পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৭৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Ψ54ύ- রবীন্দ্র-রচনাবলী ভক্তি হইতেই স্বর্গ উধ্বলোকে উদ্‌বাহিত হইতে থাকে ; সেই ভক্তিপুষ্প যদি শুষ্ক হইয়। যায় তবে, হে দ্বিজসত্তম, তেত্রিশ কোটি দেবতাও আমার এই পারিজাতমোদিত নন্দনবনবেষ্টিত স্বৰ্গলোক রক্ষা করিতে পারিবে না। সেই কারণে, মর্তের সহিত ধোগপ্রবাহ রক্ষা করিবার জন্ত মাঝে মাঝে নরলোকের নবনির্বাচিত দেবতাগুলিকে সাদরে স্বৰ্গে আবাহন করিয়া আনিতে হয়। হে ত্রিকালজ্ঞ, স্বর্গের ইতিহাসে এমন ঘটনা ইতিপূর্বেও ঘটিয়াছে। বৃহস্পতি। মেঘবাহন, সে-সমস্ত ইতিহাস আমার অগোচর নাই। কিন্তু ইতিপূর্বে যে-সকল নূতন দেবতা মর্ত হইতে স্বৰ্গলোকে উন্নীত হইয়াছিলেন র্তাহারা অভিজাত দেবগণের সহিত একাসনে বসিবার উপযুক্ত। সম্প্রতি ঘেটুপ্রমুখ যে-সমস্ত দেবতাগণ তোমার নিমন্ত্রণে স্বর্গে আসিয়া আশ্রয় লইয়াছেন তাহারা সুরসভার দিব্যজ্যোতি স্নান করিয়া দিয়াছেন। অদিতিনন্দন, আমার প্রস্তাব এই যে, তাহীদের জন্য একটি উপদেবলোক স্বজন করিবার জন্য বিশ্বকর্মর প্রতি বিশেষ ভারাপণ করা হয় । ইস্ত্র । বুধপ্রবর, তাহা হইলে সেই উপস্বৰ্গই স্বর্গ হইয়া দাড়াইবে এবং স্বর্গ উপসর্গ হইবে মাত্র। একমাত্র বেদমন্ত্রের উপর আমাদের স্বর্গ প্রতিষ্ঠিত | জর্মনদেশীয় পণ্ডিতগণের বহুল চেষ্টা সত্ত্বেও সে মন্ত্র এবং তাহার অর্থ সকলে বিস্তৃত হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু আমাদের নূতন আমন্ত্রিত দেবদেবীগণ, সায়নাচার্যের ভাষ্য, পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের পুরাতত্ত্ব অথবা তাহদের প্রাচ্যশিষ্যবর্গের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করিতেছেন না, তাহারা প্রতি দিনের সদ্য-আহরিত পূজা প্রাপ্ত হইয়া উপবাসী পুরাতন দেবতাদের অপেক্ষ অনেকগুণে প্রবল হইয়া উঠিয়াছেন। র্তাহাদিগকে স্বপক্ষে পাইলে আমরা নূতন বল লাভ করিতে পারিব। অতএব, গুরুদেব, প্রসন্নচিত্তে র্তাহাদের কণ্ঠে দেবমাল্য অর্পণ করিয়া তাহাদিগকে স্বৰ্গলোকে বরণ করিয়া লউন । বৃহস্পতি। আহে দুরবৃত্তা নিয়তি! মর্তলোকের প্রসাদলাভলালসায় কত পুরাতন দেবকুলপ্রদীপ ক্রমশ আপন দেবমর্যাদা বিসর্জন দিয়াছেন। দেবসেনাপতি কার্তিকেয় বীরবেশ পরিত্যাগ করিয়া সূক্ষ্মবসন লম্বকচ্ছে কামিনীমনোমোহন নির্লজ্জ নাগরমূর্তি ধারণ করিয়াছেন । গম্ভীরপ্রকৃতি গণপতি কদলীতরুর সহিত গোপনপরিণয়পাশে বদ্ধ হইয়াছেন এবং মহাযোগী মহেশ্বর গঞ্জিকা-ধুস্তুর-সিদ্ধি-পানে উন্মত্ত হইয়া মহাদেবীর সহিত অশ্রাব্য ভাষায় কলহ করিয়া নীচজাতীয় স্ত্রীপল্লীর মধ্যে আপন বিহারক্ষেত্র বিস্তার করিয়াছেন। সে-সমস্তই যখন একে একে সহ করিতে পারিয়াছি তখন বোধ করি দেবাসনে উপদেবতাগণের অধিরোহণদৃশ্যও এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ধৈর্ধকঠিন বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিতে পারিবে না। -