ব্যঙ্গকৌতুক/প্রত্নতত্ত্ব

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


প্রাচীন ভারতে গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ছিল কি না ও অক্সিজেন বাষ্পের কী নাম ছিল

বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর সন্দেহ নাই , কিন্তু তাই বলিয়া যে একেবারেই এ সম্বন্ধে কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করা যাইতে পারে না ইহা আমরা স্বীকার করি না । প্রাচীন ভারতে ইতিহাস ছিল না , এ কথা অশ্রদ্ধেয় । প্রকৃত কথা , আধুনিক ভারতে অনুসন্ধান ও গবেষণার নিতান্ত অভাব । বর্তমান প্রবন্ধ পাঠ করিলেই পাঠকেরা দেখিবেন , আমাদের অনুসন্ধানের ত্রুটি হয় নাই এবং তাহাতে যথেষ্ট ফললাভও হইয়াছে ।

প্রাচীন ভারতে গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ছিল কি না ও অক্সিজেন বাষ্পের কী নাম ছিল , তাহার মীমাংসা করিবার পূর্বে কীট্টকভট্ট ও পুণ্ড্রবর্ধন মিশ্রের জীবিতকাল নির্ধারণ করা বিশেষ আবশ্যক ।

প্রথমত , কীট্টকভট্ট কোন্‌ রাজার রাজত্বকালে বাস করিতেন সেইটি নিঃসংশয়রূপে স্থির করা যাউক । এ সম্বন্ধে মতভেদ আছে । কেহ বলেন , তিনি পুরন্দরসেনের মন্ত্রী , অন্য মতে তিনি বিজয়পালের সভাপণ্ডিত ছিলেন । দেখিতে হইবে পুরন্দরসেন কয়জন ছিলেন এবং তাঁহাদের মধ্যে কে মিথিলায় , কে উৎকলে এবং কেই বা কাশ্মীরে রাজত্ব করিতেন । এবং তাঁহাদের মধ্যে কাহার রাজত্বকাল খৃস্ট-শতাব্দীর পাঁচ শত বৎসর পূর্বে , কাহার নয় শত বৎসর পরে এবং কাহারই-বা খৃস্ট-শতাব্দীর সমসাময়িক কালে । বোধনাচার্য তাঁহার রাজাবলী গ্রন্থে লিখিয়াছেন , পরম্পারম্প্রথিত-পথিকৌ (মধ্যে পুঁথির দুই পাতা পাওয়া যায় নাই) লসত্যসৌ । এই শ্লোকের অর্থ সম্বন্ধে পুরাতত্ত্বকোবিদ্‌ পণ্ডিতপ্রবর মধুসূদন শাস্ত্রীমহাশয়ের সহিত আমাদের মতের ঐক্য হইতেছে না।

কারণ , নৃপতিনির্ঘন্ট গ্রন্থে উতঙ্কসূরি লিখিতেছেন–নিগ..নন্দ..পরন্ত..ঞ্জং । ইহার মধ্যে যেটুকু অর্থ ছিল , তাহার অধিকাংশই কীটে নিঃশেষপূর্বক পরিপাক করিয়াছে । যতটুকু অবশিষ্ট আছে তাহা বোধনাচার্যের লেখনের কোনো সমর্থন করিতেছে না ইহা নিশ্চয় ।

কিন্তু উভয়ের লেখার প্রামাণিকতা তুলনা করিতে গেলে , বোধনাচার্য ও উতঙ্কসূরির জন্মকালের পূর্বাপরতা স্থির করিতে হয়।

দেখা যাউক , চীন-পরিব্রাজক নিন্‌ফু বোধনাচার্য সম্বন্ধে কী বলেন । দুর্ভাগ্যক্রমে কিছুই বলেন না।

