সন্ধ্যা সঙ্গীত/সংগ্রাম-সঙ্গীত

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

সংগ্রাম-সঙ্গীত।

হৃদয়ের সাথে আজি
করিব রে-করিব সংগ্রাম!
এত দিন কিছু না করিনু,
এত দিন বসে রহিলাম,
আজি এই হৃদয়ের সাথে
একবার করিব সংগ্রাম।
ওই দেখ, ওই আসে,  বুঝি চরাচর গ্রাসে
আমার হৃদয় অন্ধকার।
মেলিয়া অলস আঁখি,  কেমনে বসিয়া থাকি?
আক্রমিছে জগৎ আমার।


জগৎ করিছে হাহাকার!
বিলাপে পূরিল চারিধার!
কাঁদে রবি, কাঁদে শশি,  কেঁদে তারা পড়ে খসি,
কেঁদে উঠে বাযু শত বার!
চেয়ে দেখে দশ দিশি,  কাঁদে দিবা, কাঁদে নিশি,
মৌন সন্ধ্যা অমঙ্গল গণি,
দশ দিকে কাদে প্রতিধ্বনি!
ক্রন্দনের কোলাহল  আক্রমিছে নভস্থল,
শতমুখী বন্যার মতন,
কোলাহল-সিন্ধু মাঝে  জগৎ তরীর মত
করিতেছে উত্থান পতন!

এ আমার বিদ্রোহী হৃদয়
আমারে যে করিয়াছে জয়!
যে দিকে মেলিছে আঁখি  জ্বলে তরু মরে পাখী,
সে দিক হতেছে মরুময়!
চরাচরে আগুন লাগায়,
চারিদিকে দুর্ভিক্ষ জাগায়!
পরাণের অন্তঃপুরে  কাঁদিছে আকাশ পূরে
স্নেহ প্রেম বিধবার বেশে!

মৃত শিশু লয়ে বুকে  আশা বসি ম্লান মুখে,
ভস্মময় শ্মশান-প্রদেশে।
সুখ, অতি সুকুমার,  সহিতে নারিল আর,
কেঁদে কেঁদে মরে গেল শোকে!
জল নাই করুণার চোখে,
ফুল নাই কল্পনার বনে,
হাসি নাই স্মৃতির আননে!

বিদ্রোহী এ হৃদয় আমার
জগৎ করিছে ছারখার।
ফেলিয়া আঁধার ছায়া  গ্রাসিছে চাঁদের কায়া
সুবিশাল রাহুর আকার।
মেলিয়া আঁধার গ্রাস  দিনেরে দিতেছে ত্রাস,
মলিন করিছে মুখ তার!
উষার মুখের হাসি লয়েছে কাড়িয়া,
গভীর বিরামময়  সন্ধ্যার প্রাণের মাঝে
দুরন্ত অশান্তি এক দিয়াছে ছাড়িয়া!
প্রাণ হতে মুছিতেছে অরুণের রাগ,
দিতেছে প্রাণের মাঝে কলঙ্কের দাগ!
প্রাণের পাখীর গান দিয়াছে থামায়ে,


বেড়াত’ যে সাধ গুলি  মেঘের দোলায় দুলি
তাদের দিয়েছে হায় ভূতলে নামায়ে!
ক্রমশই বিছাইছে অন্ধকার পাখা,
আঁখি হতে সব কিছু পড়িতেছে ঢাকা!
ফুল ফুটে—আমি আর দেখিতে না পাই,
পাখী গাহে, মাের কাছে গাহে না সেআর!
দিন হল, আলাে হল, তবু দিন নাই,
আমি শুধু নেহারি পাখার অন্ধকার!

মিছা ব’সে রহিব না আর
চরাচর হারায় আমার।
রাজ্যহারা ভিখারীর সাজে,
ভস্ম, দগ্ধ, ধ্বংশ পরি  ভ্রমিব কি হাহা করি
জগতের মরুভূমি মাঝে?
আজ তবে হৃদয়ের সাথে
এক বার করিব সংগ্রাম!
ফিরে নেব, কেড়ে নেব আমি
জগতের একেকটি গ্রাম!
ফিরে নেব রবি শশি তারা,
ফিরে নেব সন্ধ্যা আর উষা,

পৃথিবীর শ্যামল যৌবন,
কাননের ফুলময় ভূষা!
ফিরে নেব হারান সঙ্গীত,
ফিরে নেব মৃতের জীবন,
জগতের ললাট হইতে
আঁধার করিব প্রক্ষালন!
আমি হব সংগ্রামে বিজয়ী,
হৃদয়ের হবে পরাজয়!
জগতের দূর হবে ভয়!
হৃদয়েরে রেখে দেব বেঁধে,
বিরলে মরিবে কেঁদে কেঁদে!
দুঃখে বিঁধি কষ্টে বিঁধি জর্জর করিব হৃদি
বন্দী হয়ে কাটাবে দিবস,
অবশেষে হইবে সে বশ,
জগতে রটিবে মোর যশ!
বিশ্ব চরাচর ময় উচ্ছ্বসিবে জয় জয়,
উল্লাসে পূরিবে চারিধার,
গাবে রবি, গাবে শশি, গবে তারা শূন্যে বসি
গাবে বায়ু শত শত বার।
চারিদিকে দিবে হুলুধ্বনি,

বরষিবে কুসুম আসার,
বেঁধে দেব বিজয়ের মালা
শান্তিময় ললাটে আমার!