পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (চতুর্থ সম্ভার).djvu/৮৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ঐকাস্ত করা বগলস এখনো তাহার গলায় । নিঃসস্তান রমণীর একান্ত স্নেহের ধন এই কুকুরটা একাকী এই পরিত্যক্ত কুটীরের মধ্যে কি খাইয়া আজও ষে বাচিয়া আছে ভাবিয়া পাইলাম না। পাড়ায় ঢুকিয়া কাড়িয়া খাওয়ার ইহার জোরও নাই, অভ্যাসও নাই, স্বজাতির সঙ্গে ভাব করিয়া লইবার শিক্ষাও এ পায় নাই—অনশনে অৰ্দ্ধাশনে এইখানে পড়িয়াই এ-বেচারা বোধ হয় তাহারই পথ চাহিয়া আছে যে তাহাকে একদিন ভালোবাসিত। হয়ত ভাবে, কোথাও না কোথাও গিয়াছে, ফিরিয়া একদিন সে আসিবেই। মনে মনে বলিলাম, এই কি এমনি ? এ প্রত্যাশা নিঃশেষে মুছিয়া ফেলা সংসারে এতই কি সহজ ? যাইবার পূৰ্ব্বে চালের ফাক দিয়া ভিতরটায় একবার দৃষ্টি দিয়া লইলাম। অন্ধকারে দেখা কিছুই গেল না, শুধু চোখে পড়িল দেয়ালে সাট পটগুলি । রাজা-রাণী হইতে আরম্ভ করিয়া নানা জাতীয় দেবদেবতার প্রতিমূৰ্ত্তি নূতন কাপড়ের গাট হইতে সংগ্ৰহ করিয়া যশোদা ছবির সখ মিটাইত। মনে পড়িল ছেলেবেলায় মুগ্ধ চক্ষে এগুলি বহুবার দেখিয়াছি । বৃষ্টির ছাটে ভিজিয়া, দেয়ালের কাদা মাখিয়া এগুলি আজও কোনমতে টিকিয়া আছে। আর রহিয়াছে পাশের কুলুঙ্গিতে তেমনি দুর্দশায় পড়িয়া সেই রঙ-করা হাড়িটি। এর মধ্যে ধাকিত তাহার আলতার বাণ্ডিল, দেখামাত্রই সেকথা অামার মনে পড়িল । আরও কি কি যেন এদিকে-ওদিকে পড়িয়া আছে অন্ধকারে ঠাহর হইল না । তাহার সবাই মিলিয়া আমাকে প্রাণপণে কিসের মেন ইঙ্গিত করিতে লাগিল, কিন্তু সে ভাষা আমার অজানা । মনে হইল, বাড়ির এক কোণে এ যেন মৃতশিশুর পরিত্যক্ত খেলাঘর । গৃহস্থালীর নানা ভাঙা-চোরা জিনিস দিয়া সযত্বে রচিত তাহার এই ক্ষুদ্র সংসারটিকে সে ফেলিয়া গিয়াছে । আজ তাহাদের আদর নাই, প্রয়োজন নাই, আঁচল দিয়া বার বার ঝাড়া-মোছা করিবার তাগিদ গিয়াছে ফুরাইয়া - পড়িয়া আছে শুধু কেবল জঞ্জালগুলা কেহ মুক্ত করে নাই বলিয়া । সেই কুকুরটা একটুখানি সঙ্গে সঙ্গে আসিয়। ধামিল। যতক্ষণ দেখা গেল দেখিলাম সে বেচারা এইদিকে একদৃষ্টে চাহিয়া দাড়াইয়া আছে। তাহার সহিত পরিচয়ও এই প্রথম, শেষও এইখানে, তবু আগু বাড়াইয়া বিধায় দিতে আসিয়াছে । আমি চলিয়াছি কোন বন্ধুহীন লক্ষ্যহীন প্রবাসে, আর সে ফিরিবে তাহার অন্ধকার নিরালা ভাঙা ঘরে । এ-সংসারে পথ চাহিয়া প্রতীক্ষা করিতে উভয়েরই কেহ নাই । বাগানটার শেষে সে চোখের আড়ালে পড়িল, কিন্তু মিনিট-পাচেকের এই অভাগ্য সঙ্গীর জন্য বুকের ভিতরটা হঠাৎ হ-হু করিয়া কাদিয়া উঠিল, চোখের জল আর সামলাইতে পারি না এমনি দশা। চলিতে চলিতে ভাবিতেছিলাম, কেন এমন হয় ? আর কোন একটা দিনে এসৰ

    • ,