মধুমল্লী/লঘুক্রিয়া

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

লঘুক্রিয়া

 গ্রীষ্মের ছুটীর পর যেদিন স্কুল কলেজ খুলিবে, তাহার দুইদিন পূর্ব্বে ব্রেকফাষ্টের সময়, অ্যালিস তাহার খুল্ল পিতামহের বাহুর উপর হেলিয়া পড়িয়া আদর মাখা স্বরে তাঁহাকে অনুরোধ করিল “দাদা! ফ্যানীর ছুটী শেষ হ’লো, সে চ’লে যাবে, তাকে যেতে বারণ কর না দাদা!” ফ্যানী তাহার সঙ্গীতধ্যাপকের কন্যা, কলিকাতায় কোন বালিকাবিদ্যালয়ের শিল্প-শিক্ষয়িত্রী, গ্রীষ্মাবকাশে পিতার নিকট মৃজাপুরে আসিয়াছিল, স্কুল খুলিবার সময় হওয়ায় ফিরিয়া যাইবার উদ্যোগ করিতেছে।

 অ্যালিস পিতামহের বড় আদুরে। সে যাহা আবদার ধরিত, তিনি নির্ব্বিচারে তাহাই পালন করিতেন। ছোট বেলা হইতে অত্যধিক আদর দিয়া তিনিই তাহাকে এত বড় একগুঁয়ে তৈরি করিয়া তুলিয়াছিলেন। আজিকার এই অসঙ্গত অনুরোধে দাদা মশাই যখন হাসিয়া বলিলেন; “এই দেখো, পাগলী মেয়ে কোথা থেকে একটা হুকুম নিয়ে এলো।”—আর তার উত্তরে অ্যালিস তাঁহার দেহের উপর আরো একটু হেলিয়া আবদারের সঙ্গে বলিতে লাগিল, “না দাদা সত্যি, ওকে থাক্‌তে বলোনা। ওকে আমার খুব ভাল লাগে, ও এবার থেকে আমাদের বাড়ী থাক্।” তখন টেবিলের অপর পার্শ্বে বসিয়া, যে এতক্ষণ চুপ করিয়া চা পান করিতেছিল, সেই ব্যক্তি চা পান বন্ধ করিয়া বিরক্ত স্বরে বলিল “লিসা! তোর এ সব ভারি অন্যায় কথা। ও তোর কথায় চাকরী ছেড়ে দেবে নাকি? তুই আজকাল ভারী আবদার আরম্ভ করেছিস্ যে দেখতে পাই।” এই যুবক অ্যালিসেরই বড় ভাই। নাম চার্লস ফষ্টার, হেন্‌রী ফষ্টারের ভ্রাতুষ্পৌত্র এবং তাঁহার সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী। যুবক ফষ্টার সুশ্রী, সবল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি-ভূষণে ভূষিত। সম্প্রতি দাদা মহাশয়ের আদেশে পড়া শুনা ছাড়িয়া আসিয়াছে। হেন্‌রীর ইচ্ছা ভ্রাতুষ্পৌত্ত্রও তাঁহার মত ব্যবসা কার্য্য এই সময় হইতেই শিক্ষা করে। এই ঊষ্ণস্বভাব যুবা তাহার খুল্লপিতামহের কম স্নেহের পাত্র ছিল না, তথাপি চার্লসের বিশ্বাস, দাদা অ্যালিসকে তাহাপেক্ষাও অধিকতর ভাল বাসেন। একথা সে প্রকাশ্যে ও অনেকবার বলিয়াছে এবং তাহা শুনিয়া তাহার দাদা একটু স্নেহের হাসি হাসিয়াছেন মাত্র, প্রতিবাদ করেন নাই। আজ ভাইয়ের কাছে ধমক খাইয়া অভিমানিনী অ্যালিস, সক্রোধে অর্দ্ধভুক্ত বিস্কুটখানা পাত্র-সমেত সশব্দে ঠেলিয়া দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার চোখে জল আসিয়া পড়িয়াছিল। হেনরী ব্যস্ত হইয়া তাহার হাত ধরিয়া ফেলিলেন ও বলিলেন, “যাস কোথা লিসা? বোস্ বোস্! চার্লি, তুমি ওকে অমন করে ব’লো না, আহা ছেলে মানুষ, অল্পেই মনে আঘাত পায়। আচ্ছা লিসা, তোর ফ্যানী সেখানে কত মাইনে পায় বলতো রে?” অ্যালিস অভীষ্ট সিদ্ধির সুযোগ বুঝিয়া আসন গ্রহণ করিয়া হৃষ্টচিত্তে বলিল “বড় কম পায় দাদা—বড় কম। প্রত্যহ তিন ঘণ্টা পরিশ্রম ক’রে, মাসে কুড়ি টাকা পায়, তাতে কখনো মানুষের চলে? তাই জন্যে ও আবার একজনদের বাড়ী বাজনা শেখায়, শেলাই শেখায়, আহা ও যা সুন্দর শেলাই করে, ওকে যদি রাখ তো আমি ওর কাছে শেলাই শিখ্‌বো?” “আচ্ছারে পাগলী রাখা যাবে, যা। তোর মাষ্টারকে ডেকে আন্‌গে।” অ্যালিস “আচ্ছা” বলিয়া লাফাইয়া উঠিয়া মাষ্টারের উদ্দেশ্যে ছুটিল। চার্ল্‌স বলিল, “দাদা মশাই, ভাল কল্লেন না। গরীবের মেয়েটার সঙ্গে মিশে ও কিন্তু আরও বিগ্‌ড়ে যাবে ত। আমি ব’লে রাখলেম্‌ দেখে নেবেন।” দাদা মশাই নিঃশেষিত চা পাত্র টেবিলের উপর রাখিতে রাখিতে উত্তর করিলেন, “ও গো সে ভয় নেই। ফ্যানীকে আমি দু একদিন দেখেছি, মেয়েটি বড় শান্ত ও সৎ স্বভাব। ওর সঙ্গ, বোধ হয় অ্যালিসের পক্ষে উপকারীই হবে।” “তবে যা ভাল বোঝেন করুন, অ্যালিসকে কিন্তু বড় বেশী আদর দেওয়া হচ্ছে! এতো বাড়াবাড়ী কিছু নয়।” বলিয়া বিরক্তভাবে চার্লস ফষ্টার নিজের টুপী ও ছড়ি লইয়া বাহির হইয়া গেল।

