পূরবী/পূরবী/আগমনী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আগমনী

মাঘের বুকে সকৌতুকে কে আজি এলাে, তাহা
বুঝিতে পারাে তুমি?
শােনোনি কানে, হঠাৎ গানে কহিল, “আহা, আহা,”
সকল বনভূমি?
শুষ্ক জরা পুষ্প-ঝরা,
হিমের বায়ে কাঁপন-ধরা
শিথিল মন্থর;
“কে এলাে” বলি’ তরাসি’ উঠে শীতের সহচর।

গােপনে এলো, স্বপনে এলাে, এলাে সে মায়া-পথে,
পায়ের ধ্বনি নাহি।
ছায়াতে এলাে, কায়াতে এলাে, এলাে সে মনােরথে
দখিন-হাওয়া বাহি’।

অশােক-বনে নবীন পাতা
আকাশ পানে তুলিল মাথা,
কহিল, “এসেছাে কি?”
মর্ম্মরিয়া থরথর কাঁপিল আমলকী।

কাহারে চেয়ে উঠিল গেয়ে দোয়েল চাঁপা-শাখে
“শোনো গাে, শােনো শােনাে।”
শামা না জানে প্রভাতী-গানে কি নামে তা’রে ডাকে
আছে কি নাম কোনাে?
কোকিল শুধু মুহুর্মুহু
আপন মনে কুহরে কুহু
ব্যথায় ভরা বাণী।
কপােত বুঝি শুধায় শুধু, “জানি কি, তা’রে জানি?”

আমের বােলে কী কলরােলে সুবাস ওঠে মাতি’
অসহ উচ্ছ্বাসে।
আপন মনে মাধবী ভণে কেবলি দিবারাতি,
“মােরে সে ভালােবাসে।”
অধীর হাওয়া নদীর পারে
ক্ষ্যাপার মতাে কহিছে কা’রে
“বলাে তাে কী যে করি?”
শিহরি’ উঠি’ শিরীষ বলে, “কে ডাকে মরি, মরি!”

কেন যে আজি উঠিল বাজি’ আকাশ-কাঁদা বাঁশী
জানিস তাহা নাকি?
রঙীন যত মেঘের মতাে কী যায় মনে ভাসি’
কেন যে থাকি’ থাকি’?
অবুঝ তােরা, তাহারে বুঝি
দূরের পানে ফিরিস খুঁজি’;
বাহিরে আঁখি বাঁধা,
প্রাণের মাঝে চাহিস না যে তাই তাে লাগে ধাঁধা।

পুলকে-কাঁপা কনক-চাঁপা বুকের মধু-কোষে
পেয়েছে দ্বার নাড়া,
এমন ক’রে কুঞ্জ ভ’রে সহজে তাই তাে সে
দিয়েছে তা’রি সাড়া।
সহসা বন-মল্লিকা যে
পেয়েছে তা’রে আপন মাঝে,
ছুটিয়া দলে দলে
“এই যে তুমি, এই যে তুমি” আঙুল তুলে বলে।

পেয়েছে তা’রা, গেয়েছে তা’রা জেনেছে তা’রা সব
আপন মাঝখানে,
তাই এ শীতে জাগালাে গীতে বিপুল কলরব
দ্বিধা-বিহীন তানে।

ওদের সাথে জাগ্‌ রে কবি,
হৃৎকমলে দেখ্ সে ছবি,
ভাঙুক মােহ-ঘাের।
বনের তলে নবীন এলাে, মনের তলে তাের।

আলােতে তােরে দিক না ভ’রে ভােরের নব রবি,
বাজ্ রে বীণা, বাজ্।
গগন-কোলে হাওয়ার দোলে ওঠ্ রে দুলে, কবি,
ফুরালাে তাের কাজ।
বিদায় নিয়ে যাবার আগে
পড়ুক টান ভিতর বাগে,
বাহিরে পাস ছুটি।
প্রেমের ডােরে বাঁধুক তােরে বাঁধন যাক টুটি’॥


(* মাঘ, ১৩৩০)