রাণী না খুনি? (প্রথম অংশ)/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

 সহিস-বেশধারী কর্ম্মচারীকে সঙ্গে লইয়া আমি থানা হইতে বহির্গত হইলাম। সহিস-কোচবানের পোষাক পরিচ্ছদের বিবরণ শুনিয়া আমি মনে মনে যে আড়গোড়া স্থির করিয়াছিলাম, সেই আড়গোড়ায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। আমি সেই আড়গোড়ার ভিতর একটা ঘোড়া ক্রয় করিবার ছলে প্রবেশ করিয়া আড়গোড়ায় যে সকল ঘোড়া ছিল, তাহাই দেখিবার ভানে এদিক ওদিক বেড়াইতে লাগিলাম; কিন্তু সহিস-বেশধারী কর্ম্মচারীর দৃষ্টিপথের বাহির হইলাম না। অধিকন্তু অপরাপর সহিস-কোচবানদিগের সহিত সেই কর্ম্মচারীর যে সকল কথা হইতে লাগিল, তাহার দিকেও সবিশেষরূপ লক্ষ্য রাখিলাম।

 সহিস-বেশধারী কর্ম্মচারী আমার উপদেশ মত আড়গোড়ার ভিতর প্রবেশ করিয়া যে স্থানে কয়েকজন সহিস-কোচবান্‌ বসিয়াছিল, সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন, এবং আপনাকে একজন সহিস বলিয়া পরিচয় দিয়া তাহাদিগের নিকট উপবেশন করিলেন। তাঁহাকে দেখিয়া একজন কোচবান্‌ জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কাহার অনুসন্ধান করিতেছ?”

 কর্ম্মচারী। কাহারও অনুসন্ধান করিতেছি না।

 কোচবান্‌। তবে এখানে আসিয়াছ কেন?

 কর্ম্মচারী। আমি বরাবর সহিসী কর্ম্ম করিতাম; কিন্তু আজ কয়েকমাস হইল, আমি আমার দেশে গমন করিয়াছিলাম, এবং কিছু দিন পূর্ব্বে আমি দেশ হইতে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়াছি। এখন কোন স্থানে কোনরূপ চাকরী যোগাড় করিতে না পারায়, সবিশেষরূপ কষ্ট পাইতেছি। তাই একটা চাকরীর অনুসন্ধানে আপনাদিগের এখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি।

 কোচবান্। এখানে তোমার চাকরী হইতে পারে, একথা তোমাকে কে বলিল?

 কর্ম্মচারী। একথা আমাকে কেহ বলে নাই। আড়গোড়ায় অনেক সহিস কার্য্য করে; সুতরাং সময় সময় অনেক চাকরী প্রায়ই খালি থাকার সম্ভাবনা। তাই আপনাদিগের এখানে আগমন করিয়াছি। এখন বলুন, কিরূপ উপায়ে আমি একটী চাকরী যোগাড় করিতে সমর্থ হই?

 কোচবান্। আমাদিগের এখানে যদি কোন কর্ম্ম খালি থাকিত, তাহা হইলে আমাদিগের সাহেবকে বলিয়া যাহাতে তুমি কোন একটী কর্ম্ম পাইতে পারিতে, আমি তাহার বন্দোবস্ত করিতাম; কিন্ত আজকাল সহিসের কার্য্য খালি থাকা দূরে থাকুক, দুই একজন সহিস আমাদিগের এখানে ফাল্‌তু পড়িয়া আছে।

 কর্ম্মচারী। এখানে বড় আশা করিয়া আসিয়াছিলাম, কিন্ত এখন দেখিতেছি, আমার সে আশা এখন কার্য্যে পরিণত হওয়া কঠিন হইয়া দাঁড়াইল।

 কোচবান্‌। এখানে মধ্যে মধ্যে প্রায়ই সহিসী কার্য্য খালি হইয়া থাকে। তুমি দুই একদিবস অন্তর এক একবার আসিও, খালি হইলেই আমি তোমার জন্য একটা যোগাড় করিয়া দিব।

 কর্ম্মচারী। তাহাই হইবে। আমি মধ্যে মধ্যে আসিয়া আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিব। আজ কয়েকদিবস হইল, বড়বাজারে একখানি জুড়ি গাড়ি এবং একখানি কম্পাস গাড়ি আপনাদিগের এখান হইতে গিয়াছিল, তাহাদিগের মধ্যে কোন সহিস কোচবানের সহিত একবার সাক্ষাৎ হয় কি?

 কোচবান্। কেন?

