হন। শ্রীরূপ ও সনাতন বৈষ্ণবাচার্য্যগণের অগ্রণী ছিলেন। এতদ্ব্যতীত বেঙ্কটভট্টের পুত্র গোপালভট্ট, মাধবমিশ্রের পুত্র গদাধর (১৪৮৬—১৫১৪ খৃঃ), সপ্তগ্রামবাসী কোটীপতি গোবর্দ্ধন দাসের পুত্র রঘুনাথ দাস (১৪৯৮ খৃঃ জন্ম), এবং শিবানন্দ সেনের পুত্র কবিকর্ণপুর প্রভৃতি বৈষ্ণবাচার্য্যগণ মহাপ্রভুর পার্শ্বচর বলিয়া খ্যাতিলাভ করেন।
যে সকল বৈষ্ণবভক্ত পণ্ডিতমণ্ডলীর উদ্যোগে বাঙ্গালা ও সংস্কৃত সাহিত্যের উন্নতি সংঘটিত হইয়াছিল, তন্মধ্যে রূপ, সনাতন, জীবগোস্বামী, গোপাল ভট্ট, স্মার্ত্ত রঘুনন্দন ও রঘুনাথ শিরোমণি প্রভৃতি মহাজনগণের নাম প্রথম উল্লেখযোগ্য। চিন্তামণি-দীধিতিপ্রণেতা রঘুনাথ শিরোমণি অসাধারণ বিচারশক্তির পরিচয় দিয়া নবদ্বীপে ন্যায়শাস্ত্রের প্রাধান্য স্থাপন করেন। স্মার্ত্ত রঘুনন্দনের অষ্টাবিংশতিতত্ত্বের ব্যবস্থানুসারে আজিও বাঙ্গালার ধর্ম্মকর্ম্ম চলিতেছে। এই সময়ে বারাণসীধামে বারেন্দ্রবংশীয় পণ্ডিতপ্রবর কুল্লূকভট্ট মনুসংহিতার টীকা প্রণয়ন করিয়া পণ্ডিত-সমাজে স্মৃতিশাস্ত্রের সমাদর বর্দ্ধিত করিয়াছিলেন। রূপগোস্বামিত ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, দানকেলিকৌমুদী প্রভৃতি গ্রন্থ এবং সনাতন-বিরচিত হরিভক্তিবিলাসটীকা ও বৈষ্ণবতোষিণী নাম্নী ভাগবতটীকা ভক্তিরসের ও সংস্কৃতসাহিত্যের চূড়ান্ত নিদর্শন।
রঘুনন্দন ও কুল্লূক যে সময়ে স্মৃতিব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা এবং রূপসনাতন ও অপরাপর বৈষ্ণব কবিগণ বৈষ্ণবধর্ম্মের প্রাধান্যস্থাপন ও প্রচারকামনায় বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন, তাহার কিছু পরে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সমগ্র তন্ত্রের সার সঙ্কলন করিয়া শক্তিপূজার সুব্যবস্থা করিলেন। [বিস্তৃত বিবরণ বাঙ্গালা ভাষা শব্দে দ্রষ্টব্য।]
এই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের সময় ধর্ম্মস্বাতন্ত্র্য ও জাতিগত পার্থক্যনিবন্ধন বঙ্গভূমে নিয়তই সামাজিক বাদানুবাদ লইয়া বিশেষ গোলযোগ উপস্থিত হইত। মুসলমান নরপতি বা সর্দ্দারগণের অনুগৃহীত ব্যক্তিই তৎকালে সমাজবাহ্য বলিয়া নিন্দিত হইতেন। এই সামাজিক আন্দোলন সময় সময় রাজ্যের মহা অশান্তিকর হইত বলিয়াই মুসলমান সুলতানগণ জাতিবিচারের জন্য একটী স্বতন্ত্র ‘জাতিমালা-কাছারী’ নির্দ্দিষ্ট করিয়া রাখেন। কুলগ্রন্থে লিখিত আছে, দেবীবরের অভ্যুদয়ের পূর্ব্বে দত্তখাস উপাধিধারী এক ব্যক্তি মুসলমানরাজের মন্ত্রী ছিলেন। তিনিই ঐ জাতিমালা কাছারির প্রধান বিচারপতি হন।[ব্যাখ্যা ১] তাঁহার সভায় রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণগণের ৫৭মঃ সমীকরণ
