মহম্মদ্-ই-বখ্তিয়ারের মৃত্যুর পর খিলজীবংশীয় যে কয়েকজন সেনাপতি বঙ্গদেশ শাসন করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে সুলতান গিয়াস্উদ্দীন্ই সর্ব্বাপেক্ষা বিখ্যাত। সুলতান হিসাম্ উদ্দীন্ অবুজ গৌড়ের মসনদে সমাসীন হইয়া গিয়াস্ উদ্দীন্ নাম ধারণ করেন। তাঁহার স্থাপিত কীর্ত্তিমালা অদ্যাপি বঙ্গে তাঁহার যশঃ ঘোষণা করিতেছে। তিনি গৌড়নগরী নানা অট্টালিকায় ও ধর্ম্মমন্দিরে সুশোভিত করিয়াছিলেন। তখন লক্ষ্মণাবতী বা গৌড়-রাজধানী গঙ্গার দুই দিকে বিস্তৃত ছিল। বর্ষাঋতুতে জলমগ্ন স্থান দিয়া রাজধানী হইতে অন্যত্র যাতায়াতের অসুবিধা বুঝিয়া তিনি বীরভূমের অন্তর্গত নগর (লক্ষ্মণনগর বা লখ্নৌর) নামক স্থান হইতে গৌড় দিয়া দেবকোট পর্য্যন্ত একটী জাঙ্গাল (মৃত্তিকাস্তূপ দ্বারা নির্ম্মিত উচ্চ পথ) প্রস্তুত করান। ইহাতে সাধারণ লোকের ও রাজকীয় কর্ম্মচারীদিগের বাঙ্গালার বিভিন্ন নগরে গমনাগমনের যথেষ্ট সুবিধা ঘটিয়াছিল।
মুসলমানবাহিনী সঙ্গে লইয়া তিনি স্বয়ং কামরূপ, মিথিলা এবং জগন্নাথের (উড়িষ্যার) রাজাদিগকে কর দিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। প্রায় দশ বৎসরকাল মহাসমৃদ্ধির সহিত রাজত্ব করিয়া তিনি দেশহিতকর নানা কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া যান। তিনি সাহিত্য ও শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। জ্ঞানোন্নতি কল্পে তিনি শত শত পণ্ডিতকে বৃত্তি দান করিয়াছিলেন। বাস্তবিক পক্ষে তিনি হিন্দু, মুসলমান, ধনী বা দরিদ্রভেদে কোনরূপ বিচারের তারতম্য করিতেন না। ১২২৫ খৃষ্টাব্দে দিল্লীশ্বরের বিরোধী হইয়া তিনি প্রথমে দিল্লীতে রাজকর প্রেরণ বন্ধ করেন। সম্রাট্ আল্তমাস তাঁহাকে দণ্ডবিধানার্থ বাঙ্গালায় সমাগত হইলে তিনি তাঁহার অধীনতা স্বীকারপূর্ব্বক সন্ধি করিতে বাধ্য হন। সম্রাট্ প্রত্যাগত হইলে, তিনি বেহারের শাসনকর্ত্তা মুলক্ আলা উদ্দীনকে রাজ্যভ্রষ্ট করিয়া পুনরায় দিল্লীশ্বর সুলতান্ আল্তামাসের অধীনতা অস্বীকার করেন, তাহাতে সুলতান আপনার দ্বিতীয় পুত্র নাসির্ উদ্দীন্কে তদ্বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। গিয়াস্ উদ্দীন্ সমরে পরাজিত এবং নিহত হন (১২২৭ খৃষ্টাব্দ)।
গিয়াসের মৃত্যুর পর লক্ষ্মণাবতীর হৃতসর্বস্ব দিল্লীরাজধানীতে প্রেরণ করিয়া নাসির্ উদ্দীন্ বাঙ্গালা ও বেহারের শাসনকর্ত্তা হন। ১২২৮-২৯ খৃষ্টাব্দে লক্ষ্মণাবতী রাজধানীতে তাঁহার মৃত্যু ঘটে। এই সুযোগে খিলজীবংশীয় সর্দ্দারগণ বিদ্রোহী হইয়া পুনরায় বাঙ্গালা হস্তগত করিতে চেষ্টা পান। সুলতান আল্তমাস ৬২৭ হিজিরায় স্বয়ং বাঙ্গালায় উপনীত হইয়া বিদ্রোহদমনপূর্ব্বক পূর্ব্বকথিত মুলক্ আলা উদ্দীন্কে গৌড়সিংহাসনে