পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৮৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ * ২৬৫ আর কার্পণ্য করি নাই। এটুকু বেশ বোঝা গেল, নববধূ বাংলাভাষাটি বেশ জানেন। র্তাহার চিঠিতে বানান-ভুল ছিল কি না তাহার উপযুক্ত বিচারক আমি নই– কিন্তু সাহিত্যবোধ ও ভাষাবোধ না থাকিলে এমন চিঠি লেখা যায় না, সেটুকু আন্দাজে বুঝিতে পারি। k স্ত্রীর বিদ্যা দেখিয়া সংস্বামীর যতটুকু গর্ব ও আনন্দ হওয়া উচিত তাহা অামার হয় নাই এমন কথা বলিলে আমাকে অন্যায় অপবাদ দেওয়া হইবে, কিন্তু তারই সঙ্গে একটু অন্য ভাবও ছিল। সে ভাবটুকু উচ্চদরের না হইতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিক। মুশকিল এই যে, যে উপায়ে আমার বিদ্যার পরিচয় দিতে পারিতাম সেটা বালিকার পক্ষে দুর্গম। সে যেটুকু ইংরেজি জানে তাহাতে বার্ক-মেকলের ছাদের চিঠি তাহার উপরে চালাইতে হইলে মশা মারিতে কামান দাগ হইত— মশার কিছুই হইত না, কেবল ধোয়া এবং আওয়াজই সার হইত। আমার যে তিনটি প্রাণের বন্ধু ছিল তাহাদিগকে আমার স্ত্রীর চিঠি না দেখাইয়৷ থাকিতে পারিলাম না। তাহারা আশ্চর্য হইয়া কহিল, “এমন স্ত্রী পাইয়াছ, ইহা তোমার ভাগ্য ।” অর্থাৎ, ভাষাস্তরে বলিতে গেলে এমন স্ত্রীর উপযুক্ত স্বামী আমি मझे । নিঝরিণীর নিকট হইতে পত্রোত্তর পাইবার পূর্বেই যে কখানি চিঠি লিখিয়া ফেলিয়াছিলাম তাহাতে হৃদয়োচ্ছাস যথেষ্ট ছিল, কিন্তু বানান-ভুলও নিতান্ত অল্প ছিল না। সতর্ক হইয়া লেখা যে দরকার তাহ তখন মনেও করি নাই। সতর্ক হইয়া লিখিলে বানান-ভুল হয়তে কিছু কম পড়িত, কিন্তু হৃদয়োচ্ছাসটাও মারা যাইত । এমন অবস্থায় চিঠির মধ্যস্থত ছাড়িয়া মোকাবিলায় প্রেমালাপই নিরাপদ । সুতরাং, বাবা অাপিসে গেলেই আমাকে কালেজ পালাইতে হইত। ইহাতে আমাদের উভয় পক্ষেরই পাঠচর্চায় যে ক্ষতি হইত, আলাপচর্চায় তাহ সুদস্থদ্ধ পোষণ করিয়া লইতাম। বিশ্বজগতে যে কিছুই একেবারে নষ্ট হয় না, এক আকারে যাহা ক্ষতি অন্য আকারে তাহা লাভ– বিজ্ঞানের এই তথ্য প্রেমের পরীক্ষাশালায় বারম্বার যাচাই করিয়া লইয়া একেবারে নিঃসংশয় হইয়াছি। এমন সময়ে আমার স্ত্রীর জাঠতুতো বোনের বিবাহকাল উপস্থিত— আমরা তো যথানিয়মে আইবুড়োভাত দিয়া খালাস, কিন্তু আমার স্ত্রী স্নেহের আবেগে এক কবিতা রচনা করিয়া লাল কাগজে লাল কালি দিয়া লিখিয়া তাহার ভগিনীকে না পাঠাইয়া থাকিতে পারিল না। সেই রচনাটি কেমন করিয়া বাবার হস্তগত হইল। বাবা তাহার বধুমাতার কবিতায় রচনানৈপুণ্য, সম্ভাবসৌন্দর্য, প্রসাদগুণ, প্রাঞ্জলতা ইত্যাদি