পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ 있89 শরতের উৎসবহাস্তরঞ্জিত রৌদ্র সকৌতুকে শয়নগৃহের মধ্যে প্রবেশ করিল। এত বেলা হইল তথাপি উৎসবের দিনে দ্বার রুদ্ধ দেখিয়া ভুবন ও কমল উচ্চহাস্তে উপহাস করিতে করিতে গুম্‌ গুম্ শৰে দ্বারে কিল মারিতে লাগিল। তাহাতেও কোনো সাড়া না পাইয়া কিঞ্চিং ভীত হইয়া উর্ধ্বকণ্ঠে “বিন্দী” “বিন্দী” করিয়া ডাকিতে লাগিল । বিন্ধ্যবাসিনী ভগ্নরুদ্ধকণ্ঠে কহিল, “ষাচ্ছি ; তোরা এখন যা ।” তাহারা সখীর পীড়া আশঙ্কা করিয়া মাকে ডাকিয়া আনিল। মা আসিয়া কহিলেন, “বিন্দু, কী হয়েছে মা, এখনো দ্বার বন্ধ কেন ?” বিন্ধ্য উচ্ছসিত অশ্র সংবরণ করিয়া কহিল, "একবার বাবাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসো ।” মা অত্যন্ত ভীত হইয়া তৎক্ষণাৎ রাজকুমার বাবুকে সঙ্গে করিয়া দ্বারে আসিলেন। বিন্ধ্য দ্বার খুলিয়া তাহাদিগকে ঘরে আনিয়া তাড়াতাড়ি বন্ধ করিয়া দিল। তখন বিন্ধ্য ভূমিতে পড়িয়া তাহার বাপের পা ধরিয়া বক্ষ শতধা বিদীর্ণ করিয়া কাদিয়া উঠিয়া কহিল, “বাবা ! আমাকে মাপ করে, আমি তোমার সিন্দুক হইতে টাকা চুরি করিয়াছি।” তাহারা অবাক হইয়া বিছানায় বসিয়া পড়িলেন । বিন্ধ্য বলিল, তাহার স্বামীকে বিলাতে পাঠাইবার জন্ত সে এই কাজ করিয়াছে। তাহার বাপ জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাদের কাছে চাহিস নাই কেন।” বিষ্কাবাসিনী কহিল, “পাছে বিলাত যাইতে তোমরা বাধা দেও।” রাজকুমার বাবু অত্যন্ত রাগ করিলেন। মা কাদিতে লাগিলেন, মেয়ে কাদিতে লাগিল এবং কলিকাতার চতুর্দিক হইতে বিচিত্র স্বরে আনন্দের বাদ্য বাজিতে লাগিল। যে বিন্ধ্য বাপের কাছেও কখনো অর্থ প্রার্থনা করিতে পারে নাই এবং ষে স্ত্রী স্বামীর লেশমাত্র অসম্মান পরমাত্মীয়ের নিকট হইতেও গোপন করিবার জন্য প্রাণপণ করিতে পারিত, আজ একেবারে উৎসবের জনতার মধ্যে তাহার পত্নী-অভিমান, তাহার দুহিতৃসম্বম, তাহার আত্মমর্যাদা, চূর্ণ হইয়া প্রিয় এবং অপ্রিয়, পরিচিত এবং অপরিচিত সকলের পদতলে ধূলির মতো লুষ্ঠিত হইতে লাগিল। পূর্ব হইতে পরামর্শ করিয়া, ষড়যন্ত্রপূর্বক চাবি চুরি করিয়া, স্ত্রীর সাহাষ্যে রাতারাতি অর্থ অপহরণপূর্বক অনাথবন্ধু বিলাতে পলায়ন করিয়াছে, এ কথা লইয়া আত্মীয়কুটুম্বপরিপূর্ণ বাড়িতে একটা টী টী পড়িয়া গেল। দ্বারের নিকট দাড়াইয়া ভুবন কমল এবং আরো অনেক স্বজনপ্রতিবেশী দাসদাসী সমস্ত শুনিয়াছিল। রুদ্ধভার জামাতৃগৃহে উৎকণ্ঠিত কর্তাগৃহিণীকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া সকলেই কৌতুহলে এবং আশঙ্কায় ব্যগ্র হইয়া আসিয়াছিল।