- ↑ মুসলমান রাজত্বের অবসানে এবং ইংরাজাধিকারের প্রারম্ভে কাসিম বাজারের সুপ্রসিদ্ধ ‘কৃষ্ণকান্ত নন্দী’ জাতিমালা কাছারির সদস্য হইয়াছিলেন।
এই জাতিবিভ্রাটের দিনে সকলেই দেশ, কাল ও পাত্র বিবেচনা করিয়া সমাজসংগঠনে বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন। ঘটক দেবীবর নানা দোষের একত্র সমাবেশ দেখিয়া ও রাঢ়ীয় কুলীনসমাজে পরস্পরের বিবাহজনিত সংস্রব লক্ষ্য করিয়া তাঁহাদের মধ্যে এক একটী ‘মেল’ নির্দ্দেশ করেন। তিনি স্বয়ং ঐ সময়ে ‘দোষ-নির্ণয়’ ও ‘মেলবিধি’ নামে দুইখানি কুলগ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। তৎপরে ১৪০৭ শকে ধ্রুবানন্দমিশ্র কর্ত্তৃক মহাবংশাবলী রচিত হয়। এতদ্ভিন্ন এই সময়ে আরও কতকগুলি কারিকা প্রকাশিত হইয়াছিল।[ব্যাখ্যা ১]
খৃষ্টীয় ১৫শ শতাব্দীর এই সংস্কারযুগে, মুসলমান-রাজত্বের যেরূপ রাজনৈতিক পরিবর্ত্তন সংসাধিত হইয়াছিল, তাহা আলাউদ্দীন হুসেন শাহের রাজত্বকালের ইতিবৃত্ত পাঠ করিলে স্পষ্টই বুঝা যায়।
আলাউদ্দীন্ হুসেন শাহ স্বীয় প্রতিপালক ও প্রভু হাবসীবংশীয় রাজা মুজঃফর শাহকে নিহত করিয়া বঙ্গসিংহাসন অধিকার করেন। রাজসিংহাসনে সমাসীন হইয়া সৈয়দ হুসেন আলা উদ্দীন্ সেরিফ মক্কা নাম ধারণ করেন। রিয়াজ-উস-সলাতিন্-প্রণেতা বলেন, ‘গৌড়ের স্তম্ভখোদিত লিপিতে তাঁহার হুসেন শাহ নাম বিদ্যমান আছে। অনুমান হয়, তাঁহার পিতা বা তদ্বংশীয় কোন পূর্ব্বপুরুষ মক্কার সেরিফ ছিলেন। সম্ভবতঃ সেই বংশগরিমা স্মরণ করিয়া তিনি ঐ নাম প্রকাশ করিয়া থাকিবেন।’
তিনি পূর্ব্ববর্ত্তী সুলতানগণের ন্যায় হীন-জাতীয় ছিলেন না। ইস্লামধর্ম্মপ্রবর্ত্তক হজরৎ মহম্মদের বংশে তাঁহার জন্ম। আরবের মরুভূমি ত্যাগ করিয়া তিনি সৌভাগ্যান্বেষণে বাঙ্গালায় উপনীত হন। গৌড়পতি তাঁহার আভিজাত্যের পরিচয় পাইয়া তাঁহাকে রাজকার্য্যে নিযুক্ত করেন। তাঁহার কার্য্যদক্ষতায় ও বিনয়-নম্র ব্যবহারে সন্তুষ্ট হইয়া সুলতান তাঁহাকে রাজের শ্রেষ্ঠতম উজীরপদ দান করেন। মন্ত্রিপদে অবস্থানকালে তিনি সকল শ্রেণীর ওমরাহ ও সামন্তদিগের প্রতি যেরূপ সদয় ব্যবহার করিতেন এবং সকল কার্য্যে যেরূপ দক্ষতা দেখাইতেন, তাহাতে সকলেই তাঁহার প্রতি প্রীত ও বিমুগ্ধ হইয়াছিল। অদৃষ্টচক্রে পাশবপ্রকৃতি মুজঃফরের অসহনীয় অত্যাচার তিনি শির পাতিয়া বহন করিতে বাধ্য হন, অবশেষে বিশেষ সঙ্কটে পড়িয়াই তিনি রাজবিদ্রোহী হন। সৌভাগ্যবশে পরিচালিত হইয়া অতঃপর তিনি বাঙ্গালার রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট হইতে সমর্থ হইয়া-
- ↑ বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস ১ম ও ২য় ভাগে ঐ সকল গ্রন্থের বিবরণ দ্রষ্টব্য।