 কর্ম্মচারী। তাহা হইলে বোধ হয়, আমার একটা চাকরীর যোগাড় হইতে পারে।

 কোচবান্‌। সেই সহিস কোচবানের নাম কি?

 কর্ম্মচারী। আমি তাহাদিগের কাহারও নাম অবগত নহি।

 কোচবান্‌। নাম না জানিলে, তুমি কাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবে?

 কর্ম্মচারী। দুইজন কোচবান্‌ এবং তিনজন সহিস দুইখানি গাড়িতে ছিল। তাহাদিগের মধ্যে একজনের সহিত সাক্ষাৎ হইলেই আমার কার্য্য শেষ হইতে পারে।

 কোচবান্‌। প্রত্যহই গাড়ি ভাড়ায় যাইতেছে; বড়বাজারে কে গিয়াছিল, তাহা এখন কিরূপে স্থির করিব?

 কর্ম্মচারী। দুইখানি গাড়ি গিয়াছিল। একখানি জুড়ি গাড়ি, তাহাতে একজন রাণী ছিলেন। সেই রাণী বড়বাজারে একজন জহরত-বিক্রেতার দোকানে গমন করিয়া অনেকগুলি জহরত খরিদ করিয়াছিলেন। আর একখানি কম্পাস গাড়ি; বড়বাজারে গমন করিবার সময় উহাতে কেবলমাত্র একটী লোক গমন করিয়াছিল, কিন্ত আসিবার সময় তাহাতে দুইজন আগমন করেন, এবং তাহাদের সহিত সেই জহরতের বাক্সও আনা হয়। এরূপ অবস্থায় যদি আপনি এইখানকার সহিস-কোচবানগণকে জিজ্ঞাস করেন, তাহা হইলে বোধ হয়, তাহাদিগের সন্ধান নিশ্চয়ই অনায়াসে হইতে পারে।

 কোচবান্। সে আজ কয়দিবসের কথা?

 কর্ম্মচারী। প্রায় আট দশদিবন হইবে।

 কর্ম্মচারীর এই কথা শুনিয়া সেই কোচবান্‌ সেই স্থানে যে সকল সহিস-কোচবান্‌ উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাস করিলেন। উহাদিগের মধ্যে একজন সহিস কহিল, “আজ আট দশদিবস হইল, কোন রাণীকে সোয়ারী দিবার নিমিত্ত লাল বড় জুড়িতে হোসেনী কোচবান্‌ যেন গমন করিয়াছিল, এইরূপ আমার মনে হইতেছে।”

 কোচবান্। হোসেনী, কোন্‌ হোসেনী?

 সহিস। বড় লাল জুড়ি যে হোসেনী হাঁকাইয়া থাকে।

 কোচবান্‌। দেখ দেখি, হোসেনী এখন আছে, কি সোয়ারীতে বাহির হইয়া গিয়াছে।

 সহিস। সে এখন নাই। অনেকক্ষণ হইল, সে সেই জুড়ি লইয়া বাহির হইয়া গিয়াছে।

 কোচবান্‌। তাহার সহিত যে দুইজন সহিস ছিল, তাহাদের মধ্যে কেহ আছে কি?

 সহিস। না, তাহারাও হোসেনীর সহিত বাহির হইয়া গিয়াছে বলিরা বোধ হইতেছে। ঘাহা হউক, আমি গিয়া আস্তাবলের ভিতর তাহাদিগের একবার অনুসন্ধান করিয়া আসিতেছি। উহাদিগের মধ্যে যদি কেহ থাকে, তাহা হইলে আমি তাহাকে সঙ্গে লইয়া আনিতেছি।

 এই বলিয়া সেই সহিস সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল, এবং অতি অল্পক্ষণ মধ্যেই আর একজন লোককে সঙ্গে করিয়া সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল ও কহিল, “জুড়ি গাড়ির কোচবান্‌ ও সহিসগণ সকলেই বাহির হইয়া গিয়াছে। সেই জুড়ির সহিত যে একখানি কম্পাস গাড়ি গমন করিয়াছিল, তাহার কোচবান্‌ এই—আবদুল।”

 কোচবান্। আবদুল! তুমিই কি কম্পাস গাড়ি লইয়া হোসেনীর জুড়ির সহিত কোন রাণীকে লইয়া বড়বাজারের গমন করিয়াছিলে?

 আবদুল। আমি গাড়ি চড়াইয়া রাণীকে লইয়া যাই নাই। রাণী গিয়াছিলেন—জুড়িতে; আমি জুড়ির পিছু পিছু গিয়াছিলাম।

 কর্ম্মচারী। আচ্ছা, রাণী জুড়িগাড়িতে করিয়া গিয়াছিলেন; কিন্তু তোমার গাড়ি ত খালি যায় নাই, তাহাতে একটী বাবু গমন করিয়াছিলেন না?

