বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪১৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (শূরবংশ)
[৪১৪]
বঙ্গদেশ (শূরবংশ)

সামন্তরাজগণ স্বাধীনতা অবলম্বন করেন, তন্মধ্যে পূর্ব্ববঙ্গে বৌদ্ধ খড়্গবংশ ও রাঢ়ে দেবদ্বিজভক্ত শূরবংশ প্রধান। খড়্গবংশের যিনি প্রথম স্বাধীন হইলেন, তাঁহার নাম খড়্গোদ্যম,[ব্যাখ্যা ১] এবং শূরবংশে যিনি প্রথম মস্তকোত্তলন করেন, তাঁহার নাম কবিশূর।[ব্যাখ্যা ২] উক্ত উভয় নৃপতির শাসন বহু বিস্তৃত হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। খড়্গোদ্যম সমতটে (বর্ত্তমান ঢাকা জেলায়) এবং কবিশূর উত্তররাঢ়ে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন।

 খড়্গোদ্যমের পুত্র জাতখড়্গ এবং জাতখড়্গের পুত্র দেবখড়্গ। দেবখড়্গের তাম্রশাসন হইতে মনে হয়, সমস্ত পূর্ব্ববঙ্গ তাঁহার অধিকারভুক্ত হইয়াছিল এবং বহু সামন্ত নৃপতি তাঁহার অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল।


শূরবংশের অভ্যুদয়।

 দেবখড়্গের সময়েই উত্তররাঢ়ে বা কর্ণসুবর্ণে আদিশূরের অভ্যুদয়। আদিশূরের প্রকৃত নাম জয়ন্ত, তিনি পূর্ব্বোক্ত কবিশূরের পৌত্র ও মাধবশূরের পুত্র। তিনি অত্যল্প কাল মধ্যে পৌণ্ড্রবর্দ্ধন জয় করিয়া তথায় রাজধানী স্থাপন করিলেন ও ৬৫৪ শকে বা ৭৩২ খৃষ্টাব্দে যথারীতি অভিষিক্ত হইলেন।

 তাঁহার রাজধানীর গৌরবসমৃদ্ধি কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কল্‌হণ উজ্জ্বল ভাষায় বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। আদিশূরের অভ্যুদয়ের পূর্ব্বে কান্যকুব্জপতি (বৈদিকমার্গপ্রবর্ত্তক) যশোবর্ম্মদেব গৌড় আক্রমণ করেন। এখানকার গৌড়পতি তাঁহার হস্তে নিহত হন। মহাকবি বাক্‌পতির গৌড়বধ কাব্যে কমলায়ুধ যশোবর্ম্মদেবের বিজয়কাহিনী বিবৃত হইয়াছে। [যশোবর্ম্মদেব দেখ।]

 ব্রাহ্মণভক্ত মহারাজ জয়ন্তশূর গৌড়ে অভিষিক্ত হইবার পরেই বৈদিকমার্গ প্রবর্ত্তনের চেষ্টা করেন। তখন কান্যকুব্জেই মহারাজ যশোবর্ম্মদেবের আশ্রয়ে প্রধান সাগ্নিক ব্রাহ্মণগণ অবস্থান করিতেন, এ কারণ আদিশূর তাঁহার নিকটই ব্রাহ্মণ চাহিয়া পাঠান। গৌড়দেশ বৌদ্ধবিপ্লাবিত ছিল বলিয়া প্রথমতঃ কনোজপতি সাগ্নিক ব্রাহ্মণ পাঠাইতে সম্মত হন নাই। অবশেষে আদিশূর কৌশল করিয়া কএক জন বীর সপ্তশতী ব্রাহ্মণগণকে সাগ্নিক ব্রাহ্মণ আনাইতে পাঠাইলেন।[ব্যাখ্যা ৩] গোব্রাহ্মণ-