 ফ্যানীর নাম মেরিয়ান কি মারগারেট এমনি কি একটি রাখা হইয়াছিল তাহা ঠিক জানা নাই। তাহার আদরের নাম ফ্যানী। আর এখন তাহাই চলিত হইয়া গিয়াছে। গরীবের সুন্দরী মেয়ে ফ্যানী অনেক বড় ঘরের মেয়ের চেয়েও অধিকতর সৌন্দর্য্য লইয়া জন্মিয়াছিল। তাহার ভাবব্যঞ্জক গভীর নীল চোখে, তাহার মধুর কণ্ঠস্বরে এমন কি মোহিনী শক্তি ছিল যে, যে তাহাকে দুইদিন দেখিয়াছে সে তাহাকে ভাল না বাসিয়া থাকিতে পারিত না। ফ্যানীর মা কোথাকার হাস্‌পাতালের লেডি ডাক্তার ছিলেন, তিনিই একমাত্র কন্যা ফ্যানীর শিক্ষা সম্পূর্ণ করিয়াছেন। আজ তাঁহার মৃত্যুতে পিতা পুত্রী পরস্পর বিচ্ছিন্ন। সে বালিকাবিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী ও ফ্যানীর পিতা রবার্ট এনড্রু প্রসিদ্ধ সওদাগর হেন্‌রী ফষ্টারের ভ্রাতুষ্পৗত্রীর গৃহশিক্ষক। ফ্যানীর নূতন চাকরী ঠিক হইয়া গেলে, পিতা ও কন্যা উভয়ে প্রভুর নিকটে অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল। বৃদ্ধবয়সে কন্যাকে নিকটে পাইয়া রবার্টের আর খুসীর সীমা রহিল না।

 পিতামহের চক্ষের অন্তরালে আসিয়াই অ্যালিস দুই হস্তে ফ্যানীর গলা জড়াইয়া ধরিয়া তাহার মুখের পানে চাহিয়া রহিল। ফ্যানী দেখিল, তাহার চোখে মুখে হাসি উছলিয়া পড়িতেছে। সে গভীর কৃতজ্ঞতার সহিত তাহার করমর্দ্দন করিয়া বলিল, “মিস্ ফষ্টার, তোমায় কি বলে ধন্যবাদ দেবো আমি বুঝতে পার ছি না। তোমার কাছে ভাই চিরঋণী রইলাম।”

 অ্যালিস সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া তাহার বাহু আকর্ষণ করিয়া কহিল,—“চলো আমরা পাখীদের খাবার খাওয়া দেখিগে।”

 মৃদুনম্বরে ফ্যানী বাধা দিল।—“না মিস্ ফষ্টার, আজ আমায় ক্ষমা করো, আজ সকল কার্য্যের পূর্ব্বে প্রভু, পিতা ও তোমার জন্য ঈশ্বরের নিকট একবার ভাল ক’রে প্রার্থনা করিবো।”

 এই বলিয়া সে অ্যালিসের করমর্দ্দন করিয়া নিজের ঘরের দিকে চলিয়া গেল। অ্যালিস ঈষৎ ক্ষুন্নভাবে দাদা মহাশয়ের নিকট ফিরিয়া আসিল। প্রথম উচ্ছ্বাসে বাধা প্রাপ্ত হইয়া তাহার মনটা একটু দমিয়া গিয়াছিল।

