পোকা-মাকড়/ষষ্ঠ শাখার প্রাণী/দ্বিপক্ষ পতঙ্গ/মাছি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


মাছি

 মাছি কত রকমের আছে, তাহা তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। কোনোটা ছোট, কোনোটা বড়। কোনোটার চোখ লাল, কোনোটার চোখ মেটে রঙের। কাহারো গায়ের রঙ্ সবুজ, কাহারো বা নীল। কেহ খাবারের উপরে বসিয়া খাবার শুষিয়া খায়, কেহ গোরু ঘোড়া ও কুকুরের গায়ে বসিয়া রক্ত টানিয়া লয়। এত রকম মাছির সবগুলিরই যদি পরিচয় দিতে হয়, তবে মাছির বিবরণ দিয়াই একখানা প্রকাণ্ড বই লেখার দরকার হইয়া পড়ে। আমরা তোমাদিগকে কেবল কয়েক জাতি সাধারণ মাছির জীবনের কথা বলিব।

 গ্রীষ্মকালে ক্রমাগত ভন্ ভন্ শব্দ করিয়া যে মাছিরা আমাদের জ্বালাতন করে, তাহাদিগকে তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। তাড়াইলে একটু দূরে পালায়, কিন্তু আবার তখনি ফিরিয়া গায়ের ঘাম চাটিয়া খাইতে সুরু করে।

 এখানে একটা মাছির মুখের ছবি দিলাম। দেখ, মাথার চিত্র ৬০—সাধারণ মাছির মুখ। দুই ধারে চোখ দুটা কত বড়। একএকটা চোখে দুই হাজার ছোট চোখ আছে। তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে, এই মাছিদের প্রত্যেকটিরই চারি হাজারটা চোখ আছে। কোন্ মাছি স্ত্রী এবং কোন্ মাছি পুরুষ তাহা চোখ দেখিয়া বুঝা যায়। স্ত্রী-মাছির চোখ দুটি প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো থাকে। কিন্তু পুরুষদের তাহা থাকে না, ইহাদের চোখ দুটার মধ্যে বেশ একটু ফাঁক্ দেখা যায়।

 মাছিদের ডানা কেমন পাত্‌লা, তাহা তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। উড়িবার সময়ে ইহারা ডানাগুলিকে এমন ঘন ঘন নাড়া দেয় যে, তাহাতে ভন্ ভন্ শব্দ বাহির হয়। মাছির মুখ দিয়া শব্দ করে না। ইহাদের পা কয়েকটি বড় মজার। বিড়ালের পায়ের তলায় যেমন উঁচু মাংসপিণ্ড থাকে, ইহাদের পায়ের নীচে সেই রকম দুটি উঁচু অংশ দেখা যায়। সেগুলি ছোট ছোট লোমে ঢাকা থাকে। মাছিরা যখন দেওয়ালের গায়ে পা লাগাইয়া হাঁটিয়া বেড়ায়, তখন ঐ-সকল লোম হইতে আঠার মত এক রকম জিনিস বাহির হইতে আরম্ভ করে। ইহা পা-গুলিকে দেওয়ালের গায়ে আট্‌কাইয়া রাখে।

 মাছির ডিম বোধ হয় তোমরা দেখ নাই, ডিমের রঙ্ প্রায় সাদা হয়। মাছিরা সাধারণত পচা গোবর, আবর্জ্জনা বা মরা প্রাণীর পচা দেহে ডিম পাড়ে। এই-সকল ডিম হইতে দুই এক দিনের মধ্যে, কখনো-বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুঁয়ো-পোকার মত বাচ্চা বাহির হয়। পায়খানার ময়লা বা মরা ইঁদুর-বেড়ালের গায়ে তোমরা হয় ত এই রকম মুড়ি-মুড়ি পোকা দেখিয়া থাকিবে। ইহাদের চোখ কান ও পা কিছুই থাকে না, এবং গায়ে শুঁয়োও থাকে না। কেঁচোদের মত বুকে হাঁটিয়া ইহারা চলা-ফেরা করে। যে-সকল বিশ্রী জিনিসের মধ্যে মাছির বাচ্চারা জন্মে সেই-সকল জিনিস খাইয়াই উহারা বড় হয়। কাজেই দেখা যাইতেছে, মাছিরা সংসারের কোনো উপকার না করিলেও, তাহাদের বাচ্চারা দুর্গন্ধ ও ময়লা জিনিস খাইয়া আমাদের কতকটা উপকার করে।

 যাহা হউক, পচা জিনিস খাইয়া মাছির বাচ্চারা বড় হইলে ইহারা পুত্তলি-অবস্থায় মাটির তলায় চুপ করিয়া পড়িয়া থাকে। আগেই বলিয়াছি, পুত্তলি-অবস্থায় থাকিবার জন্য ইহারা গায়ের উপরে বিশেষ কোনো আবরণ উৎপন্ন করে না। তখন গায়ের চামড়াই শক্ত হইয়া দাঁড়ায়। ডানা চোখ ইত্যাদি গজাইয়া উঠিলেই বাচ্চারা সেই আবরণ ছিঁড়িয়া সম্পূর্ণ মাছির আকারে বাহির হইয়া পড়ে। তার পরে ইহারা যে কি উৎপাতটাই করে, তাহা তোমরা সকলেই জান।

 মাছিদের সকল উৎপাত সহ্য করা যায়, কিন্তু ইহারা আমাদের রান্নাঘরে ও খাবারের ঘরে ঢুকিয়া সময়ে সময়ে যে অনিষ্ট করে, তাহা অতি ভয়ানক। নোংরা জায়গায় ঘুরিয়া বেড়ানো এবং নোংরা জিনিস খাওয়াই ইহাদের কাজ। গায়ে ও শুঁয়োতে ইহাদের যে-সকল লোম থাকে, তাহাতে নানা নোংরা জিনিস মাখাইয়া ইহারা যখন খাবারের উপরে বা গায়ের উপরে বেড়াইতে আরম্ভ করে, তখন বিশেষ ভয়ের কারণ হয়। জ্বরাতিসার, কলেরা, ডিপ্‌থেরিয়া ইত্যাদি অনেক রোগের বীজ পচা নর্দ্দামা ইত্যাদিতে জন্মে। মাছিরাও এই সব পচা জায়গায় বাস করে এবং ঐ-সকল রোগের বীজ পায়ে ও গায়ে মাখিয়া আমাদের খাবারের সঙ্গে মিশাইয়া দেয়। তার পরে রোগের বীজ-মিশানো খাবার খাইলেই লোকে প্রায়ই ঐ-সকল রোগে আক্রান্ত হয়।

 রান্নাঘরে যাহাতে মাছি না যাইতে পারে এবং তৈয়ারি খাবারের উপরে যাহাতে তাহার না বসিতে পারে, তোমরা তাহার উপরে নজর রাখিয়ো। দোকানের খাবারের উপরে যে কত রকম-বেরকম মাছি বসে, তাহার হিসাবই হয় না। এই সকল খাবার খাওয়া কখনই উচিত নয়।