পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৬৫২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী * ذط\ সমীর কহিল,—মানুষের হাতে সব জিনিসই ক্রমশ কঠিন হইয়া উঠে। অসভ্যেরা যেমন-তেমন চীৎকার করিয়াই উত্তেজনা অকুভব করে, অথচ আমাদের এমনি গ্রহ যে, বিশেষ অভ্যাসসাধ্য শিক্ষাসাধ্য সংগীত ব্যতীত আমাদের স্কুখ নাই, আরো গ্রহ এই যে, ভালো গান করাও তেমনি শিক্ষাসাধ্য। তাহার ফল হয় এই যে, এক সময়ে যাহা সাধারণের ছিল, ক্রমেই তাহা সাধকের হইয়া আসে। চীৎকার সকলেই করিতে পারে, এবং চীৎকার করিয়া অসভ্য সাধারণে সকলেই উত্তেজনামুখ অনুভব করে—কিন্তু গান সকলে করিতে পারে না এবং গানে সকলে স্থখও পায় না। কাজেই সমাজ যতই অগ্রসর হয় ততই অধিকারী এবং অনধিকারী, রসিক এবং অরসিক, এই দুই সম্প্রদায়ের স্বষ্টি হইতে থাকে । ক্ষিতি কহিল,—মানুষ বেচারাকে এমনি করিয়া গড়া হইয়াছে যে, সে যতই সহজ উপায় অবলম্বন করিতে যায় ততই দুরূহতার মধ্যে জড়ীভূত হইয়া পড়ে । সে সহজে কাজ করিবার জন্ত কল তৈরি করে কিন্তু কল জিনিসটা নিজে এক বিষম দুরূহ ব্যাপার ; সে সহজে সমস্ত প্রাকৃত জ্ঞানকে বিধিবদ্ধ করিবার জন্ত বিজ্ঞান স্বষ্টি করে কিন্তু সেই বিজ্ঞানটাই আয়ত্ত করা কঠিন কাজ ; স্ববিচার করিবার সহজ প্রণালী বাহির করিতে গিয়া আইন বাহির হইল, শেষকালে আইনটা ভালো করিয়া বুঝিতেই দীর্ঘজীবী লোকের বারো আনা জীবন দান করা আবগুক হইয়া পড়ে ; সহজে আদানপ্রদান চালাইবার জন্ত টাকার স্বষ্টি হইল, শেষকালে টাকার সমস্ত এমনি একটা সমস্তা হুইয়া উঠিয়াছে যে, মীমাংসা করে কাহার সাধ্য। সমস্ত সহজ করিতে হুইৰে এই চেষ্টায় মানুষের জানাশোনা খাওয়া-দাওয়া আমোদপ্রমোদ সমস্তই অসম্ভব শক্ত হইয়া উঠিয়াছে। স্রোতস্বিনী কহিলেন,—সেই হিসাবে কবিতাও শক্ত হইয়া উঠিয়াছে ; এখন মানুষ খুব স্পষ্টত দুই ভাগ হইয়া গিয়াছে ; এখন অল্প লোক ধনী এবং অনেক নির্ধন, অল্প লোক গুণী এবং অনেক নিগুৰ্ণ ; এখন কবিতাও সর্বসাধারণের নহে, তাহা বিশেষ লোকের ; সকলই বুঝিলাম। কিন্তু কথাটা এই যে, আমরা ষে বিশেষ কৰিতার প্রসঙ্গে এই কথাটা তুলিয়াছি, সে কবিতাটা কোনো অংশেই শক্ত নহে ; তাহার মধ্যে এমন কিছুই নাই যাহা আমাদের মতো লোকও বুঝিতে না পারে—তাহা নিতান্তই সরল, অতএব তাহা যদি ভালো না লাগে তবে সে আমাদের বুঝিবার দোষে নহে। ক্ষিতি এবং সমীর ইহার পরে আর কোনো কথা বলিতে ইচ্ছা করিল না। কিন্তু ব্যোম অম্লান মুখে বলিতে লাগিল—বাহ সরল তাহাই যে সহজ এমন কোনো কথা নাই। অনেক সময় তাহাই অত্যন্ত কঠিন ; কারণ, সে নিজেকে বুঝাইবার জন্ত কোনো