পূরবী/পথিক/আকন্দ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আকন্দ

সন্ধ্যা আলাের সােনার খেয়া পাড়ি যখন দিলাে গগন পারে
অকূল অন্ধকারে,
ছম্‌ছমিয়ে এলাে রাতি ভুবন-ডাঙার মাঠে
এক্‌লা আমি গােয়ালপাড়ার বাটে।
নতুন-ফোটা গানের কুঁড়ি দেবাে ব’লে দিনুর হাতে আনি
মনে নিয়ে সুরের গুন্‌গুনানি
চ’লেছিলেম, এমন সময় যেন সে কোন্ পরীর কণ্ঠখানি
বাতাসেতে বাজিয়ে দিলাে বিনা-ভাষার বাণী;
ব’ল্‌লে আমায় “দাঁড়াও ক্ষণেক তরে,
ওগাে পথিক তােমার লাগি’ চেয়ে আছি যুগে যুগান্তরে।
আমায় নেবে চিনে।
সেই সুলগন এলাে এত দিনে।
পথের ধারে দাঁড়িয়ে আমি, মনে গােপন আশা,
কবির ছন্দে বাঁধ্‌বাে আমার বাসা।”
দেখা হ’লো, চেনা হ’লাে সাঁঝের আঁধারেতে,
ব’লে এলেম, তােমার আসন কাব্যে দেবো পেতে।
সেই কথা আজ প’ড়্‌লো মনে হঠাৎ হেথায় এসে
সাগর-পারের দেশে,—

মন-কেমনের হাওয়ার পাকে অনেক স্মৃতি বেড়ায় মনে ঘুরে
তা’রি মধ্যে বাজ্‌লাে করুণ সুরে
“ভুলাে না গাে ভুলো না এই পথ-বাসিনীর কথা,
আজো আমি দাঁড়িয়ে আছি, বাসা আমার কোথা?”
শপথ আমার, তােমরা বােলো তা’রে
তা’র কথাটি দাঁড়িয়েছিলাে মনের পথের ধারে,—
বােলাে তা’রে চোখের দেখা ফুটেছে আজ গানে,—
লিখন খানি রাখিনু এইখানে।



যেদিন প্রথম কবি-গান
বসন্তের জাগালাে আহ্বান
ছন্দের উৎসব সভা-তলে
সেদিন মালতী যুথী জাতি
কৌতুহলে উঠেছিলো মাতি’
ছুটে এসেছিলো দলে দলে।
আসিল মল্লিকা চম্পা কুরুবক কাঞ্চন করবী,
সুরের বরণ-মাল্যে সবারে বরিয়া নিলাে কবি।
কি সঙ্কোচে এলে না যে, সভার দুয়ার হ’লাে বন্ধ।
সব পিছে রহিলে আকন্দ॥

মােরে তুমি লজ্জা করো নাই,
আমার সম্মান মানি তাই,
আমারে সহজে নিলে ডাকি’।
আপনারে আপনি জানালে;
উপেক্ষার ছায়ার আড়ালে
পরিচয় রাখিলে না ঢাকি’।
মনে পড়ে একদিন সন্ধ্যাবেলা চ’লেছিনু একা,
তুমি বুঝি ভেবেছিলে কি জানি না পাই পাছে দেখা,
অদৃশ্য লিখনখানি, তােমার করুণ ভীরু গন্ধ
বায়ু ভরে পাঠালে আকন্দ॥



হিয়া মাের উঠিল চমকি’
পথ মাঝে দাঁড়ানু থমকি’,
তােমারে খুঁজিনু চারিধারে।
পল্লবের আবরণ টানি’
আছিলে কাব্যের দুয়ােরাণী
পথ-প্রান্তে গােপন আঁধারে।
সঙ্গী যারা ছিল ঘিরে তা’রা সবে নাম-গােত্রহীন
কাড়িতে জানে না তা’রা পথিকের আঁখি-উদাসীন।
ভরিল আমার চিত্ত বিস্ময়ের গভীর আনন্দ
চিনিলাম তােমারে আকন্দ॥

8

দেখা হয় নাই তােমা সনে
প্রাসাদের কুসুম কাননে,
জনতার প্রগল্‌ভ আদরে।
নিদ্রাহীন প্রদীপ আলােকে
পড়ােনি অশান্ত মাের চোখে
প্রমােদের মুখর বাসরে।
অবজ্ঞার নির্জ্জনতা তােমারে দিয়েছে কাছে আনি’,
সন্ধ্যার প্রথম তারা জানে তাহা, আর আমি জানি
নিভৃতে লেগেছে প্রাণে তােমার নিঃশ্বাস মৃদু মন্দ,
নম্র-হাসি উদাসী আকন্দ॥



আকাশের একবিন্দু নীলে
তােমার পরাণ ডুবাইলে,
শিখে নিলে আনন্দের ভাষা।
বক্ষে তব শুভ্র রেখা এঁকে
আপন স্বাক্ষর গেছে রেখে
রবির সুদূর ভালোবাসা।
দেবতার প্রিয় তুমি, গুপ্ত রাখাে গৌরব তােমার,
শান্ত তুমি, তৃপ্ত তুমি, অনাদরে তােমার বিহার।
জেনেছি তােমারে, তাই জানাতে রচিনু এই ছন্দ
মৌমাছির বন্ধু হে আকন্দ॥


চাপাড্‌ মালাল্‌,

১৬ ডিসেম্বর, ১৯২৪।