 ফ্যানীর নূতন চাকরী প্রাপ্তির পর ছয় মাস হইয়া গিয়াছে। ফ্যানী ও অ্যালিসের বন্ধুত্ব ক্রমেই গাঢ় হইতে গাঢ়তর হইতেছিল। অ্যালিস তাহার কাছে শেলাই এর বিশেষ কিছু উন্নতি করিতে পারে নাই। যেহেতু তাহাতে তাহার মনই ছিল না। সেলাইয়ের কলটা ফ্যানীরই কাজে লাগিল। অ্যালিস বলিল, “সেলাই আর ভাল লাগে না দাদা, তার চেয়ে আঁক্‌তে শেখা ভাল।” তৎক্ষণাৎ অঙ্কন দ্রব্য সকল আসিয়া পৌঁছিল, কিন্তু কাজ বড় অগ্রসর হইতে দেখা গেল না। ফ্যানীই ছবি আঁকিত! সে শুধু বসিয়া বসিয়া রং, তুলি, পেন সিল তাহার হাতের কাছে যোগাইয়া দিত এবং একখানি ছবি সমাপ্ত হইলে তাহার মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করিত। চিত্রবিদ্যা এমনি করিয়া শিক্ষা হইলে, নূতন সখ হইল, বেহালা শিখিতে হইবে। গীতবাদ্যে একটু দখল থাকাতে অ্যালিসের অন্য সকল বিদ্যাপেক্ষা এই বিদ্যাটায় একটু উন্নতি হইল। কিন্তু এই ব্যাপারে এইবার ফ্যানী বেচারীকে বড় বিপন্ন করিয়া তুলিয়াছিল। এই কয় মাসে ফ্যানীর সহিত একটু করিয়া বৃদ্ধ গৃহস্বামীর পরিচয় ঘটিতেছিল। স্নেহপ্রবণ বৃদ্ধকে নাতিনীর অত্যাচারে এই পরিণত বয়সে নূতন করিয়া কিশোর বয়স্কোচিত খেলায় প্রবৃত্ত হইতে হইত। তাহাদের টেনিস খেলায়, তাহাদের কার্ড টেবিলে, তাহাদের পাখীর বুলি শিখানয় তাঁহাকে নিয়মিত উপস্থিত থাকিতেই হইত। প্রথম প্রথম ফ্যানী তাঁহার সম্মুখে আসিতে সঙ্কোচ বোধ করিত, কিন্তু ক্রমশঃই তাহার সে লজ্জা ও সঙ্কোচ অপসারিত হইতে লাগিল। এখন সে আদিষ্ট হইয়া প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় অ্যালিসের প্রতিনিধিত্বে গান শুনাইত। তাঁহার আদেশে কোন কোন দিন সংবাদপত্র বা নূতন পুস্তক পাঠ করিত। এমন কি, তাঁহাদের আলাপেও যোগ দিতে আর বড় একটা কুণ্ঠিত হইত না।

 বৃদ্ধও যেন ক্রমে ক্রমে তাহার প্রতি কেমন একটা আকর্ষণ অনুভব করিতে লাগিলেন। ফ্যানীর গান না শুনিলে, ফ্যানীর সহিত কথা না কহিলে, সন্ধ্যাটা যেন ব্যর্থ বলিয়া মনে হইতে লাগিল। ক্রমে অ্যালিসের অল্পমাত্র চেষ্টায় ফ্যানী বৈকালিক ভ্রমণেও তাঁহাদের সঙ্গিনী হইল। তিনি যেন এতদিন পরে এই ষষ্টি বর্ষের নিকটবর্ত্তী হইয়া তাঁহার চিরকুমার জীবনের অসারত্ব অনুভব করিয়া কিসের একটা অভাব বোধ করিতে লাগিলেন। তাঁহার ভাটা-পড়া জীবন-নদীতে কোথা হইতে যেন সহসা জোয়ারের টান দেখা দিল এবং সে বন্যা চড়া ডুবাইয়া কানায় কানায় উথলিয়া উঠিতে উদ্যত হইল।

 চার্লস একদিনও এই দলে মিশিত না। সে স্বতন্ত্র ধরণের লোক। গৃহের এই হাসিখুসী গল্প গান উপেক্ষা করিয়া সে দিন রাত্রের অধিকাংশ কাল ক্লাব-ঘরেই যাপন করিত। বিশেষতঃ ফ্যানীকে সে দুটি চক্ষে পড়িয়া দেখিতে পারিত না। যেদিন ভোজনাগারে ফ্যানী উপস্থিত থাকিত, সেদিন সে দাদামহাশয়ের শত অনুরোধে কর্ণপাত না করিয়াই নিজের ঘরে চলিয়া যাইত। সেখানে একা নিরানন্দ ভোজনও তাহার শ্রেয় বোধ হইত। সে যে সেই গরীব শিক্ষয়িত্রীকে আন্তরিক ঘৃণা করে, তাহা সে তাহাকে এমন স্পষ্ট করিয়াই বুঝাইয়া দিতে চাহে। তাহার নির্ব্বোধ বোনটাকে পাইয়া বসিয়াছে বলিয়া সে যেন নিজেকে তাহাদের সমকক্ষ বলিয়া কোনমতে মনে না করিয়া বসে। তাহার এই অন্যায় পক্ষপাত দেখিয়া অ্যালিস ভারি চটিয়া যাইত। সে এ সম্বন্ধে অনেকবার ভ্রাতার সহিত তর্ক করিতেও গিয়াছে, কিন্তু ফ্যানীর জন্যই পারে নাই। ফ্যানী সাধ্যপক্ষে কখন চার্লসের সম্মুখে আসিত না, দৈবাৎ সাক্ষাৎ হইয়া গেলে ভদ্রতাটুকু বাঁচাইয়াই সরিয়া পড়িত।

