পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৬৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ૨૭S পারি, তিনি প্রতিদিনই আমার এই ছলনাটুকু বুঝিতেন। আমি নির্বোধ, মনে করিতাম তিনি নির্বোধ । এই বলিয়া দক্ষিণাচরণ বাৰু অনেকক্ষণ করতলে মাথা রাখিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। অবশেষে কহিলেন, “আমাকে একমাস জল আনিয়া দাও।” জল খাইয়া বলিতে লাগিলেন— একদিন ডাক্তারবাবুর কন্যা মনোরম আমার স্ত্রীকে দেখিতে আসিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। জানি না, কী কারণে র্তাহার সে প্রস্তাব আমার ভালো লাগিল না। কিন্তু, প্রতিবাদ করিবার কোনো হেতু ছিল না। তিনি একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমাদের বাসায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সেদিন আমার স্ত্রীর বেদন অন্য দিনের অপেক্ষা কিছু বাড়িয়া উঠিয়াছিল। যেদিন তাহার ব্যথা বাড়ে সেদিন তিনি অত্যন্ত স্থির নিস্তব্ধ হইয়া থাকেন ; কেবল মাঝে মাঝে মুষ্টি বদ্ধ হইতে থাকে এবং মুখ নীল হইয়া আসে, তাহাতেই তাহার যন্ত্রণা বুঝা যায়। ঘরে কোনো সাড়া ছিল না, আমি শষ্যপ্রাস্তে চুপ করিয়া বসিয়া ছিলাম ; সেদিন আমাকে বেড়াইতে যাইতে অনুরোধ করেন এমন সামর্থ্য র্তাহার ছিল না কিংবা হয়তো বড়ো কষ্টের সময় আমি কাছে থাকি, এমন ইচ্ছা তাহার মনে মনে ছিল। চোখে লাগিবে বলিয়া কেরোসিনের আলোটা দ্বারের পাশ্বে ছিল । ঘর অন্ধকার এবং নিস্তব্ধ । কেবল এক-একবার যন্ত্রণার কিঞ্চিং উপশমে আমার স্ত্রীর গভীর দীর্ঘনিশ্বাস শুনা যাইতেছিল। এমন সময়ে মনোরম ঘরের প্রবেশদ্বারে দাড়াইলেন। বিপরীত দিক হইতে কেরোসিনের আলো আসিয়া তাহার মুখের উপর পড়িল । আলো-আঁধারে লাগিয়া তিনি কিছুক্ষণ ঘরের কিছুই দেখিতে না পাইয়া দ্বারের নিকট দাড়াইয়া ইতস্তত করিতে লাগিলেন । আমার স্ত্রী চমকিয়া আমার হাত ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ও কে !”— তাহার সেই দুর্বল অবস্থায় হঠাৎ অচেনা লোক দেখিয়া ভয় পাইয়া আমাকে দুই-তিনবার অক্ষুটম্বরে প্রশ্ন করিলেন, “ও কে! ও কে গে৷ ” আমার কেমন দুরবুদ্ধি হইল আমি প্রথমেই বলিয়া ফেলিলাম, “আমি চিনি না।” বলিবামাত্রই কে যেন আমাকে কশাখাত করিল। পরের মুহূর্তেই বলিলাম, ‘ও, আমাদের ডাক্তারবাবুর কন্যা!”