পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (একবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৫৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ २२6ः ছন্তস্তকে পরিচয়লাভের পূর্বেই যিনি শকুন্তলা সম্বন্ধে আশ্বাস দিয়াছিলেন, তিনিই। তিনি মনের বাসনা ; তিনি মানুষকে সত্য মিথ্যা ঢের কথা অজস্র বলিয়া থাকেন ; কোনোটা খাটে, কোনোট খাটে না, ছন্তস্তের এবং আমারটা খাটিয়া গিয়াছিল। আমার এই অপরিচিত প্রতিবেশিনী বিবাহিত কি কুমারী কি ব্রাহ্মণ কি শূত্র, সে সংবাদ লওয়া আমার পক্ষে কঠিন ছিল না, কিন্তু তাহা করিলাম না, কেবল নীরব চকোরের মতো বহুসহস্ৰ ষোজন দূর হইতে আমার চন্দ্রমওলটিকে বেষ্টন করিয়া করিয়া উর্ধ্বকণ্ঠে নিরীক্ষণ করিবার চেষ্টা করিলাম । পুরদিন মধ্যাহ্নে একখানি ছোটো নৌকা ভাড়া করিয়া তীরের দিকে চাহিয়া জোয়ার বাহিয়া চলিলাম, মাল্লাদিগকে দাড় টানিতে নিষেধ করিয়া দিলাম । আমার শকুন্তলার তপোবনকুটিরটি গঙ্গার ধারেই ছিল। কুটিরটি ঠিক কন্ধের কুটিরের মতো ছিল না ; গঙ্গা হইতে ঘাটের সিড়ি বৃহৎ বাড়ির বারান্দার উপর উঠিয়াছে, বারান্দাটি ঢালু কাঠের ছাদ দিয়া ছায়াময়। আমার নৌকাটি যখন নিঃশব্দে ঘাটের সম্মুখে ভাসিয়া আসিল, দেখিলাম আমার নবযুগের শকুন্তলা বারান্দার ভূমিতলে বসিয়া আছেন , পিঠের দিকে একটা চৌকি, চৌকির উপরে গোটাকতক বই রহিয়াছে, সেই বইগুলির উপরে তাহার খোলা চুল স্তুপাকারে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তিনি সেই চেকিতে ঠেস্ দিয়া উর্ধ্বমুখ করিয়া উত্তোলিত বাম বাহুর উপর মাথা রাখিয়াছেন, নৌকা হইতে র্তাহার মুখ অদৃশু, কেবল স্বকোমল কণ্ঠের একটি স্বকুমার বক্ররেখা দেখা যাইতেছে, খোলা দুইখানি পদপল্পবের একটি ঘাটের উপরের সিড়িতে এবং একটি তাহার নীচের সিড়িতে প্রসারিত, শাড়ির কালো পাড়টি বাক হইয়া পড়িয়া সেই দুটি পা বেষ্টন করিয়া আছে। একখানা বই মনোযোগহীন শিথিল দক্ষিণ হস্ত হইতে স্রস্ত হইয়া ভূতলে পড়িয়া রহিয়াছে। মনে হইল, যেন মূর্তিমতী মধ্যাহলক্ষ্মী সহসা দিবসের কর্মের মাঝখানে একটি নিম্পদহন্রী অবসরপ্রতিমা । পদতলে গঙ্গা, সম্মুখে স্বদুর পরপার এবং উর্ধ্বে তীব্রতাপিত নীলাম্বর তাহাদের সেই অন্তরাত্মারূপিণীর দিকে, সেই দুটি খোলা পা, সেই অলসবিন্যস্ত বাম বাহু, সেই উৎক্ষিপ্ত বঙ্কিম কণ্ঠরেখার দিকে নিরতিশয় নিস্তন্ধ একাগ্রতার সহিত নীরবে চাহিয়া আছে । যতক্ষণ দেখা যায় দেখিলাম, দুই সজলপল্লব নেত্রপাতের দ্বারা দুইখানি চরণপদ্ম বারদ্বার নিছিয়া মুছিয়া লইলাম। * অবশেষে নৌকা যখন দূরে গেল, মাঝখানে একটা তীরতরুর আড়াল আসিয়া পড়িল, তখন হঠাৎ যেন কী একটা ক্ৰটি স্মরণ হইল, চমকিয়া মাৰিকে কছিলাম,