পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অচলিত) দ্বিতীয় খণ্ড.pdf/৮১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


সমালোচনা RاوS( পরিশ্রমে তাহার মাপজোক করিতে আরম্ভ করেন ; আমি বলিলাম, অমুক লোকটা নিতান্ত গাধার মত, তিনি অমনি বলিলেন, সে কেমন কথা, তাহার তো চারটে পা নাই, আর তাহার কান দুটা কিছু নিতান্তই বড় নয়, তাহার গলার আওয়াজ ভাল নহে বটে, কিন্তু তাই বলিয়া কি গাধার সঙ্গে তাহার তুলনা হয় ? আমি বলিলাম, হে বুদ্ধিমান, গাধার বুদ্ধির সহিত আমি তাহার বুদ্ধির তুলনা করিতেছিলাম, আর কোন বিষয়ে সাদৃশ্ব আছে বলিয়া মনে হয় নাই । তিনি অম্নি বলিলেন, তাহাও কি ঠিক মেলে ? পশু বস্তুই দেখিতে পায়, কিন্তু বস্তুর বস্তুত্ব কি সে মনে করিতে পারে ? সে শ্বেতবর্ণ পদার্থ মনে আনিতেও পারে, কিন্তু শ্বেতবর্ণ নামক পদার্থ-অতিরিক্ত একটা ভাবমাত্র সে কি মনে ধারণা করিতে পারে ? ইত্যাদি ইত্যাদি । আমি কাতর হইয় বলিলাম, দোহাই মাপ কর, আমার অপরাধ হইয়াছে, এবার হইতে গাধার সহিত তাহার বুদ্ধির তুলনা না দিয়া তোমার সহিত দিব ! শুনিয়া তিনি সন্তুষ্ট হইলেন। এইরূপ র্যাহারা তার্কিক বন্ধুদিগের সহবাসে থাকেন, তাহাদের ভাবের উৎস-মুখে পাথর চাপান থাকে। বন্ধুত্বের দক্ষিণা বাতাস, বন্ধুদিগের অমুকুল হাস্তের স্বৰ্য্যকিরণের অভাবে তাহাদের হৃদয়-কাননের ভাবগুলি ফুটিয়া উঠিতে পারে না । যে সকল বিশ্বাস তাহাদের হৃদয়ের অতি প্রিয় সামগ্ৰী, পাছে সেগুলিকে লইয়া যুক্তির কাকচিলগুলা ছেড়াছিড়ি করিতে আরম্ভ করে এই ভয়ে তাহাদিগকে হৃদয়ের অন্ধকারের মধ্যেই লুকাইয়া রাখেন, তাহারা আর স্বৰ্য্যকিরণ পায় না, তাহারা ক্রমশঃই রুগ্ন অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া কুসংস্কারের আকার ধারণ করে ! কথায় কথায় যে সকল মত গঠিত হইয়া উঠিল, তাহারা চারিদিকে তর্কবিতর্কের ছোরাচুরি দেখিয়া ভয়ে আত্মহত্যা করিয়া মরে। তার্কিক বন্ধুদিগের সহবাসে থাকিলে প্রাণের উদারতা সঙ্কীর্ণ হইতে থাকে। আমি কাল্পনিক লোক, আমার জগৎ লাখেরাজ জমি, আমি কাহাকেও এক পয়সা খাজনা দিই না, অথচ জগতের যেখানে ইচ্ছা বিচরণ করিতে পারি, যাহা ইচ্ছা উপভোগ করিতে পারি। তুমি যুক্তি-মহারাজের প্রজ, যুক্তিকে যতটুকু জমির খাজনা দিবে ততটুকু জমি তোমার, যখনি খাজনা দিতে না পারিবে তখনি তোমার জমি নিলামে বিক্রয় হইয়া যাইবে । তোমার তার্কিক বন্ধু পাশে বসিয়া ক্রমাগত তোমার জমি সাৰ্ব্বে করিতেছেন ও তাহার সীমাবন্দী করিয়া দিতেছেন ; প্রতিদিন এক বিঘা, দুই বিঘা করিয়া তোমার অধিকার কমিয়া আসিতেছে। আমি যখন রাত্রিকালে অসংখ্য তারার দিকে চাহিয়া আমার অনন্ত জীবন কল্পনা করিতেছি, জগতের এক সীমা হইতে সীমাস্তর পর্য্যন্ত আমার প্রাণের বিচরণভূমি হইয়৷ গিয়াছে, আমি যখন নূতন নূতন আলোক নূতন নূতন গ্রহ মাড়াইয়া নূতন নূতন