আমরা আরব-ভ্রমণকারী আল্‌করীম , পর্‌টুগীজ ভ্রমণকারী গঞ্জলিস ও গ্রীক দার্শনিক ম্যাক্‌ডীমসের সমস্ত গ্রন্থ অনুসন্ধান করিলাম । প্রথমত ইহাদের তিন জনের ভ্রমণকাল নির্ণয় করা ঐতিহাসিকের কর্তব্য । আমরাও তাহাতে প্রস্তুত আছি । কিন্তু প্রবন্ধ-সংক্ষেপের উদ্দেশ্যে তৎপূর্বে বলা আবশ্যক যে , উক্ত তিন ভ্রমণকারীর কোনো রচনায় বোধনাচার্য অথবা উতঙ্কসূরির কোনো উল্লেখ নাই । নিন্‌ফুর গ্রন্থে হ্লাও-কো-নামক এক ব্যক্তির নির্দেশ আছে। পুরাতত্ত্ববিদ্‌মাত্রেই হলাও-কো নাম বোধনাচার্য নামের চৈনিক অপভ্রংশ বলিয়া স্পষ্টই বুঝিতে পারিবেন । কিন্তু হ্লাও-কো বোধনাচার্যও হইতে পারে , শম্বরদত্ত হইতেও আটক নাই।

অতএব পুরন্দরসেন একজন ছিলেন কি অনেক জন ছিলেন কি ছিলেন না , প্রথমত তাহার কোনো প্রমাণ নাই । দ্বিতীয়ত , উক্ত সংশয়াপন্ন পুরন্দরসেনের সহিত কীট্টকভট্ট অথবা পুণ্ড্রবর্ধন মিশ্রের কোনো যোগ ছিল কি না ছিল , তাহা নির্ণয় করা কাহারো সাধ্য নহে।

অতএব , উক্ত কীট্টকভট্ট ও পুণ্ড্রবর্ধন মিশ্রের রচিত মোহান্তক ও জ্ঞানাঞ্জন-নামক গ্রনেথ যদি গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেন বাষ্পের কোনো উল্লেখ না পাওয়া যায় , তবে তাহা হইতে কী প্রমাণ হয় বলা শক্ত । শুদ্ধ এই পর্যন্ত বলা যায় যে , উক্ত পণ্ডিতদ্বয়ের সময়ে গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেন আবিস্কৃত হয় নাই । কিন্তু সে সময়টা কী তাহা আমি অনুমান করিলে মধুসূদন শাস্ত্রীমহাশয় প্রতিবাদ করিবেন এবং তিনি অনুমান করিলে আমি প্রতিবাদ করিব , তাহাতে সন্দেহ নাই।

অতএব , কীট্টক ও পুণ্ড্রবর্ধনের নিকট এইখানে বিদায় লইতে হইল । তাঁহাদের সম্বন্ধে আলোচনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হইল , এজন্য পাঠকদিগের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করি । কিন্তু তাঁহাদিগকে বিবেচনা করিয়া দেখিতে হইবে যে , প্রথমত নন্দ উপনন্দ আনন্দ ব্যোমপাল ক্ষেমপাল অনঙ্গপাল প্রভৃতি আঠারো জন নৃপতির কাল ও বংশাবলী-নির্ণয় সম্বন্ধে মধুসূদন শাস্ত্রীর মত খন্ডন করিয়া সোমদেব চৌলুকভট্ট শঙ্কর কৃপানন্দ উপমন্যু প্রভৃতি পণ্ডিতের জীবিতকাল নির্ধারণ করিতে হইবে ; তাহার পর তাঁহাদের রচিত বোধপ্রদীপ আনন্দসরিৎ মুগ্ধচৈতন্যলহরী প্রভৃতি পঞ্চান্নখানি গ্রন্থের জীর্ণাবশেষ আলোচনা করিয়া দেখাইব , উহাদের মধ্যে কোনো গ্রন্থেই গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি অথবা অক্সিজেনের নামগন্ধ নাই । উক্ত গ্রন্থসমূহে ষট্‌চক্রভেদ সর্পদংশনমন্ত্র রক্ষাবীজ আছে এবং একজন পণ্ডিত এমনও মত ব্যক্ত করিয়াছেন যে , স্বপ্নে নিজের লাঙ্গুল দর্শন করিলে ব্রাহ্মণকে ভূমিদান ও কুণ্ডপতনক-নামক চাতুর্মাস্য ব্রতপালন আবশ্যক ; কিন্তু ব্যাটারি ও বাষ্প বিষয়ে কোনো বর্ণনা বা বিধান পাওয়া গেল না । আমরা ক্রমশ ইহার বিস্তারিত সমালোচনা করিয়া ইতিহাসহীনতা সম্বন্ধে ভারতের দুর্নাম দূর করিব ; প্রাচীন গ্রন্থ হইতেই স্পষ্ট প্রমাণ করিয়া দিব যে , পুরাকালে গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ভারতখণ্ডে ছিল না এবং সংস্কৃত ভাষায় অক্সিজেন বাষ্পের কোনো নাম পাওয়া যায় না ।