 একদিন সন্ধ্যার সময় বৃদ্ধ সওদাগর অ্যালিসকে লইয়া একটা নিমন্ত্রণ রাখিতে গিয়াছিলেন। ফ্যানী একাই বাড়ীতে রহিল। দৈবক্রমে চার্লস শারীরিক অসুস্থতার জন্য সেদিন সকাল সকাল বাড়ী ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইল। নির্ম্মল চন্দ্রকরে উদ্যান তখন ডুবিয়া গিয়াছিল, নববসন্তের মলয়ানিল উচ্চশীর্ষ ঝাউশ্রেণীর মধ্যে মৃদুমর্ম্মররব তুলিয়াছে; আনন্দময় কোকিল প্রস্ফুটিত আম্রমুকুলের সুবাসে পাগল হইয়া ডাকিতেছিল। রক্ত মর্ম্মর আসনে বসিয়া রজতালোকে অপ্সরার ন্যায় শোভা ধারণ করিয়া ফ্যানী আত্মবিস্মৃতের মত গাহিতে ছিল। তাহার বুক দুরদুর করিতেছিল, তাহার স্বচ্ছনের জলে ভাসিতে ছিল, তাহার ক্রোড়স্থ যন্ত্র থামিয়া থামিয়া বাজিতেছিল, যেন বিষাদে তাহারও স্বর রুদ্ধ হইয়া আসিতেছে। সেই মুহূর্ত্তে অদূরে পদশব্দ শোনা গেল এবং চাহিয়া দেখিতে না দেখিতে চার্লস ফষ্টারের পরিচিত মুর্ত্তি জ্যোৎস্নালোকে ফ্যানীর চোখে পড়িল। সে ত্রস্ত হইয়া গান বন্ধ করিল; কিন্তু চার্লস সেদিন তৎক্ষণাৎ চলিয়া গেলেন না, বরং তাহার নিকটে আসিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, “তুমিতো ভারি সুন্দর গাও, মিস্ এনড্র! আমি পূর্ব্বে তোমার গান এত মিষ্ট বলিয়া বুঝিতে পারি নাই।”

 ফ্যানী লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল। সে কোলের যন্ত্রটা ভূমে নামাইয়া রাখিয়া অধোদৃষ্টিতে বসিয়া থাকিল, তাহার বাক্যস্ফূর্ত্তি হইল না। চার্লস একদৃষ্টে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “তোমার গান শেষ করিলেনা?” ফ্যানী আবার আরক্ত হইয়া উঠিল। সে এবার চোখ তুলিয়া বিস্মিত ভাবে তাহার পানে চাহিল, দেখিল চার্লস তাহার মুখের দিকে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে। লজ্জিত হইয়া নত মুখে সে উত্তর করিল, “আমার গান কিছুই ভাল নয়?” কে বলিল ভাল নয়?” আমি আগে গান শুনিতে তেমন ভালবাসিতাম না বটে, কিন্তু স্বীকার করিতেছি, আজ আমার কানে তোমার গান ভারি মিষ্ট লেগেছে। এবার হ’তে প্রতিদিনই আমি তোমায় গান শুনাইবার জন্য অনুরোধ করিব। তুমি বিরক্ত হবেনাতো?” এই বলিয়া অনাহুত ভাবে চার্লস ফ্যানীর পাশে বসিয়া সাগ্রহ কণ্ঠে কহিল, “গানটা শেষ কর মিস এনড্র।” ফ্যানী ঈষৎ শিহরিয়া ব্যাকুলনেত্রে আবার তাহার পানে চাহিল, তারপর বাজনাটা কোলের উপর তুলিয়া লইয়া কম্পিত কণ্ঠকে স্থির করিবার জন্য কয়েক মুহূর্ত্ত স্তব্ধ হইয়া রহিল।

 দিন কতকের মধ্যেই চার্লস ফষ্টারের অস্বাভাবিক পরিবর্ত্তন সর্ব্বলোচনে লক্ষিত হইল। সে ক্লাবঘর একেবারেই পরিত্যাগ করিয়া ঘরের মধ্যে জাঁকাইয়া বসিল। প্রতি সন্ধ্যায় গানে, গল্পে, বৈকালিক ভ্রমণে, আহারে সর্ব্বদাই চালর্স উপস্থিত থাকিতে আরম্ভ করিল। হেনরী যখন বিষয়কার্য্যে ব্যস্ত, চার্লস তখন তাহার সঙ্গিনীদ্বয়কে সঙ্গদান করিয়া তাঁহার ত্রুটিপূরণ করিয়া লইতে থাকিত। এক কথায় চার্লস যতখানি দূরে চলিয়া গিয়াছিল, ঠিক ততখানি কাছে ফিরিয়া আসিল। সকল বিষয়েই তাহার একটা বাড়াবাড়ি করা অভ্যাস আছে বলিয়া, কাহারও চোখে ব্যাপারটা বড় নূতন বলিয়া ঠেকিল না। অ্যালিস এবার খুব খুসী। সে স্পষ্টই একদিন দাদামহাশয়কে বলিল, “দেখ‍্ছ দাদা! চার্লস এখন কেমন ফাঁদে পড়েছে, যেমন ফ্যানীকে ঘৃণা কর‍্তেন, তেমনি এখন ফ্যানী নইলে একদণ্ড আর চলেনা, খুব হয়েছে।”

 কিন্তু কে জানে কেন নাতির এই গৃহানুরাগ তাহার চির স্নেহময় পিতামহের চিত্তে ততদূর সুখানুভূতি জাগাইলনা। তাঁহার বোধ হইতে লাগিল, চার্লী তাঁহার প্রাপ্য ধনে ভাগ বসাইতেছে, তাঁহার অংশ কাড়িয়া লইতেছে।

 মনটা ঈষৎ অপ্রসন্ন হইয়া রহিল। সে সক্ষম সুন্দর যুবাপুরুষ, তাহার স্বাচ্ছন্দ্য তো চারিদিকেই বিস্তৃত রহিয়াছে। তবে সে কেন তাহার এই লোভনীয় শান্তিটুকুতে হাত দিতে আসিল? ফ্যানী প্রতিদিন চার্লসের আদেশে অনেক গান গাহিত। অ্যালিস দেথিত সে অবসর পাইলেই নূতন নূতন গান ও স্বরলিপি অভ্যাস করিতেছে। সেও উৎসাহ দিয়া বলিত “হ্যাঁ ভাই! ভাল ক’রে শেখ্, চার্লস যেন না নিন্দা কর্ব্বার ছুতো পায়।” বৃদ্ধ হতাশভাবে বসিয়া গান শুনিতেন, কিন্তু তাঁহার আর তেমন তৃপ্তি হইতনা। এক একবার বাধা দিয়া কোন বই বা সংবাদপত্র পড়িতে বলিলে চালর্স সাগ্রহে বলিয়া উঠিত “আর একটা গান শোনা যাক।” একটা হইলে আবার একটার জন্য সঙ্গে সঙ্গেই অনুরোধ হইত, হেন‍রী অনিচ্ছাসত্ত্বেও আর আপত্তি করিতে পারিতেন না।

 একদিন বেলা তিনটার সময় কিছু বলিবার উদ্দেশে চার্লস ধীরে ধীরে পিতামহের বসিবার ঘরে প্রবেশ করিল। রুদ্ধ জানালার পাশে একখানা ইজি চেয়ারে শয়ন করিয়া বৃদ্ধ সওদাগর তখন পাইপে ধূমপান করিতেছিলেন। নিকটেই একখানা বাণিজ্য বিষয়ক পুস্তক এবং তাঁহার চশমা পড়িয়া আছে। বোধ হয় পূর্ব্বে তিনি ইহা পাঠ করিতেছিলেন। ভ্রাতুষ্পন্নের পদশব্দে সজাগ হইয়া পাইপটা হাতে ধরিয়া তাহাকে উদ্দেশ করিয়া বলিয়া উঠিলেন—“এই যে তুমি এসেছ! তা ভালই হয়েছে, আমি এখনি তোমায় ডাকতে পাঠাব মনে করছিলেম। ব’স তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।” চার্লস ফষ্টার তাঁহার অনতিদূরে একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া বসিতে বসিতে বলিল, “আমারও আপনাকে কিছু বল‍্বার ছিল, কিন্তু আপনার বক্তব্যটাই পূর্ব্বে শোনা যাক।”

 একটু ইতস্তত করিয়া হেরী ফষ্টার কহিলেন, “বেশ তাই ভাল, চার্লি! তুমি আর এখন নিতান্ত বালক নও, সব বোঝতো—তা তুমি বোধ হয় জান আমাদের পৈত্রিক বিষয় সম্পত্তি কিছুই ছিল না; থাক‍্বার মধ্যে কিছু ধন ছিল, এখনকার এই সমুদয় সম্পত্তিই আমার স্বোপার্জিত, এতে তোমার বাপ পিতামহ, কারও কোন দাওয়া ছিল না। কেমন এ কথা ঠিক কি না?”

 চার্লস ধীর ভাবে ঘার নাড়িয়া উত্তর করিল, “ঠিক বই কি!”

হেনরী ফষ্টার আবার গম্ভীর ভাবে বলিতে লাগিলেন—“তোমার পিতার অকাল মৃত্যুতে আমিই তোমাদের দুজনকে সেই একান্ত শিশুকাল হ’তে লালন পালন ক’রে এসেছি, তোমরা বোধ হয় জান আমি তোমাদের প্রাণের তুল্য ভালবাসি।”

 “হ্যাঁ, আর আমরাও সে জন্য আপনাকে ঈশ্বরের মত মান্য ক’রে থাকি।” এই কথা চার্লস বলিলে, প্রত্যুত্তরে হেনরী অত্যন্ত কোমলস্বরে বলিলেন,—“নিশ্চয়ই তাই। আমাদের পরস্পরের মধ্যে ভক্তি, প্রীতি ও ভালবাসা যথেষ্ট পরিমাণে আছে। আজ সেই ভালবাসার দোহাই দিয়া বলিতেছি—‘চার্লি, ভাইটি আমার! তুমি আমায় ভুল বুঝো না।”

 যুবা ফষ্টার নিরতিশয় বিস্ময়ের সহিত বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল—“কি এমন কথা দাদামশাই! যার জন্য আপনি এত ইতস্তত কর‍্ছেন?”

 একবার কাসিয়া গলা সাফ করিয়া রুদ্ধশ্বাসে হেনরী ফষ্টার বলিয়া ফেলিলেন—“চার্লি, চার্লি! তোমায় আমার অর্দ্ধেক সম্পত্তি আমি দানপত্রে লিখে দিয়েছি,—বাকি অর্দ্ধেক আমি নিজের জন্য রাখ‍্তে চাই, এতে তুমি ক্ষুন্ন হবেনাতো?—অ্যালিসকে অবশ্য—”

 “এর জন্য আপনি এত কুষ্ঠিত হচ্ছেন কেন দাদা মশাই? আপনার টাকা, আপনি আমায় দয়া ক’রে যা দেবেন, আমার পক্ষে তাই যথেষ্ট। আর এখন আপনার উইলেরই বা আবশ্যক কি?”