 ২য় কোচবান্। হাঁ।

 কর্ম্মচারী। আসিবার সময় দুইজন বাবু তোমার গাড়িতে আসিয়াছিলেন?

 ২য় কোচবান্‌। হাঁ।

 কর্ম্মচারী। যে বাবু তোমার গাড়িতে বড়বাজারে গমন করিয়া ছিলেন, তাঁহার সহিত বড়বাজারে আমার সহিত সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, “তুমি আমার বাড়ীতে যাইও, সেই স্থানে গেলে, আমি তোমাকে একটী চাকরীর যোগাড় করিয়া দিব।” তাঁহার নাম ও ঠিকানা পর্য্যন্ত আমাকে বলিয়া দিয়াছিলেন; কিন্তু ভাই, দুঃখের কথা আর কি বলিব, আমি তাঁহার নাঁম ও ঠিকানা উভয়ই ভুলিরা গিয়াছি বলিয়া, আর সেই স্থানে গমন করিতে পারি নাই, এবং এখন কোন স্থানে চাকরীরও যোগাড় করিয়া উঠিতে পারি নাই। তাঁহার নাম ও ঠিকানা ভুলিয়া যাইবার পরে, এই কয়দিবস পর্য্যন্ত যে কত স্থানে চাকরীর উমেদারীতে ঘুরিয়া বেড়াইয়াছি, তাহার আর তোমাকে কি বলিব?

 সহিস। আমাকে এখন কি করিতে হইবে?

 কর্ম্মচারী। ভাই, অনেক কষ্ট করিয়া যখন আমি তোমার অনুসন্ধান করিতে সমর্থ হইয়াছি, তখন আর আমি তোমাকে সহজে ছাড়িতেছি না; এখন তোমার প্রতি আমার এই অনুরোধ যে, হয় কোন স্থানে আমার একটী চাকরীর যোগাড় করিয়া দেও, না হয়, সেই বাবুর বাড়ী, যাহা তোমার দেখা আছে, একটু কষ্ট স্বীকার করিয়া তাহা আমাকে দেখাইয়া দিয়া আমাকে সবিশেষরূপে উপকৃত কর।

 সহিস। আমার হাতের কার্য্য আমি এখন পর্য্যন্ত শেষ করিয়া উঠিতে পারি নাই। এরূপ অবস্থার আমি কিরূপে আপনার সঙ্গে এখন গমন করিতে পারি?

 কর্ম্মচারী। আমার যতদুর সাধ্য, আমি না হয়, তোমার কার্য্যের কতক সাহায্য করিতেছি, তাহা হইলে তোমার কার্য্য শীঘ্রই সম্পন্ন হইয়া যাইবে। তাহা হইলে ত তুমি আমার সহিত গমন করিতে পারিবে?

 ছদ্মবেশী-কর্ম্মচারীর এই কথা শুনিয়া নেই কোচবান্‌ প্রথমতঃ তাঁহার সহিত যাইতে অস্বীকার করিল। পরিশেষে অনেক তোষামোদের পর তাঁহার সহিত যাইতে স্বীকৃত হইয়া শীঘ্র শীঘ্র আপনার নিয়মিত কর্ম্ম সমাধা করিয়া লইবার মানসে সেই ছদ্মবেশী-কর্ম্মচারীকে নানারূপ ফরমাইস আরম্ভ করিল। কখন বা তাঁহাকে ঘোড়ার সাজ সরাইয়া দিতে কহিল, কখন বা ঘোড়ার থাকিবার স্থানে পাতিয়া দিবার খড়গুলি যাহা রৌদ্রে শুখাইতে দেওয়া হইয়াছিল, তাহা সেই স্থান আনিতে কহিল। এইরূপে তাহাকে নানারূপ ফরমাইস আরম্ভ করিল। ছদ্মবেশী-কর্ম্মচারী কি করেন, কোন গতিতে তাঁহার কার্য্য-উদ্ধার করিতেই হইবে; সুতরাং সেই কোচবানকে তিনি সর্ব্ব প্রকার সাহায্য করিতে লাগিলেন। মধ্যে মধ্যে তামাক সাজিয়াও তাহাকে খাওয়াইতে হইল। এইরূপে প্রায় দুইঘন্টাকাল অতীত হইলে আবদুল সেই কর্ম্মচারীর সহিত বহির্গত হইল। আমিও ঘোড়া দেখা শেষ করিয়া তাহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলাম।