পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪২৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


সাহিত্যের পথে 83& তারা স্পষ্ট ব্যক্ত হতে পেরেছে বলেই সমাদৃত। এই ব্যক্ত রূপের সাহিত্যমূল্যটি নির্ণয় ও ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। এইজন্তেই সাহিত্যবিচারে অনেকেই ব্যক্তিপরিচয়ের দুরূহ কতব্যে ফঁকি দিয়ে শ্রেণীর পরিচয় দিয়ে থাকেন । এই সহজ পন্থাকে সাধারণত আমাদের দেশের পাঠকেরা অশ্রদ্ধা করেন না ; বোধ করি তার প্রধান কারণ, আমাদের দেশ জাত-মানার দেশ। মাহুষের পরিচয়ের চেয়ে জাতের পরিচয়ে আমাদের চোখ পড়ে বেশি । আমরা বড়োলোক বলি যার বড়ো পদ, বড়োমাহুষ বলি যার অনেক টাকা । আমরা জাতের চাপ, শ্রেণীর চাপ দীর্ঘকাল ধরে পিঠের উপর সহ করেছি ; ব্যক্তিগত মানুষ পংক্তিপূজক সমাজের তাড়নায় আমাদের দেশে চিরদিন সংকুচিত । বাধা রীতির বন্ধন আমাদের দেশে সর্বত্রই । এই কারণেই ষে সাধু-সাহিত্য আমাদের দেশে একদা প্রচলিত ছিল তাতে ব্যক্তির বর্ণনা ছিল শিষ্টসাহিত্যপ্রথাসম্মত, শ্রেণীগত। তখন ছিল কুমুদকহুলারশোভিত সরোবর; যুৰীজাতিমল্লিকামালতীবিকশিত বসন্তঋতু ; তখনকার সকল স্বনারীরই গমন গজেন্দ্রগমন, তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্ব দাড়িম্ব স্বমেরুর বাধা ছাদে। শ্রেণীর কুহেলিকার মধ্যে ব্যক্তি অদৃশু । সেই ঝাপসা দৃষ্টির মনোবৃত্তি আমাদের চলে গেছে তা বলতে পারি নে। এই ঝাপসা দৃষ্টিই সাহিত্য-রচনায় ও অনুভূতিতে সকলের চেয়ে বড়ো শক্র । কেননা সাহিত্যে রসরূপের স্বষ্টি । স্বষ্টি মাত্রের আসল কথাই হচ্ছে প্রকাশ । সেইজন্যেই দেখি, আমাদের দেশের সাহিত্যবিচারে ব্যক্তির পরিচয় বাদ দিয়ে শ্রেণীর পরিচয়ের দিকেই ঝোক দেওয়া হয় । সাহিত্যে ভালো-লাগা মন্দ-লাগা হল শেষ কথা । বিজ্ঞানে সত্যমিথ্যার বিচারই শেষ বিচার। এই কারণে বিচারকের ব্যক্তিগত সংস্কারের উপরে বৈজ্ঞানিকের চরম আপিল আছে প্রমাণে । কিন্তু, ভালো মন্দ লাগাটা রুচি নিয়ে ; এর উপরে আর-কোনো আপিল অধোগ্যতম লোকও অস্বীকার করতে পারে। এই কারণে জগতে সকলের চেয়ে আরক্ষিত অসহায় জীব হল সাহিত্যরচয়িতা। মুদুস্বভাব হরিণ পালিয়ে বঁাচে, কিন্তু কবি ধরা পড়ে ছাপার অক্ষরের কালো জালটায়। এ নিয়ে আক্ষেপ ক’রে লাভ নেই ; নিজের অনিবার্ষ কর্মফলের উপরে জোর খাটে না । রুচির মার যখন খাই তখন চুপ ক’রে সহ করাই ভালো ; কেননা সাহিত্যরচয়িতার ভাগ্যচক্রের মধ্যেই রুচির কুগ্রহ-স্বগ্রহের চিরনির্দিষ্ট স্থান। কিন্তু, বাইরে থেকে যখন জাগে উৰাবৃষ্টি, সন্মার্জনী হাতে আসে ধূমকেতু, আসে উপগ্রহের উপসর্গ, তখন মাথা চাপড়ে বলি, এ ষে মারের উপরি-পাওনা। বাংলাসাহিত্যের অন্তঃপুরে শ্রেণীর যাচনার বাহির হতে ঢুকে পড়েছে ; কেউ তাদের দ্বাররোধ করবার নেই। বাউলকবি দুঃখ