পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৪৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি ৩২১ হৃদয়ের সম্পর্ক সম্বন্ধে মহেন্দ্রের উচিত-অনুচিতের আদর্শ সাধারণের অপেক্ষ কিছু কড়া। পাছে মাতার অধিকার লেশমাত্র ক্ষুন্ন হয়, এই জন্য ইতিপূর্বে সে বিবাহের প্রসঙ্গমাত্র কানে আনিত না । আজকাল, আশার সহিত সম্বন্ধকে সে এমনভাবে রক্ষণ করিতে চায় যে, অন্য স্ত্রীলোকের প্রতি সামান্য কৌতুহলকেও সে মনে স্থান দিতে চায় না। প্রেমের বিষয়ে সে যে বড়ো খুতখুতে এবং অত্যস্ত থাটি, এই লইয়া তাহার মনে একটা গর্ব ছিল। এমন কি, বিহারীকে সে বন্ধু বলিত বলিয়া অন্য কাহাকেও বন্ধু বলিয়া স্বীকার করিতেই চাহিত না । অন্য কেহ যদি তাহার নিকট আকৃষ্ট হইয়া আসিত, তবে মহেন্দ্ৰ যেন তাহাকে গায়ে পড়িয়া উপেক্ষা দেখাইত, এবং বিহারীর নিকটে সেই হতভাগ্য সম্বন্ধে উপহাসতীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়া ইতরসাধারণের প্রতি নিজের একান্ত ঔদাসীন্য ঘোষণা করিত। বিহারী ইহাতে আপত্তি করিলে মহেন্দ্র বলিত, “তুমি পার বিহারী, যেখানে যাও তোমার বন্ধুর অভাব হয় না ; আমি কিন্তু যাকেতাকে বন্ধু বলিয়া টানাটানি করিতে পারি না ।” সেই মহেঞ্জের মন আজকাল যখন মাঝে মাঝে অনিবার্ষ ব্যগ্রতা ও কৌতুহলের সহিত এই অপরিচিতার প্রতি আপনি ধাবিত হইতে থাকিত তখন সে নিজের আদর্শের কাছে যেন খাটো হইয়া পড়িত । অবশেষে বিরক্ত হইয়া বিনোদিনীকে বাটী হইতে বিদায় করিয়া দিবার জন্য সে তাহার মাকে পীড়াপীড়ি করিতে আরম্ভ করিল। মহেন্দ্ৰ কহিল, “থাক্‌ চুনি । তোমার চোখের বালির সঙ্গে আলাপ করিবার সময় কই। পড়িবার সময় ডাক্তারি বই পড়িব, অবকাশের সময় তুমি আছ, ইহার মধ্যে সর্থীকে কোথায় আনিবে ।” আশা কহিল, "আচ্ছা, তোমার ডাক্তারিতে ভাগ বসাইব না, আমারই অংশ আমি বালিকে দিব ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “তুমি তো দিবে, আমি দিতে দিব কেন।” আশা যে বিনোদিনীকে ভালোবাসিতে পারে, মহেন্দ্র বলে, ইহাতে তাহার স্বামীর প্রতি প্রেমের পর্বতা প্রতিপন্ন হয় । মহেন্দ্র অহংকার করিয়া বলিত, “আমার মতো অনন্তনিষ্ঠ প্রেম তোমার নহে ।” আশা তাহা কিছুতেই মানিত না— ইহা লইয়া ঝগড়া করিত, কঁাদিত, কিন্তু তর্কে জিতিতে পারিত না । মহেন্দ্র তাহাদের দু-জনের মাঝখানে বিনোদিনীকে স্বচ্যগ্র স্থান ছাড়িয়া দিতে চায় না, ইহাই তাহার গর্বের বিষয় হইয়া উঠিল। মহেক্সের এই গর্ব আশার সহ হইত না, কিন্তু আজ সে পরাভব স্বীকার করিয়া কহিল, “আচ্ছা বেশ, আমার খাতিরেই তুমি আমার বালির সঙ্গে আলাপ করে।”