অভিষিক্ত করেন। আলা উদ্দীন্ ৪ বৎসর এবং তৎপরে শৈফ্ উদ্দীন্ তুর্ক ৩ বৎসরকাল রাজত্ব করিলে পর বাঙ্গা-নাসির্ উদ্দীনের পর যথার্থ পক্ষে তুঘান খাঁই বঙ্গরাজ্য শাসন করিয়াছিলেন। তিনি নানা সদ্গুণে ভূষিত ছিলেন। সুলতান আল্তমাসের অনুগ্রহে তিনি ৬৩০ হইতে ৬৩৪ হিঃ মধ্যে যথাক্রমে বুদাউন, বেহার ও গৌড়ের মসনদে সমধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। বঙ্গসিংহাসনে উপবিষ্ট হইয়া আজা উদ্দীন্ তুঘান খান্ উপাধি ধারণ করিয়া দিল্লীশ্বরী সুলতান রিজিয়ার সন্নিকটে উপঢৌকনাদিসহ একজন দূত প্রেরণ করেন। তাহাতে তিনি উচ্চ সম্মানলাভ এবং লোহিতবর্ণ ছত্র ধারণের অধিকার পান। অতঃপর তিনি ত্রিহুতপতিকে পদানত করিয়া কর দিতে বাধ্য করেন এবং বহু ধনরত্ন লইয়া গৌড় রাজধানীতে প্রত্যাবৃত্ত হন।
সম্রাট্ মসাউদের রাজত্বকালে দিল্লীর রাজসরকার বিশৃঙ্খল জানিয়া তিনি সেই রাজশক্তিকে অবজ্ঞাপূর্ব্বক স্বয়ং স্বাধীন রাজরূপে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন এবং কড়া-মাণিকপুর অধিকার করিয়া স্বীয় রাজ্যসীমা বৃদ্ধি করেন (১২৪২ খৃষ্টাব্দে)। তথায় বাসকালে ৬৪০ হিজিরাব্দে তবকৎ-ই নাসিরী প্রণেতা মিন্হাজের সহিত সুলতানের সাক্ষাৎ হয়। সুলতান তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া বাঙ্গালায় আসেন।
১২৪৩ খৃষ্টাব্দে উৎকলপতি সুলতান তুঘানের বিরুদ্ধাচরণ করিলে তিনি মুসলমান সেনা লইয়া যাজপুর রাজ্য সীমান্তস্থিত কতাসন নামক স্থানে উপনীত হন। উড়িষ্যাবাসীর সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইয়া সুলতান লক্ষ্মণাবতীতে সদলে ফিরিয়া আসেন। তাহাতে উত্তেজিত হইয়া উড়িষ্যাসৈন্য বাঙ্গালা আক্রমণ করে (১২৪৪ খৃঃ, ৬৪২ হিঃ)। গঙ্গবংশীয় নরপতি অনঙ্গভীমপুত্র মহাবীর নরসিংহদেব স্বয়ং এই অভিযানের অধিনায়ক ছিলেন। উড়িষ্যা সৈন্য গৌড়নগর ও বীরভূমের প্রধান নগর লখ্নোর আলোড়িত এবং তথাকার সেনাপতি করিম্ উদ্দীন্কে বিপর্য্যস্ত করিলে উপায়ান্তর না দেখিয়া সুলতান দিল্লীশ্বরের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। তদনুসারে অযোধ্যার সুবাদার তৈমুর খাঁ কিরাণ সদলে লক্ষ্মণাবতী অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। তাঁহার আগমনে ভীত হইয়া উৎকলসৈন্য লব্ধদ্রব্যাদি লইয়া স্বদেশাভিমুখে পলায়ন করিল। তৈমুর খাঁ সুলতান তুঘ্রিল্-ই তুঘানকে হীনবল দেখিয়া স্বয়ং বাঙ্গালার মসনদ অধিকার করিয়া বসিলেন। এই সূত্রে উভয়পক্ষীয় মুসলমানসেনায় ঘোরতর যুদ্ধ ঘটে। ১২৪৪ খৃষ্টাব্দে উভয়পক্ষে একটী সন্ধি হয়। তাহাতে তৈমুর খান্ গৌড়ের মসনদে অধিষ্ঠিত হইলেন এবং সুলতান তুঘান স্বীয় ধনরত্ন লইয়া দিল্লী রাজধানীতে প্রস্থান করিলেন। দিল্লীশ্বর যথোচিত