মধুসূদন শাস্ত্রীমহাশয় কর্তৃক উক্ত প্রবন্ধের প্রতিবাদ

আমাদের ভারত-ইতিহাস-সমুদ্রের পাতিহাঁস , বঙ্গসাহিত্যকুঞ্জের গুঞ্জোন্মত্ত কুঞ্জবিহারীবাবু কলম ধরিয়াছেন ; অতএব প্রাচীন ভারত , সাবধান! কোথায় খোঁচা লাগে কি জানি । অপোগণ্ডের যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকিবে তবে নিজের সুধাভাণ্ডে দণ্ডপ্রহার করিতে প্রবৃত্তি হইবে কেন! অথবা বহুদর্শী প্রাচীন ভারতকে সাবধান করা বাহুল্য , উদ্যতলেখনী কুঞ্জবিহারীকে দেখিয়া তিনি পবিত্র উত্তরীয়ে সর্বাঙ্গ আবৃত করিয়া বসিয়া আছেন । তাই আমাদের এই আমড়াতলার দামড়াবাছুরটি প্রাচীন ভারতে গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি এবং অক্সিজেনের সংস্কৃত নাম খুঁজিয়া পাইলেন না । ধন্য তাঁহার স্বদেশহিতৈষিতা!

আমাদের দেশে যে এক কালে গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি এবং অক্সিজেন বাষ্প আবিষ্কৃত হইয়াছিল , ভাই বাঙালি , এ কথা তুমি বিশ্বাস করিবে কেন ? তাহা হইলে তোমার এমন দশা হইবে কেন ? আজ যে তুমি লাঞ্ছিত , গঞ্জিত , তিরস্কৃত , পরপদানত , অন্নবস্ত্রহীন , দাসানুদাস ভিক্ষুক , জগতে তোমার এমন অবস্থা হয় কেন ? কোন্‌ দিন তুমি এবং তোমাদের সাহিত্য-সংসারের এই সার সঙটি বলিয়া বসিবেন , অসভ্য ভারতের বাতাসে অক্সিজেন বাষ্পই ছিল না এবং বিদ্যুৎ খেলাইতে পারে ভারতের অশিক্ষিত আকাশ এমন এন্‌লাইটেণ্ড্‌ ছিল না ।

ভাই বাঙালি , তুমি এন্‌লাইটেণ্ড্‌ , বাতাসের সঙ্গে তুমি অনেক অক্সিজেন বাষ্প টানিয়া থাক এবং তোমার চোখে মুখে বিদ্যুৎ খেলে । আমি মুর্খ , আমি কুসংস্কারচ্ছন্ন তাই , ভাই , আমি বিশ্বাস করি প্রাচীন ভারতে গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ছিল এবং অক্সিজেন বাষ্পের অস্তিত্বও অবিদিত ছিল না । কেন বিশ্বাস করি ? আগে নিষ্ঠার সহিত কূর্ম কল্কি ও স্কন্দ পুরাণ পাঠ করো , গো এবং ব্রাহ্মণের প্রতি ভক্তি স্থাপন করো , ম্লেচ্ছের অন্ন যদি খাইতে ইচ্ছা হয় তো গোপনে খাইয়া সমাজে অস্বীকার করো , যতটুকু নব্য শিক্ষা হইয়াছে সম্পূর্ণ ভুলিয়া যাও , তবে বুঝিতে পারিবে কেন বিশ্বাস করি । আজ তোমাকে যাহা বলিব তুমি হাসিয়া উড়াইয়া দিবে । আমার যুক্তি তোমার কাছে অজ্ঞের প্রলাপ বলিয়া প্রতীয়মান হইবে ।

তবু একবার জিজ্ঞাসা করি , কীটে যতটা খাইয়াছে এবং মুসলমানে যতটা ধ্বংস করিয়াছে , তাহার কি একটা হিসাব আছে! যে পাপিষ্ঠ যবন ভারতের পবিত্র স্বাধীনতা নষ্ট করিয়াছে , ভারতের গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারির প্রতি যে তাহারা মমতা প্রর্দশন করিবে ইহাও কি সম্ভব! যে ম্লেচ্ছগণ শত শত আর্যসন্তানের পবিত্র মস্তক উষ্ণীষ ও শিখা-সমেত উড়াইয়া দিয়াছিল , তাহারা যে আমাদের পবিত্র দেবভাষা হইতে অক্সিজেন বাষ্পটুকু উড়াইয়া দিবে ইহাতে কিছু বিচিত্র আছে ?

