বত্রিশ সিংহাসন/২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

জগজ্জ্যোতি সপ্তবিংশ পুত্তলিকা

হাঁ হাঁ করিয়া উঠিল, আর কহিল মহারাজ কি করিতেছ। আমি এক কথা বলি শ্রবণ কর।

 এক দিবস রাজা বিক্রমাদিত্য সভাতে বসিয়াছিলেন এমত সময়, এক কথা হইল যে, ইন্দ্রের তুল্য কোন রাজা নাই, কেননা তিনি দেবলোকে রাজ্য করেন। রাজা এই কথা শুনিয়া কোন উত্তর করিলেন না, কিন্তু বেতালকে ডাকিয়া আজ্ঞা করিলেন আমাকে ইন্দ্রপুরীতে লইয়া চল। বেতাল অজ্ঞামাত্র রাজাকে লইয়া বিমানরোহণ করিল, এবং মুহূর্তেকের মধ্যে ইন্দ্রের সভাতে উপস্থিত হইল। রাজা তথায় উপনীত হইয়া দেবরাজকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন এবং অঞ্জলিবন্ধনপর্ব্বক তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকিলেন। ইন্দ্র তাহাকে দেখিয়া বসিতে আজ্ঞা করিলেন। রাজা উপবেশন করিলে পর দেবরাজ তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। রাজা বলিলেন, স্বামিন আমি অবন্তী নগরের ভূপতি, আমার নাম বিক্রমাদিত্য, আমি আপনার পদ পঙ্কজ দর্শনাভিলাষে এখানে আসিয়াছি। দেবরাজ কহিলেন আমি তোমার নাম শ্রবণ করিয়াছি, এবং তোমার নিকট গিয়া সাক্ষাৎ করিব মানস করিয়াছিলাম, কিন্তু তুমি আপনি আসিয়াছ, ভালই হইল, যাহা হউক সম্প্রতি তোমার যে মনস্কামনা থাকে বল। রাজা বলিলে ন প্রভো আপনার কৃপাতে আমার সকলই আছে, কিছুর অভাব নাই, এবং আমার যাহা আছে তাহা সকলি আপনার দত্ত। দেবরাজ, রাজার এই কথায় প্রসন্ন ও প্রফুল্ল হইয়া তাহাকে স্বীয় মুকুট ও এক পুষ্পরথ প্রদান করিলেন, এবং আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন, যে ব্যক্তি তোমার রাজসিংহাসনের প্রতি কুদৃষ্টি করিবে সে অন্ধদশ প্রাপ্ত হইবে। রাজা বিক্রমাদিত্য এই মুকুট ও পুষ্পর থ প্রাপ্ত হইয়া আপন রাজধানীতে আসিলেন। তাঁহার আগমনে সমস্ত রাজধানীতে নানাবিধ আনন্দধ্বনি হইতে লাগিল।

 পুত্তলিকার প্রস্তাবে অনাস্থা ও অমনোযোগ করিয়া, ভোজরাজ সিংহাসনে পবেশনজন্য, এক হস্তে সিংহসন অবলম্বনপূর্ব্বক তাহাতে এক পদ উত্তোলন করিলেন। পরে দ্বিতীয় পদ তুলিয়া তাহার উপরে বসিবেন, এমত সময়ে একবারে অন্ধ ও অবশাঙ্গ হইয়া উন্মত্তের ন্যায় কথা কহিতে লাগিলেন। পরে সিংহাসন হইতে হস্ত টানিয়া লইবার ইচ্ছা করিলেন, কিন্তু পারিলেন না, হস্ত সিংহাসনেই লাগিয়া রহিল। এই রহস্য দেখিয়া পুত্তলিকাগণ হাস্থ্য করিতে লাগিল। সভাস্থ সমস্ত লোক বিস্ময়য়ুক্ত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিল, রাজা কিনির্বোধের কর্ম্ম করিলেন, পুত্তলিকার বাক্যে অবহেলন করিয়া কেন সিংহাসনে পদার্পণ। করিলেন। তখন ভােজরাজ মনে মনে বড়ই লজ্জিত হইলেন। পুত্তলিকা কহিল অরে মুখ তুমি আমার বাক্য শুনিলেন, তাহার এই প্রতিফল পাইলে, এখন তােমার দশা কি হইবে। ভােজরাজ বলিলেন আমার উদ্ধারের উপায় বল। পুত্তলিকা বলিল তুমি, রাজা বিক্রমাদিত্যের নাম স্মরণ কর, তাহা হইলে এই বিপদ হইতে পরিত্রাণ পাইবে। ইহা শুনিয়া ভােজরাজ বিক্রমাদিত্যের যােবন করিতে লাগিলেন। তাহাতে সিংহাসন হইতে হস্ত স্বতন্ত্র হইল, এবং অন্ধতা ও উন্মত্ততা দুর হইল। তদনন্তর রাজা অতিশয় ভীত হইয়া সিংহাসন হইতে অবতরণ পূর্ব্বক নীচে দাড়াইলেন। তখন সভাস্থ সমস্ত লােক বলিল এই কলিযুগে রাজা বিক্রমাদিত্যের তুল্য হওয়া কঠিন। পুত্তলিকা বলিল আমি এই জন্যই নিষেধ করিয়াছিলাম, হে ভােজরাজ তুমি আমার কথা অলীক জ্ঞান করিও না। তুমি বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছ বটে, কিন্তু জ্ঞান এক স্বতন্ত্র পদার্থ, তাহা ভােমার নাই। তুমি বিক্রমাদিত্যকে আপনার তুল্য বিবেচনা করিওনা। তিনি দেবতুল্য মনুষ্য ছিলেন, ততুল্য জ্ঞান ও তপস্যা তােমার নাই। অতএব তুমি আর এই সিংহাসনোপবেশনে আশা করিওনা, ইহা তােমার দুরাশা মাত্র। পৃথিবীতে আর আর অনেক কর্ম্ম আছে তাহা কর এবং যাহাতে তােমার রাজ্য স্থির থাকে, তোমার প্রতাপ ও প্রভাব বৃদ্ধি হয় এবং জগন্মলে চিরস্থায়িনী কীর্তি থাকে তাহা কর। এই প্রকারে সে দিবস নিস্ফল গেল। রাজা অন্তঃপুরে গিয়া নানা চিন্তায় রজনী বঞ্চন করিলেন। পরদিবস প্রত্যুষে পুনর্বার সিংহাসনের নিকটে আসিলে,