  1. আসরফপুর হইতে আবিষ্কৃত দেবখড়্গের তাম্রশাসন।
  2. বাচস্পতি মিশ্রের কুলরাম।
  3. কোন কোন রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদিগের কুলগ্রন্থে ৬৫৪ শকে বা ৭৩২ খৃষ্টাব্দে কনোজ হইতে সাগ্নিক ব্রাহ্মণাগমনকাল লিখিত হইয়াছে। আদিশূরের অভিষেকাব্দকেই সম্ভবতঃ ব্রাহ্মণাগমন কাল বলিয়া কুলগ্রন্থকারগণ ধরিয়া থাকিবেন। [বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ১ম ভাগ ১ মাংশ দ্রষ্টব্য]
বধের আশঙ্কা করিয়া কনোজপতি কএক জন সাগ্নিক ব্রাহ্মণ পাঠাইতে বাধ্য হইলেন। এই সকল ব্রাহ্মণগণের যত্নে গৌড়ে বৈদিকাচার অনুষ্ঠানের সূত্রপাত হইতে থাকে। পৌণ্ড্রবর্দ্ধনের সমৃদ্ধি কালেই কাশ্মীরপতি কায়স্থবীর ললিতাদিত্যের পৌত্র মহারাজ জয়াদিত্য নানাস্থান জয় করিয়া ছদ্মবেশে পৌণ্ড্রবর্দ্ধননগরে উপস্থিত হন। রাজধানীর সমৃদ্ধিদর্শনে তিনি অতিশয় প্রীত হইয়াছিলেন। সে সময়ে পৌণ্ড্রবর্দ্ধনের নিকটে সিংহের উৎপাত ছিল। একদিন রাত্রিকালে ছদ্মবেশী জয়াদিত্য একটা সিংহবধ করেন, এই সময়েই তাঁহার নামাঙ্কিত কেয়ূর পড়িয়া যায়। পরদিন প্রাতে স্থানীয় অধিবাসী মৃত সিংহ ও কেয়ূর দর্শন করিয়া তাহা গৌড়পতির নিকট উপস্থিত করিল। কেয়ূর পাইয়া গৌড়পতি জানিলেন যে কাশ্মীরপতি মহাবীর জয়াদিত্য ছদ্মবেশে তাঁহার রাজধানীতে উপস্থিত! অবিলম্বে চর পাঠাইয়া কাশ্মীরপতিকে বাহির করিয়া ফেলিলেন! জয়ন্তশূরের এক পরমসুন্দরী কন্যা ছিল, তাঁহার নাম কল্যাণদেবী। গৌড়পতি পরম সমাদরে জয়াদিত্যকে নিজ প্রাসাদে আনাইয়া মহাসমারোহে তাঁহার করে কল্যাণদেবীকে সম্প্রদান করিলেন। এইরূপে কাশ্মীরের কায়স্থরাজবংশের সহিত গৌড়ের কায়স্থরাজ জয়ন্তশূর বৈবাহিক সম্বন্ধে আবদ্ধ হইলেন।

 মহারাজ আদিশূরের অভ্যুদয়কালে তাঁহার অধিকার মধ্যে নানাবিধ নিরগ্নিক এবং জৈন অথবা বৌদ্ধভাবাপন্ন ব্রাহ্মণের বাস ছিল, তন্মধ্যে রাঢ়দেশবাসী সপ্তশতী ব্রাহ্মণেরাই প্রধান ছিলেন। পূর্ব্বে বিভিন্ন সময়ে বহু সংখ্যক সারস্বত ব্রাহ্মণ এ দেশে আসিয়া বাস করেন, তাঁহারা বর্দ্ধমান জেলায় সপ্তশত ঘর একত্র বাস করিতেন; যে স্থানে এই সপ্ত শত ঘর বাস করিতেন সেই স্থান “সপ্তশতিকা” নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছিল এবং এই স্থাননাম হইতে এই শ্রেণির ব্রাহ্মণেরাও পরবর্ত্তী কালে “সপ্তশতী” নামে প্রখ্যাত হইলেন। বারেন্দ্র ও রাঢ়ীয় কুলপঞ্জিকা মতে তাঁহারা ‘দ্বিজবেদযজ্ঞরহিত’ অর্থাৎ শূদ্রাচারী হইলেও সকলে কুলাচারী, আভিচারিক ক্রিয়ায় চতুর, শান্তিকার্য্যে পটু ও গুণবান্ ছিলেন। আদিশূরের অনুগ্রহে নবাগত সাগ্নিকব্রাহ্মণগণের সাহায্যে তাঁহারা প্রায়শ্চিত্তাদি দ্বারা পুনঃসংস্কৃত হইয়া হিন্দুরাজসভায় দ্বিজোত্তম বলিয়া সম্মানিত হইয়াছিলেন। নিরগ্নিক বৌদ্ধাচারী সপ্তশতী বিপ্রগণ বৈদিকাচারপ্রবর্ত্তক আদিশূরের নিকট সম্মানিত হইবার কারণ কি?

 প্রাচীন কুলগ্রন্থসমূহ আলোচনায় বুঝিয়াছি যে, বৌদ্ধতান্ত্রিকতার প্রভাবে গৌড়বঙ্গ হইতে এক কালে বৈদিকাচার বিলুপ্ত হয়, এবং প্রজাসাধারণ শূদ্রাচারী অথবা শূদ্র বলিয়া গণ্য হইয়াছিল। এইরূপ রাঢ়দেশবাসী প্রজাসাধারণ সপ্তশতী ব্রাহ্মণ-