পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৩৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ २$ॐ ভূপতি ঈষৎ একটু আহত হইয়া কহিল, ”আচ্ছা, কাল থেকে আমি নিশ্চয় তোমাকে পড়াব। তোমার বইগুলো আনো দেখি, কী তুমি পড় একবার দেখে निझे ।” চারু । ঢের হয়েছে, তোমার আর পড়াতে হবে না। এখনকার মতো তোমার খবরের কাগজের হিসাবটা একটু রাখবে! এখন আর-কোনো দিকে মন দিতে পারবে কি না বলে । فـ ভূপতি কহিল, “নিশ্চয় পারব। এখন তুমি আমার মনকে যে দিকে ফেরাতে চাও সেই দিকেই ফিরবে।” চারু । আচ্ছা বেশ, তা হলে আমলের এই লেখাটা একবার পড়ে দেখো কেমন চমৎকার হয়েছে। , সম্পাদক অমলকে লিখেছে, এই লেখা পড়ে নবগোপালবাবু তাকে বাংলার রাস্কিন নাম দিয়েছেন। শুনিয়া ভূপতি কিছু সংকুচিতভাবে কাগজখানা হাতে করিয়া লইল । খুলিয়া দেখিল, লেখাটির নাম ‘আষাঢ়ের চাদ’ । গত দুই সপ্তাহ ধরিয়া ভূপতি ভারতগবর্মেন্টের বাজেট-সমালোচনা লইয়া বড়ে বড়ো অঙ্কপাত করিতেছিল, সেই-সকল অঙ্ক বহুপদ কীটের মতো তাহার মস্তিষ্কের নানা বিবরের মধ্যে সঞ্চরণ করিয়া ফিরিতেছিল— এমন সময় হঠাৎ বাংলা ভাষায় ‘আষাঢ়ের চাদ’ প্রবন্ধ আগাগোড়া পড়িবার জন্য তাহার মন প্রস্তুত ছিল না। প্রবন্ধটিও নিতান্ত ছোটো নহে। লেখাটা এইরূপে শুরু হইয়াছে— ‘আজ কেন আষাঢ়ের চাদ সারা রাত মেঘের মধ্যে এমন করিয়া লুকাইয়া বেড়াইতেছে। যেন স্বৰ্গলোক হইতে সে কী চুরি করিয়া আনিয়াছে, যেন তাহার কলঙ্ক ঢাকিবার স্থান নাই। ফাল্গুন মাসে যখন আকাশের একটি কোণেও মুষ্টিপরিমাণ মেঘ ছিল না তখন তো জগতের চক্ষের সম্মুখে সে নির্লজের মতো উন্মুক্ত আকাশে আপনাকে প্রকাশ করিয়াছিল— আর আজ তাহার সেই ঢলঢল হাসিখানি— শিশুর স্বপ্নের মতো, প্রিয়ার স্মৃতির মতো, সুরেশ্বরী শচীর অলকবিলম্বিত মুক্তার মালার মতো—’ ভূপতি মাথা চুলকাইয়া কহিল, “বেশ লিখেছে। কিন্তু আমাকে কেন। এ-সব কবিত্ব কি আমি বুঝি।” চারু সংকুচিত হইয়া ভূপতির হাত হইতে কাগজখানা কাড়িয়া কহিল, “তুমি তবে কী বোঝ।” ভূপতি কহিল, “আমি সংসারের লোক, আমি মানুষ বুঝি।” চারু কহিল, “মানুষের কথা বুঝি সাহিত্যের মধ্যে লেখে না ?”