 “আছে চার্লী, সে সম্পত্তিটা আমি মিস এনড্রকে দানপত্র লিখে দেব, তাতে তোমারও সই চাই।”

 সাশ্চর্য্যে চার্লস বলিয়া উঠিল—“কি! কাকে, মস এনড্র! ফ্যানী?”—

 অপরাধীর মত খুল্লপিতামহ নতমস্তকে উত্তর করিলেন,—“হঁ। ভাই! আমি তাকে কাল বিবাহ করবো।”

 বজ্রাহতের মত ক্ষণকাল নিশ্চল থাকিয়া অকস্মাৎ দ্রুতস্বরে চার্লস বলিয়া ফেলিল—“ভারি অন্যায় কথা! আমি আপনাকে এই কথাই বল‍্তে এসেছিলাম যে, আমি ফ্যানীকে বিবাহ ক’রতে দৃঢ়সংকল্প, এ বিয়ে আপনাকে দিতেই হবে।”  পিতামহ কহিলেন—“এ বিবাহ এক প্রকার হয়েই গিয়েছে মনে করো। তুমি যদি বিবাহ ক’রতে ইচ্ছুক হয়ে থাক, সুন্দরী পাত্রীর অভাব হবে না, যাকে ইচ্ছা মনোনীত কর, দরিদ্রা ফ্যানী তোমার উপযুক্ত নয়।”

 চালর্স সক্রোধে ভূমে পদাঘাত করিল—“তার চেয়ে আপনিই বরং যদি এ বয়সে বিবাহের লোভ সম্বরণ ক’রতে না পারেন, অন্য কাহাকেও বিবাহ করুন না। ফ্যানীকে আমি ভালবেসেছি। তাকে আমায় দিন। তাকে আমি অন্যের হাতে দেবো না।” হেনরিরও আর ধৈর্য্য রহিল না, তিনিও ক্রোধে কাঁপিতে কাঁপিতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া চীৎকার করিয়া কহিলেন, “কি! আমারই ভয়ে প্রতিপালিত হয়ে, শেষে আমাকেই অপমান! যা, তুই আমার বাড়ী হ’তে এই মুহূর্ত্তেই চ’লে যা! দেখি তুই কেমন ক’রে এ বিবাহ বন্ধ করিস্।”

 চার্লসও রোষে গর্জ্জিয়া উঠিল—“দেখবেন, কেমন ক’রে বিয়ে করেন! নাতির সঙ্গে ক’নে নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে আপনার লজ্জা হলো না! ধন্য!” ক্রোধভরে চার্লস চলিয়া গেল।

 “ফ্যানি, ফ্যানি! জন্মের মতন চলে যাচ্ছি, তাই একবার শেষ দেখা ক’রে যাবো ভেবেছিলাম, তাতে বিরক্ত হওনি তো?”

 ফ্যানী মুখ তুলিয়া চার্লসের পানে চাহিয়া বলিল— “মিঃ ফষ্টার!” আর কিছুই সে বলিতে পারিল না। চার্লস চমকিয়া তাহার হাত ধরিল—“ও কি ফ্যানী! আমার জন্য তুমি কাঁদ্‌চো? কেন ফ্যানী! আমি তোমার কে? তোমার শত্রু ভিন্ন আর তো কেহই নই। তোমার বিষয়ের অংশীদার ছিলাম, আমি না থাক্‌লে তুমিই নিষ্কন্টক হবে। তবে আমি যে ডেকেছিলাম, সে শুধু দুর্দ্দমনীয় হৃদয়াবেগে জ্ঞানশূন্য হয়েছিলাম ব’লে!”

 ফ্যানী অস্ফুট স্বরে কি বলিল, বুঝতে না পারিয়া চার্লস সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল “কি বল্লে মিস এনড্রু?

 ফ্যানী কাতর চক্ষে চাহিল, চাঁদের পরিষ্কার আলোকে চার্লস দেখিল, জ্যোৎস্না-প্রতিমা হিমজলসিক্ত। আশান্বিত ভাবে সে জিজ্ঞাসা করিল—“ফ্যানী, তবে তুমিও কি আমায় ভালবাস? একদিনও কি বেসেছিলে?”

 ফ্যানী অস্ফুটস্বরে উত্তর করিল—“প্রথম দিন হ’তে। কিন্তু দুরাশা ব’লে অতি গোপনে হৃদয়ের গুপ্ত কন্দরে সাবধানে লুকিয়ে রেখেছিলাম।”

 “ফ্যানী ফ্যানী! এত দর আমার নাই। আমায় অত বাড়িও না। এই দেখ আজ আমি ভিখারির অধম, তুমিও আজ আমাপেক্ষা অনেক উচ্চ!”

 “মিষ্টার ফষ্টার আপনি কেন যাবেন? কর্ত্তা রাগ ক’রে যদি কিছু ব’লেই থাকেন, সে কি আপনার মনে করা উচিত? তিনি তো আপনাকে কম ভালবাসেন না!”

 “ও সম্বন্ধে ফ্যানী! তুমি আমায় কিছুই বলিও না। ফ্যানী! সত্য ক’রে বল দেখি, তুমি এখন এই নিঃস্ব বিতাড়িত ভিখারী চার্লসকে ভালবাস কি না?”