এই তো গেল প্রথম যুক্তি । দ্বিতীয় যুক্তি এই যে , যদি যবনগণের দ্বারাই গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেনের প্রাচীন নাম লোপ না হইবে , তবে তাহা গেল কোথায়–তবে কোথাও তাহার কোনো চিহ্ন দেখা যায় না কেন ? প্রাচীন শাস্ত্রে এত শত ঋষি-মুনির নাম আছে , তন্মধ্যে গল্বন ঋষির নাম বহু গবেষণাতেও পাওয়া যায় না কেন ? যে পবিত্র ভারতে দধীচি বজ্রনির্মানের জন্য নিজ অস্থি ইন্দ্রকে দান করিয়াছেন , ভীমসেন গদাঘাতের দ্বারা জরাসন্ধকে নিহত করিয়াছেন এবং জহ্নুমুনি গঙ্গাকে এক গণ্ডূষে পান করিয়া জানু দিয়া নিঃসারিত করিয়াছেন , যে ভারতে ঋষিবাক্যপালনের জন্য বিন্ধ্যপর্বত আজিও নতশির , সেই ভারতের সাহিত্য হইতে অক্সিজেন বাষ্পের নাম পর্যন্ত যে লুপ্ত হইয়াছে , সর্বসংহারক যবনের উপদ্রবই যদি তাহার কারণ না হয় , তবে হে বাঙালি , তাহার কী কারণ আছে জিজ্ঞাসা করি ।

তৃতীয় যুক্তি এই যে , ইতিহাসের দ্বারা সম্পূর্ণ প্রমাণ হইয়া গিয়াছে যে , যবনেরা প্রাচীন ভারতের বহুতর কীর্তি লোপ করিয়াছে । এ কথা আজ কেহই অস্বীকার করিতে পারিবেন না । আজ যে আমরা নিন্দিত অপমানিত ভীত ত্রস্ত ভয়গ্রস্ত রিক্তহস্ত অস্তংগমিতমহিমা পরাধীন হইয়াছি , ভারতে যবনাধিকারই তাহার একমাত্র কারণ । এতটা দূরই যদি স্বীকার করিতে পারিলাম , তবে আমাদের গ্যাল্‌ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেনের নামও যে সেই দুরাত্মারাই লোপ করিয়াছে এটুকু যোগ করিয়া দিতে কুন্ঠিত হইবার তিলমাত্র কারণ দেখি না ।

চতুর্থ যুক্তি , যখন এক সময়ে যবন ভারত অধিকার করিয়াছিল এবং নির্বিচারে বহুতর পূত মস্তক ও মন্দিরচূড়া ভগ্ন করিয়াছিল , যখন অনায়াসে যবনের স্কন্ধে সমস্ত দোষারোপ করা যাইতে পারে এবং সেজন্য কেহ লাইবেলের মকদ্দমা আনিবে না , তখন যে ব্যক্তি সভ্যতার কোনো উপকরণ সম্বন্ধে প্রাচীন ভারতের দৈন্য স্বীকার করে সে পাষণ্ড , হৃদয়হীন , বিকৃতমস্তিষ্ক এবং স্বদেশদ্রোহী! অতএব , তাহার কথার কোনো মূল্য থাকিতে পারে না ; সে যে-সকল প্রমাণ আহরণ করে কোনো প্রকৃত নিষ্ঠাবান ধর্মপ্রাণ হিন্দুসন্তান তাহাকে প্রমাণ বলিয়া গণ্য করিতেই পারেন না ।

এমন যুক্তি আমরা আরও অনেক দিতে পারি । কিন্তু আমরা হিন্দু , পৃথিবীতে আমাদের মতো উদার , আমাদের মতো সহিষ্ণু জাতি আর নাই । আমরা পরের মতের উপর কোনো হস্তক্ষেপ করিতে চাহি না । অতএব আমাদের সর্বপ্রধান যুক্তি বাপান্ত , অর্ধচন্দ্র এবং ধোপা-নাপিত-রোধ ।