শেষের কবিতা/আলাপের আরম্ভ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

শেষের কবিতা

অতীতের ভগ্নাবশেষ থেকে এবার ফিরে আসা যাক বর্তমানের নতুন সৃষ্টির ক্ষেত্রে। লাবণ্য পড়বার ঘরে অমিতকে বসিয়ে রেখে যোগমায়াকে খবর দিতে গেল। সে ঘরে অমিত বসল যেন পদ্মের মাঝ-খানটাকে ভ্রমরেরমতো। চারিদিকে চায়, সকল জিনিস থেকেই কিসের ছোঁওয়া লাগে, ওর মনটাকে দেয় উদাস করে। শেলফে পড়বার টেবিলে, ইংরেজি সাহিত্যের বই দেখলে; সে বইগুলো যেন বেঁচে উঠেছে। সব লাবন্যর পড়া বই, তার আঙুলে পাতা ওলটানো তার দিনরাত্রির ভাবনা-লাগা, তার উৎসুক দৃষ্টির-পথ-চলা, তার অন্যমনস্ক দিনে কোলের উপর পড়ে থাকা বই। চমকে উঠল যখন টেবিলে দেখতে পেলে ইংরেজ কবি ডান এর কাব্যসংগ্রহ। অকসফোর্ডে থাকতে ডন এবং তাঁর সময়কার কবিদের গীতিকাব্য ছিল অমিতর প্রধান আলোচ্য, এইখানে এই কাব্যের উপর দৈবাৎ দুজনের মন এক জায়গায় এসে পরস্পরকে স্পর্শ করল। এতদিনকার নিরুৎসুক দিনরাত্রির দাগ লেগে অমিতর জীবনটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, যেন মাস্টারের হাতে ইস্কুলের প্রতি বছরে পড়ানো একটা টিলে মলাটের টেকসট বুক। আগামী দিনটার জন্য কোনো কৌতুহল ছিল না, আর বর্তমান দিনটাকে পুরো মন দিয়ে অভ্যর্থনা করা ওর পক্ষে ছিল অনাবশ্যক। এখন সে এইমাত্র এসে পৌঁছল একটা নতুন গ্রহে; এখানে বস’র ভার কম; পা মাটি ছাড়িয়ে যেন উপর দিয়ে চলে; প্রতি মূহূর্ত ব্যগ্র হয়ে অভাবনীয়ের দিকে এগোতে থাকে; গায়ে হাওয়া লাগে, আর সমস- শরীরটা যেন বাঁশি হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, আকাশের আলো রক্তের মধ্যে প্রবেশ করে, আর ওর অন-রে অন-রে যে উত্তেজনার সঞ্চার হয় সেটা গাছের সর্বাঙ্গপ্রবাহিত রসের মধ্যে ফুল ফোটাবার উত্তেজনার মতো। মনের উপর থেকে কত দিনের ধুলো পড়া পর্দা উঠে গেল, সামান্য জিনিসের থেকে ফুটে উঠছে অসামান্যতা। তাই যোগমায়া যখন ধীরে ধীরে ঘরে এসে প্রবেশ করলেন সেই অতি সহজ ব্যাপারেও আজ অমিতকে বিষ্ময় লাগাল। সে মনে মনে বললে, আহা, এ তো আগমন নয়, এ যে আবিভাব।’ চল্লিশের কাছাকাছি তাঁর বয়স, কিন’ বয়সে তাঁকে শিথিল করে নি, কেবল তাঁকে গম্ভীর শুভ্রতা দিয়েছে। গৌরবর্ণ মুখ টসটস করছে। বৈধব্যরীতিতে চুল ছাঁটা; মাতৃভাবে পূর্ণ প্রসন্ন চোখ; হাসিটি স্নিগ্ধ। মোটা থান চাদরে মাথা বেস্টন করে সমস- দেহ সমবত। পায়ে জুতো নেই, দুটি পা নির্মল সুন্দর। অমিত তার পায়ে হাত দিয়ে যখন প্রণাম করলে ওর শিরে শিরে যেন দেবীর প্রসাদের ধারা বয়ে গেল। প্রথম পরিচয়ের পরে যোগমায়া বললেন,‘তোমার কাকা অমরেশ ছিলেন আমাদের জেলার সব চেয়ে বড়ো উকিল। একবার এক সর্বনেশে মকদ্দমায় আমরা ফতুর হতে বসেছিলুম, তিনি আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আমাকে ডাকতেন বউদিদি বলে।’ অমিত বললে,‘আমি তাঁর অযোগ্য ভাইপো। কাকা লোকসান বাঁচিয়েছেন, আমি লোকসান ঘটিয়েছি। আপনি ছিলেন তাঁর লাভের বউদিদি, আমার হবেন লোকসানের মাসিমা’ যোগমায়া জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার মা আছেন।’ অমিত বললে,‘ছিলেন। মাসি থাকাও খুব উচিত ছিল।’ ‘মাসির জন্যে খেদ কেন বাবা?’ ‘ভেবে দেখুন না, আজ যদি ভাঙতুম মায়ের গাড়ি বকুনির অন- থাকত না, বলতেন- এটা বাঁদরামি; গাড়িটা যদি মাসির হয় তিনি আমার অপটুতা দেখে হাসেন, মনে মনে বলেন-ছেলেমানুষি।’ যোগমায়া হেসে বললেন,‘তা হলে নাহয় গাড়িখানা মাসিরই হল।’ অমিত লাফিয়ে উঠে যোগমায়ার পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘এই জন্যেই তো পূর্বজন্মের কর্মফল মানতে হয়। মায়ের কোলে জন্মেছি, মাসির জন্যে কোনো তপস্যাই করি নি- গাড়ি ভাঙাটাকে সৎকর্ম বলা চলে না, অথচ এক নিমেষে দেবতার বরের মতো মাসি জীবনে অবতীর্ণ হলেন-এর পিছনে কত যুগের সূচনা আছে ভেবে দেখুন।’ যোগমায়া হেসে বললেন, ‘কর্মফল কার বাবা? তোমার না আমার, না যারা মোটর মেরামতের ব্যাবসা করে তাদের? ঘন চুলের ভিতর দিয়ে পিছন দিকে আঙ্গল চালিয়ে অমিত বললে,‘শক্ত প্রশ্ন। কর্ম একার নয়, সমস- বিশ্বের, নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে তারই সম্মিলিত ধারা যুগে যুগে চলে এসে শুক্রবার ঠিক বেলা নটা বেজে আটচল্লিশ মিনিটের সময় লাগালে এক ধাক্কা। তার পবে?’ যোগমায়া লাবণ্যের দিকে আড়চোখে চেয়ে একটু হাসলেন। অমিতর সঙ্গে আলাপ হতে না হতেই তিনি ঠিক করে বসে আছেন, এদের দুজনের বিয়ে হওয়া চাই। সেইটের প্রতি লক্ষ করেই বললেন,‘বাবা, তোমরা দুজনে ততক্ষণ আলাপ করো, আমি এখানে তোমার খাওয়ার বন্দোবস- করে আসি গে। দ্রুত তালে আলাপ জমাবার ক্ষমতা অমিতর। সে একেবারে শুরু করে দিলে, ‘মাসিমা আমাদের আলাপ করবার আদেশ করেছেন। আলাপের আদিতে হল নাম। প্রথমেই সেটা পাকা করে নেওয়া উচিত। আপনি আমার নাম জানেন তো? ইংরেজি ব্যাকরণে যাকে বলে প্রপার নেম।’ লাবণ্য বললে, ‘আমি তো জানি আপনার নামা অমিতবাবু।’ ‘ওটা সব ক্ষেত্রে চলে না’। লাবণ্য হেসে বললে, ‘ক্ষেত্র অনেক থাকতে পারে, কিন’ অধিকারীর নাম তো একই হওয়া চাই।’ ‘আপনি যে কথাটা বলছেন ওটা একালের নয়। দেশে কালে পাত্রে ভেদ আছে অথচ নামে নেই, ওটা অবৈজ্ঞানিক। জবষধঃরারঃু ড়ভ ঘধসবং প্রচার করে আমি নামজাদা হব সি’র করেছি। তার গোড়াতেই জানাতে চাই, আপনার মুখে আমার নাম অমিতবাবু নয়’। ‘আপনি সাহেবি কায়দা ভালোবাসেন? মিস্টার রয়?’ ‘একেবারে সমুদ্রের ও পারর ওটা দূরের নাম। নামের দূরত্ব ঠিক করতে গেলে মেপে দেখতে হয় শব্দটা কানের সদর থেকে মনের অন্দরে পৌঁছতে কতক্ষন লাগে।’ ‘দ্রুতগামী নামটা কী শুনি।’ ‘বেগ দ্রুত করতে গেলে বস’ কমাতে হবে। অমিতবাবুর বাবুটা বাদ দিন।’ লাবণ্য বললে,‘সহজ নয়, সময় লাগবে।’ ‘সময়টা সকলের সমান লাগা উচিত নয়। একঘড়ি বলে কোনো পদার্থ ত্রিভুবনে নেই, ট্যাকঘড়ি আছে, ট্যাক অনুসারে তার চাল। আইনস্টাইনের এই মত।’ লাবণ্য উঠে দাঁড়িয়ে বললে, ‘আপনার কিন’ স্মানের জল ঠান্ডা হয়ে আসছে।’ ‘ঠান্ডা জল শিরোধার্য করে নেব, যদি আলাপটাকে আরো একটু সময় দেন।’ ‘সময় আর নেই, কাজ আছে।’ বলেই লাবণ্য চলে গেল। অমিত তখনই স্মান করতে গেল না। স্মিতহাস্যমিশ্রিত প্রত্যেক কথাটি লাবণ্যর ঠোঁটদুটির উপর কি রকম একটি চেহারা ধরে উঠেছিল, বসে বসে সেইটি ও মনে করতে লাগল। অমিত অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখেছে, তাদের সৌন্দর্য পূর্ণিমারাত্রির মতো, উজ্জ্বল অথচ আচ্ছন্ন; লাবণ্যর সৌন্দর্য সকালবেলার মতো, তাতে অস্পষ্টতার মোহ নেই, তার সমস-টা বুদ্দিতে পরিব্যপ্ত। তাকে মেয়ে করে গড়বার সময় বিধাতা তার মধ্যে পুরুষের একটা ভাগ মিশিয়ে দিয়েছেন; তাকে দেখলেই বোঝা যায়, তার মধ্যে কেবল বেদনা শক্তি নয়, সেই সঙ্গে আছে মননের শক্তি। এইটেতেই অমিতকে এত করে আকর্ষণ করেছে। অমিতর নিজের মধ্যে বুদ্ধি আছে, ক্ষমা নেই; বিচার আছে, ধৈর্য নেই; ও অনেক জেনেছে, শিখেছে, কিন’ শানি- পায় নি- লাবণ্যর মুখে ও এমন একটি শানি-র রূপ দেখেছিল যে শানি- হৃদয়ে তৃপ্তি থেকে নয়, যা ওর বিবেচনাশক্তির গভীরতায় অচঞ্চল।