 “চার্লস! আমায় বারে বারে আঘাত করো না।”

 “তবে তুমি এই মুহূর্ত্তে আমার সঙ্গে চ’লে এস। কোন দূরদেশে গিয়ে আমরা বিবাহিত জীবন সুখে যাপন করব। আমি আজ কপর্দকহীন বটে, কিন্তু জানো তুমি—আমি মুর্খ নই। এসো তবে আর বিলম্ব করে কাজ নেই ফ্যানী!”

 ফ্যানী চার্লসের হস্ত হইতে হস্ত মুক্ত করিয়া লইয়া মৃদুস্বরে কহিল —“না।” চমকিয়া চার্লস ফ্যানীর হাত ছাড়িয়া দিয়া তাহার মুখের পানে তাকাইয়া বলিল—“যাবে না? আমায় চাও না?”

 ফ্যানী দৃঢ়তার সহিত উত্তর দিল, “না মিষ্টার ফষ্টার। আমার হৃদয় তোমাকেই দিয়েছি; কিন্তু এ তুচ্ছ দেহটা দিতে পার্‌বনা। আমার এ কৃতঘ্নতা আমার বৃদ্ধ শোকজর্জ্জরিত পিতাকে হত্যা ক’রে ফেল্‌বে। আমি তাঁর পৃথিবীর একমাত্র সম্বল।”

 “সেইজন্য বুঝি তিনি তোমায় অর্দ্ধমূল্যে যষ্টিবৎসরের বৃদ্ধের হস্তে বিক্রয় কচ্চেন? বুঝেছি, তুমি ঐশ্বর্য্যশালী চার্লসকে ভালবাস্‌তে, দরিদ্র দুর্ভাগ্য চার্লসকে নয়—” এই বলিয়াই চার্লস দ্রুতপদে চলিয়া গেল। ফ্যানী কাতরস্বরে ডাকিল “মিষ্টার ফষ্টার! যেওনা শুনে যাও।” চার্লস ফিরিলনা, দেখিতে দেখিতে রজনীর অভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল। আর ফ্যানী সেই জনশূন্য উদ্যানের মধ্যে সেই নিস্তব্ধ গভীর রাত্রে ঝিল্লীমন্দ্রিত জোনাকীখচিত বৃক্ষতলে দাঁড়াইয়া কাঁদিতে লাগিল। হা ঈশ্বর! সে কি বাস্তবিকই ঐশ্বর্য্যলােভে আত্মবিক্রয় করিতেছে? সে কি এতই হীন? তাহার প্রেম কি শুধু পিতৃভক্তির তুলাদণ্ডেই প্রত্যাহৃত হয় নাই? তুমি অন্তর্য্যামী! তুমিতো সবই তাহার দেখিতেছ! তাহার কেশ হইতে প্রস্ফুটিত কুসুমের গন্ধ চুরি করিয়া লইয়া বাতাস কখন ঠাণ্ডা হইয়া আসিল; তাহার মুখপানে চাহিয়া নক্ষত্রেরা কোন্ সময় যে ঘুমাইয়া পড়িল, তাহা সে জানিতেও পারিল না।

 সকালবেলা ফ্যানী যখন চোরের মত নীরবে অ্যালিসের মাথার কাছে গিয়া দাঁড়াইল, তখন অ্যালিস জাগিয়াছিল, কিন্তু তাহাকে দেখিয়াই চোখ বুজিল। ফ্যানী মৃদুস্বরে ডাকিল,—“অ্যানিস, কেবল একমাত্র তুমিই আমায় সাহায্য ক’রতে পার।”

 অ্যালিস সবেগে বিছানার উপর উঠিয়া অস্বাভাবিক উত্তেজনার সহিত বলিয়া উঠিল,—“আমি তােমায় অনেক সাহায্য ক’রেছি, তার ফলে আমার ভাই—আমার এক মাত্র সহােদর—আজ তার নিজের বাড়ী থেকে, কুকুরের মত তাড়িত, লাঞ্ছিত,— আর না—আর না—তুমি যাও, তুমি যাও,”— বলিতে বলিতে সে দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।

 ফ্যানী কাতর কণ্ঠে বলিল,—“তুমিও আমায় ঘৃণা কর্‌লে? এত ভালবেসেছিলে অ্যালিস, আজকের দিনটাও সেই ভালবাসাটুকু রাখো, তারপর—”

 অ্যালিস তাহার মুখের করাবরণ না খুলিয়াই কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল,—“একবিন্দুও না,—আর একবিন্দুও না! আমিই আমার প্রাণাধিক ভাইয়ের প্রতি অত্যাচারের মূল। তোমাকে ভালবেসেই আমি আপনার পায়ে আপনি কুড়ূল মেরেছি। তুমি বাড়ীর কর্ত্রীই হও, আর যেই হও, আমার তুমি কেউ নও—কেউ নও তুমি।—যাও, তুমি চলে যাও; এক্ষণি যাও—এক্ষণি যাও!—তুমি না যাও, আমিই যাচ্ছি—” বলিয়া সে ঝড়ের মত উঠিয়া চলিয়া গেল। ফ্যানী বজ্রাহতের মত দাঁড়াইয়া রহিল। সে আজ কোন্ অপরাধে সকলকার ঘৃণার পাত্রী! তাহার ব্যথা বুঝিবার কেহ নাই। সকলেই তাহাকে ঘৃণা করিতেছে। কিন্তু কে তাহাকে এমন করিয়া এই সকলকার দুর্ভাগ্যের মধ্যে টানিয়া আনিয়াছিল? সে দরিদ্র শিক্ষয়িত্রী, নিজের পদে সেতো সুখেই থাকিতে পারিত? স্বপ্নেও তো সে এ পদ কামনা করে নাই! ফ্যানী স্থির করিল, সে সকলকার এই মর্ম্মভেদী ঘৃণাও বুক পাতিয়া গ্রহণ করিবে, কিন্তু তথাপি বৃদ্ধ পিতার প্রতি অকৃতজ্ঞ হইতে পারিবে না।

