহ্মণবিরোধী ও জৈনমতাবলম্বী ছিলেন বলিয়াই ব্রাহ্মণের নিকট তিনি ‘বৃষল’ বলিয়া লাঞ্ছিত হইলেন। ৩১৬ খৃঃ পূর্ব্বাব্দে চন্দ্রগুপ্তপুত্র বিন্দুসারের রাজ্যসমাপ্তি এবং অশোকের অভ্যুদয়। অশোক-প্রিয়দর্শী চন্দ্রগুপ্তের অপত্য বলিয়া “চন্দ্রগুপ্ত” (Sandrakoptas) নামেও পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকের নিকট পরিচিত।

[ভারতবর্ষ শব্দ ৩৬৪ পৃঃ দ্রষ্টব্য]

 ব্রাহ্মণ-রচিত গ্রন্থে অশোক শূদ্র বলিয়া চিহ্নিত হইলেও প্রাচীন বৌদ্ধগ্রন্থে তিনি ক্ষত্রিয় এবং বিশুদ্ধ ক্ষত্রিয়াচারী বলিয়াই পরিচিত। তাঁহার রাজ্যাভিষেকের পূর্ব্বে তিনি কতকটা ব্রাহ্মণভক্ত ছিলেন। তাঁহার ভোজনশালায় শত শত পশুবধ হইত। তাঁহার রাজ্যাভিষেকের সঙ্গে প্রথমে তিনি জৈন, শেষে বৌদ্ধধর্ম্মানুরাগী হইয়া পড়িয়াছিলেন। হিমালয় হইতে কুমারিকা এবং চট্টগ্রাম হইতে আফগানস্তানের সীমা পর্য্যন্ত তাঁহার সাম্রাজ্য বিস্তৃত হইয়াছিল। সুদূর যুরোপ ও আফ্রিকায় বৌদ্ধধর্ম্মপ্রচারার্থ তিনি উপযুক্ত পরিব্রাজক নিযুক্ত করিয়াছিলেন এবং তখনকার শ্রেষ্ঠ যবনরাজগণ তাঁহার সহিত আত্মীয়তা ও মিত্রতাপাশে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। [প্রিয়দর্শী দেখ।]

 অশোকের সময়ে তাঁহার অধীনে বঙ্গদেশ নানা প্রদেশে বিভক্ত এবং এক এক জন পরাক্রান্ত সামন্তরাজের শাসনাধীন ছিল। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় বঙ্গের নানাস্থানে অশোকের ধর্ম্মানুশাসন ও ধর্ম্মরাজিকা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। অশোকের সময় বঙ্গভূমে কোন্ কোন্ রাজা রাজত্ব করিতেছিলেন, তাহার নাম পাওয়া যায় নাই। আবুলফজল এখানকার পুরাতন ইতিবৃত্ত সংগ্রহ করিয়া যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন, তৎপাঠে মনে হইবে যে বঙ্গভূমে ২৪১৮ বর্ষ ক্ষত্রিয় অধিকার, তৎপরে ২০৩৮ বর্ষ কায়স্থ অধিকার, অতঃপর মুসলমান অধিকার চলিয়াছিল।[] পূর্ব্বেই লিখিয়াছি যে, বলিপুত্র অঙ্গ বঙ্গাদি হইতে এখানে ক্ষত্রিয়াধিকারের সূত্রপাত। তাহা মহাবীর কর্ণের পঞ্চদশ পুরুষ পূর্ব্বে বা পাঁচহাজার বর্ষেরও পূর্ব্বেকার কথা। অর্থাৎ বর্ত্তমান যুগ প্রবর্ত্তিত হইবার পূর্ব্বেই এদেশে ক্ষত্রিয়াধিকার প্রচলিত হইয়াছিল।[] এখন আবুল-


  1. Col. H S Jarrett’s Ain-i-Akbari. Vol I p. 143-146.
  2. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ১ম ভাগ ৫৩-৫৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।