পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ঊনবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫১৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


যাত্রী 聯 8S) ক্রমে ক্রমে ক্ষয় হয়ে যায়, ঝরনার জল ক্রমাগত বইতে থাকলে তলার মুড়িগুলি যেমন স্থডোল হয়ে আসে। আমাদের অনেক তপস্বী মনে করেন, সাধনায় জ্ঞান ও কর্মই ষথেষ্ট। কিন্তু, বিধাতার রচনায় তিনি দেখিয়েছেন শুধু স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া নয়, রসেই স্বটির চরম সম্পূর্ণতা। মরুর মধ্যে ষা-কিছু শক্তি সমস্তই বিরোধের শক্তি, বিনাশের শক্তি। রস যখন সেখানে আসে তখনই প্রাণ আসে ; তখন সব শক্তি সেই রসের টানে ফুল ফোটায়, ফল ধরায় ; সৌন্দর্যে কল্যাণে সে উৎসবের রূপ ধারণ করে। বেলা আটটা বাজল । বারান্দার সামনে গোটা-দুইতিন মোটরগাড়ি জমা হয়েছে। স্বরেনে স্থনীতিতে মিলে নানা আয়তনের বাক্সে ব্যাগে ঝুলিতে থলিতে গাড়ি বোঝাই করছেন। তারা একদল আগে থাকতেই খেয়াঘাটের দিকে রওনা হবার অভিমুখী । নিকটের পাহাড়ের ঘনসবুজ অরণ্যের পরে রৌদ্র পড়েছে ; দূরের পাহাড় নীলাভ বাম্পে আবৃত। দক্ষিণ শৈলতটের সমূত্রখণ্ডটি নিশ্বাসের-ভাপ-লাগা আয়নার মতো মান । ওই কাছেই গিরিবক্ষসংলগ্ন পল্লীটির বনবেষ্টনের মধ্যে স্বপুরি গাছের শাখাগুলি শীতের বাতাসে তুলছে। ঝরনা থেকে . মেয়ের জলপাত্রে জল বয়ে আনছে। নীচে উপত্যকায় শস্তক্ষেত্রের ওপারে, সামনের পাহাড়ের গায়ে ঘন গাছের অবকাশে লোকালয়ের আভাস দেখা যায়। নারকেলগাছগুলি মেঘমুক্ত আকাশের দিকে পাতার অঞ্জলি তুলে ধরে স্বর্যালোক পান করছে। এখান থেকে বিদায় নেবার মুহূর্তে মনে মনে ভাবছি, দ্বীপটি সুন্দর, এখানকার লোকগুলিও ভালো, তবুও মন এখানে বাসা বাধতে চায় না। সাগর পার হয়ে ভারতবর্ষের আহবান মনে এসে পেচচ্ছে। শিশুকাল থেকে ভারতবর্ষের ভিতর দিয়েই বিশ্বের পরিচয় পেয়েছি বলেই যে এমন হয় তা নয় ; ভারতবর্ষের আকাশে বাতাসে আলোতে, নদীতে প্রাস্তরে, প্রকৃতির একটি উদারতা দেখেছি ; চিরদিনের মতো আমার মন তাতে ভুলেছে। সেখানে বেদন অনেক পাই, লোকালয়ে দুৰ্গতির যুতি চারি দিকে ; তবুও সমস্তকে অতিক্রম করে সেখানকার আকাশে অনাদি কালের ষেকণ্ঠধ্বনি শুনতে পাই তাতে একটি বৃহৎ মুক্তির আস্বাদ আছে। ভারতবর্ষের নীচের দিকে ক্ষুদ্রতার বন্ধন, তুচ্ছতার কোলাহল, হীনতার বিড়ম্বন, যত বেশি এমন আর কোথাও দেখি নি ; তেমনি উপরের দিকে সেখানে বিরাটের আসনবেদীর, অপরিসীমের অবারিত আমন্ত্রণ। অতি দূরকালের তপোবনের ওঙ্কারধ্বনি এখনো সেখানকার আকাশে যেন নিত্য-নিশ্বসিত। তাই, আমার মনের কাছে আজকের এই প্রশান্ত প্রভাত সেই দিকেই তার আলোকের ইঙ্গিত প্রসারিত করে রয়েছে। ইতি ৮ই সেপ্টেম্বর >>२१ H