 দাসীর সহিত বিবাহপরিচ্ছদে সজ্জিতা ফ্যানী যখন হলে আসিয়া প্রবেশ করিল, তখন হেন্‌রি ফষ্টার একাকী তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। ফ্যানী আসিতেই তিনি উঠিয়া দাঁড়াইয়া একবার তাহার মুখের দিকে চাহিয়াই দ্বারাভিমুখে অগ্রসর হইলেন। ফ্যানীও অজগরদৃষ্টি-মুগ্ধ অজার ন্যায় তাঁহার অনুসরণ করিল। গাড়িতে দুজনে পাশাপাশি বসিলেন, কিন্তু কেহই কোন কথা কহিলেন না। গাড়ী আসিয়া গির্জ্জার দ্বারে থামিল। পাদরী নিজে আসিয়া হেন্‌রী ফষ্টারকে সাদরে গ্রহণ করিলেন। আবশ্যকীয় সাক্ষী ভিন্ন আর কোন লোকই সেখানে উপস্থিত ছিল না। বিবাহ আরম্ভ হয়, পাদরী নিয়মাচরণ করিতে প্রবৃত্ত হইলে হেন্‌রী ফষ্টার বাধা দিলেন,—“একটু অপেক্ষা করুন, এখনও তো বর—” এমন সময় বাহিরে একটা শব্দ শোনা গেল এবং পর মুহূর্ত্তে সশব্দে দ্বার খুলিয়া একজন লোক তাঁহাদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহাকে দেখিয়া সকলে স্তম্ভিত হইয়া গেল, ফ্যানী সঘনে কাঁপিয়া উঠিল। সে রুদ্র মূর্ত্তি চালর্স ফষ্টার। চার্লস হস্তস্থিত পিস্তল উঠাইয়া ফ্যানীর ললাট লক্ষ্য করিয়া বিকট হাসি হাসিয়া তাহার আগুনের মত উজ্জ্বল চোখ দুইটা পিতামহের পানে ফিরাইয়া বলিল, —“দাদামশাই! দেখছেন—চার্লস ফষ্টার এমনি করে তার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করে।” মুহূর্ত্ত মধ্যে হেন্‌রী চীৎকার করিয়া উঠিলেন—“এইবার বিবাহ আরম্ভ হোক, চালর্স! তুমি এ কি অসময়োপযোগী অভিনয় ক’রতে এলে! ঐ বাক্সে পোষাক আছে পরো। শীঘ্র তোমার নিজের স্থানে এসে দাঁড়াও।

 পিস্তলটা নত হইয়া পড়িল, গভীর বিস্ময়ে দুই পদ হটিয়া গিয়া চার্লস পিতামহের মুখের দিকে অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। হেনরী এই অবসরে ধীরে ধীরে মুহ্যমান ভ্রাতুষ্পত্রের শিথিল হস্ত হইতে সেই ভীষণ সংহারাস্ত্রটা কাড়িয়া লইয়া তাহাকে দুই হস্তে বুকে টানিয়া লইয়া আকুল কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন,—“চার্লি, চার্লি, এস আমার স্নেহের ধন, আমার কাছে,—আমার এই বুকে ফিরে এস! আমার মােহ ভেঙ্গে গেছে। আয় চার্লি, খুব কাছে সরে আয়।”

 চার্লসের কম্পিত অবশ মস্তক সহসা প্রতিপালকের বক্ষে লুটাইয়া পড়িল। “দাদা মশাই! এ আত্মসুখোন্মত্ত হৃদয়হীন পাপিষ্ঠকে ক্ষমা কর্ত্তে পার্ব্বেন? উঃ ক্রোধে, মােহে জ্ঞানশূন্য হয়ে কি ভয়ানক কাজই কর্‌তে ব’সেছিলাম। না দাদা, আমারই মােহ ভেঙ্গেছে,—আমি এই চ’লে যাচ্ছি। আপনার কাছে জন্মের মত বিদায়—” বৃদ্ধ সস্নেহে অনুতপ্ত যুবকের হস্ত ধরিয়া অনুতাপরুদ্ধ কণ্ঠে কহিলেন—“কোথা যাবি চার্লি? দাদা আমার? আমার সর্ব্বস্ব ধন! তুই কোথা যাবি? বৃদ্ধবয়সে লােকে জ্ঞানহীন হয়, তাই হঠাৎ এক দিনের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম মাত্র! সময় বয়ে যাচ্চে,—এস তুমি প্রিয় বৎসে! আমার প্রাণাধিক চার্লসের পাশে বসিয়ে তোমার আজ ভাল ক’রে দেখি এস। উন্মাদ বৃদ্ধকে ক্ষমা করিস্ দিদি!—কিছু মনে করিস্‌নে। শ্রদ্ধাস্পদ মহাশয়! আপনার কার্য্য এইবার আরম্ভ হৌক।”