পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বাদশ সম্ভার).djvu/৬৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ কথায় রাখাল শুধু যে মুখেই আপত্তি করিয়াছে তাই নয়, মনের মধ্যেও তার ভয় আছে। কারণ, নিজের অবস্থা সম্বন্ধে সে অচেতন নয়। সে জানে এই কলিকাতা সহরে তাহার পরিচিত বন্ধু পরিধি যথেষ্ট সঙ্কুচিত না করিয়া পরিবার প্রতিপালন করা তাহার সাধ্যাতীত। যে পরিবেষ্টনে এতকাল সে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিয়াছে, সেখানে ছোট হইয়া থাকার কল্পনা করিতেও সে পরাম্মুখ। তথাপি, নিঃসঙ্গ জীবনের নান অভাব তাহাকে বাজে। বসন্তে বিবাহোৎসবের বঁশি মাঝে মাঝে তাহাকে উতলা করে, বরামুগমনের সাদর আমন্ত্রণে মনটা হয়তে হঠাৎ বিরূপ হইয়া উঠে, সংবাদপত্রে কোথায় কোন আত্মঘাতিনী অনুঢ়া কন্যার পাণ্ডুর মুখ অনেক সময়ে তাহাকে যেন দেখা দিয়া যায়, হয়তো বা মুকারণ অভিমানে কখনাে মনে হয়, সংসারে এত প্রাচুর্য, এত অভাব, এত সাধারণ, এত নিরস্তরের মধ্যে শুধু সেই কি কাহারো চোখে পড়ে না? শুধু তাহাকেই মালা দিতে কোথাও কোন কুমারীই কি নাই ? কিন্তু এ-সকল তাহার ক্ষণিকের। মোহ কাটিয়া যায়, আবার সে আপনাকে ফিরিয়া পায়—হাসে, আমোদ করে, ছেলে পড়ায়, সাহিত্যালোচনায় যোগ দেয়— আহ্বান আসিলে বিবাহের আসর সাজাইতে ছোটে, নব বর-বধূকে ফুলের তোড়া দিয়া শুভকামনা জানায় । আবার দিনের পর দিন যেমন কাটিতেছিল তেমনি কাটে । এতদিনের এই মনোভাবের এবার একটু পরিবর্তন ঘটিয়াছে দিল্লী হইতে ফিরিয়া। এবার সে দেখিয়াছে কলিকাতাই সমস্ত দুনিয়া নয়, ইহার বাহিরে বাঙালী বাস করে, তাহারাও ভদ্ৰ—তাহারাও মানুষ । তাহাকেও কন্যা দিতে প্রস্তুত এমন পিতামাতা আছে। কলিকাতায় যে সমাজ ও যে মেয়েদের সংস্পর্শে সে এতকাল আসিয়াছে, প্রবাসের সাধারণ ঘরের সে মেয়েগুলি হয়তো অনেক বিষয়ে খাটো। স্ত্রী বলিয়া পরিচয় করাইয়া দিতে আজও তাহার লজ্জা করিবে, তথাপি এই নূতন অভিজ্ঞতা তাহাকে সাস্তুনা দিয়াছে, ভরসা দিয়াছে। সংসারে কাহারো ভার গ্রহণের শক্তি তাহার নাই। পরের মুখে শেখা এই আত্মঅবিশ্বাস এতদিন সকল বিষয়েই তাহাকে দুৰ্ব্বল করিয়াছে। সে ভাবিয়াছে স্ত্রী-পুত্রকন্যা—তাহাদের কতদিকে কতরকমে প্রয়োজন, খাওয়-পরা বাড়ি-ভাড়া হইতে আরম্ভ করিয়া রোগ শোক বিদ্যা অজন-দাবীর মস্ত নাই ! এ মিটাইবে সে কোথা হইতে ? কিন্তু তাহার এই সংশয়ে প্রথম কুঠার হানিয়াছে সারদা—অকুল সমুদ্রমাঝে সে যেদিন তাহাকে আশ্রয় করিয়াছে—প্ৰত্যুত্তরে তাহাকেও সেদিন সে অভয় দিয়া বলিয়াছে, তোমার ভয় নেই সারদা, আমি তোমার ভার নিলাম। সারদা তাহাকে বিশ্বাস করিয়া ঘরে ফিরিয়াছে—বাচিতে চাহিয়াছে। এই পরের বিশ্বাসই রাখালকে এতদিনে নিজের প্রতি বিশ্বাস-বান করিয়াছে। আবার এই বস্তুটাই তাহার বহুগুণে বাড়িয়া গেছে, এবার প্রবাস হইতে ফিরিয়া। তাহার কেবল মনে হইয়াছে st te