সামন্তরাজগণ স্বাধীনতা অবলম্বন করেন, তন্মধ্যে পূর্ব্ববঙ্গে বৌদ্ধ খড়্গবংশ ও রাঢ়ে দেবদ্বিজভক্ত শূরবংশ প্রধান। খড়্গবংশের যিনি প্রথম স্বাধীন হইলেন, তাঁহার নাম খড়্গোদ্যম,[ব্যাখ্যা ১] এবং শূরবংশে যিনি প্রথম মস্তকোত্তলন করেন, তাঁহার নাম কবিশূর।[ব্যাখ্যা ২] উক্ত উভয় নৃপতির শাসন বহু বিস্তৃত হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। খড়্গোদ্যম সমতটে (বর্ত্তমান ঢাকা জেলায়) এবং কবিশূর উত্তররাঢ়ে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন।
খড়্গোদ্যমের পুত্র জাতখড়্গ এবং জাতখড়্গের পুত্র দেবখড়্গ। দেবখড়্গের তাম্রশাসন হইতে মনে হয়, সমস্ত পূর্ব্ববঙ্গ তাঁহার অধিকারভুক্ত হইয়াছিল এবং বহু সামন্ত নৃপতি তাঁহার অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল।
শূরবংশের অভ্যুদয়।
তাঁহার রাজধানীর গৌরবসমৃদ্ধি কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কল্হণ উজ্জ্বল ভাষায় বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। আদিশূরের অভ্যুদয়ের পূর্ব্বে কান্যকুব্জপতি (বৈদিকমার্গপ্রবর্ত্তক) যশোবর্ম্মদেব গৌড় আক্রমণ করেন। এখানকার গৌড়পতি তাঁহার হস্তে নিহত হন। মহাকবি বাক্পতির গৌড়বধ কাব্যে কমলায়ুধ যশোবর্ম্মদেবের বিজয়কাহিনী বিবৃত হইয়াছে। [যশোবর্ম্মদেব দেখ।]
ব্রাহ্মণভক্ত মহারাজ জয়ন্তশূর গৌড়ে অভিষিক্ত হইবার পরেই বৈদিকমার্গ প্রবর্ত্তনের চেষ্টা করেন। তখন কান্যকুব্জেই মহারাজ যশোবর্ম্মদেবের আশ্রয়ে প্রধান সাগ্নিক ব্রাহ্মণগণ অবস্থান করিতেন, এ কারণ আদিশূর তাঁহার নিকটই ব্রাহ্মণ চাহিয়া পাঠান। গৌড়দেশ বৌদ্ধবিপ্লাবিত ছিল বলিয়া প্রথমতঃ কনোজপতি সাগ্নিক ব্রাহ্মণ পাঠাইতে সম্মত হন নাই। অবশেষে আদিশূর কৌশল করিয়া কএক জন বীর সপ্তশতী ব্রাহ্মণগণকে সাগ্নিক ব্রাহ্মণ আনাইতে পাঠাইলেন।[ব্যাখ্যা ৩] গোব্রাহ্মণ-
- ↑ আসরফপুর হইতে আবিষ্কৃত দেবখড়্গের তাম্রশাসন।
- ↑ বাচস্পতি মিশ্রের কুলরাম।
- ↑ কোন কোন রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদিগের কুলগ্রন্থে ৬৫৪ শকে বা ৭৩২ খৃষ্টাব্দে কনোজ হইতে সাগ্নিক ব্রাহ্মণাগমনকাল লিখিত হইয়াছে। আদিশূরের অভিষেকাব্দকেই সম্ভবতঃ ব্রাহ্মণাগমন কাল বলিয়া কুলগ্রন্থকারগণ ধরিয়া থাকিবেন। [বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ১ম ভাগ ১ মাংশ দ্রষ্টব্য]
মহারাজ আদিশূরের অভ্যুদয়কালে তাঁহার অধিকার মধ্যে নানাবিধ নিরগ্নিক এবং জৈন অথবা বৌদ্ধভাবাপন্ন ব্রাহ্মণের বাস ছিল, তন্মধ্যে রাঢ়দেশবাসী সপ্তশতী ব্রাহ্মণেরাই প্রধান ছিলেন। পূর্ব্বে বিভিন্ন সময়ে বহু সংখ্যক সারস্বত ব্রাহ্মণ এ দেশে আসিয়া বাস করেন, তাঁহারা বর্দ্ধমান জেলায় সপ্তশত ঘর একত্র বাস করিতেন; যে স্থানে এই সপ্ত শত ঘর বাস করিতেন সেই স্থান “সপ্তশতিকা” নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছিল এবং এই স্থাননাম হইতে এই শ্রেণির ব্রাহ্মণেরাও পরবর্ত্তী কালে “সপ্তশতী” নামে প্রখ্যাত হইলেন। বারেন্দ্র ও রাঢ়ীয় কুলপঞ্জিকা মতে তাঁহারা ‘দ্বিজবেদযজ্ঞরহিত’ অর্থাৎ শূদ্রাচারী হইলেও সকলে কুলাচারী, আভিচারিক ক্রিয়ায় চতুর, শান্তিকার্য্যে পটু ও গুণবান্ ছিলেন। আদিশূরের অনুগ্রহে নবাগত সাগ্নিকব্রাহ্মণগণের সাহায্যে তাঁহারা প্রায়শ্চিত্তাদি দ্বারা পুনঃসংস্কৃত হইয়া হিন্দুরাজসভায় দ্বিজোত্তম বলিয়া সম্মানিত হইয়াছিলেন। নিরগ্নিক বৌদ্ধাচারী সপ্তশতী বিপ্রগণ বৈদিকাচারপ্রবর্ত্তক আদিশূরের নিকট সম্মানিত হইবার কারণ কি?
প্রাচীন কুলগ্রন্থসমূহ আলোচনায় বুঝিয়াছি যে, বৌদ্ধতান্ত্রিকতার প্রভাবে গৌড়বঙ্গ হইতে এক কালে বৈদিকাচার বিলুপ্ত হয়, এবং প্রজাসাধারণ শূদ্রাচারী অথবা শূদ্র বলিয়া গণ্য হইয়াছিল। এইরূপ রাঢ়দেশবাসী প্রজাসাধারণ সপ্তশতী ব্রাহ্মণ-