হিন্দুজাতি; তাহার বর্ত্তমান অভাব ও তাহার কর্ত্তব্য

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search
 

হিন্দুজাতি;

 

তাহার বর্ত্তমান অভাব ও তাহার কর্ত্তব্য৷

 
 

১৭৯৩ শকের হিন্দুমেলায় পরিব্যক্ত হয়।

 
 

“উত্তিষ্টোত্তিষ্ট কিং শেষে”

 
 

কলিকাতা৷

 

জি, পি, রায় এণ্ড কোম্পানির যন্ত্রে মুদ্রিত।
এমামবাড়ী লেন, বেন্‌টিং ষ্ট্রীট।

 
 

১৭৯৩ শক।

 

হিন্দুজাতি;

 

তাহার বর্ত্তমান অভাব ও তাহার কর্ত্তব্য৷

 
 

  হিন্দুভ্রাতৃগণ!

 হিন্দুমেলার বয়ঃক্রম পাঁচ বৎসর পূর্ণ হইল। আমরা প্রতিবৎসর বন্ধুবান্ধবের সহিত মহোল্লাসে এই মেলা ক্ষেত্রে সমাগত হইয়া থাকি; এখানকার সমাহৃত দ্ৰব্যজগত এবং সঙ্গীত ব্যায়াম ক্রীড়া প্রভৃতি দর্শন ও শ্রবণ করিয়া পরিতৃপ্তি লাভ করি। আমাদের উৎসাহ উদ্যম সৌহার্দ্য ও অনুরাগ দর্শন করিয়া মেলার উদ্যোগীগণ কতই না আনন্দ অনুভব করেন? কেই বা এই মহৎ উদ্যোগ দেখিয়া সুখী না হইবে? যে দেখিবে যে হিন্দুগণ হিন্দু বলিয়া আপনাদিগকে জানিতেছে, হিন্দু বলিয়া আপনাদের পূর্ব্ব কীৰ্ত্তি স্মরণ করিতেছে এবং হিন্দু বলিয়া সেই নষ্ট কীর্ত্তি উদ্ধারের চেষ্টা করিতেছে—তাহারই হৃদয়ে বিমল আনন্দের সঞ্চার হইবে। হিন্দু নাম নিতান্ত মলিন ও ধূলিধূসরিত হইয়া লোকসাধারণের অদৃশ্য অগ্রাহ্য হইয়া যাইতেছিল; হিন্দুমেলা সেই হিন্দু নামকে উৰ্দ্ধে উত্থাপিত করিয়াছে এবং ইহার মলিনতা বিধৌত করিয়া ইহার পূর্ব্ব পরিচয় সকল প্রকাশ করিতেছে। হিন্দুমেলা সংস্থাপনাবধি হিন্দুদিগের এই সংস্কার জন্মিবার উপায় হইয়াছে যে আমাদের জাতিসাধণরণের বলিয়া একটী কিছু আছে, যাহাতে সকল হিন্দুরই অধিকার—যাহা হিন্দুদিগের দুর্গ স্বরূপ- যেখানে যাহা কিছু হিন্দু বলিয়া পরিজ্ঞাত হয় তাহা স্থান প্রাপ্ত হইবে—যেখানে কেবল হিন্দু দৃশ্যই দৃশ্যমান হইবে।

 এক সময় ছিল, যখন পৃথিবীতে হিন্দু দৃশ্য ভিন্ন লোক ব্যবহারের মধ্যে আর সুদৃশ্য কিছুই ছিল না। তখন হিন্দুগণ অন্যান্য জাতির উন্নতি সাধক ছিলেন । তখন প্রকৃত অর্থে আর কোন জাতিরই জাতিত্ব উৎপন্ন হয় নাই; হিন্দু জাতিকে আর কোন জাতির সহিত প্রতিযোগিতায় পড়িয়া উন্নতি শিক্ষা করিতে হয় নাই। হিন্দুগণ আর কোন জাতিকে আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেখেন নাই বলিয়া, তাঁহারা আপনাদের কোন জাতীয় নাম, জাতীয় আকার বা জাতীয় বন্ধন ব্যবস্থাপিত করেন নাই। তাঁহারা আর্য্য নামে প্রথিত হইয়াছেন—তাহাই তাঁহারদের তখনকার ভাবসঙ্গত ও তাঁহাদের উপযুক্ত নাম। এখন আমরা দেখিতেছি, পৃথিবীতে নানা জাতি উৎপন্ন হইয়াছে—এক একটী জাতি সভ্যতা পদবীতে অধিরূঢ় হইয়া আপনাদের জাতীয় গৌরব বৃদ্ধি করিতেছে—এখন স্বজাতির নামে এক এক লোকের শরীর রোমাঞ্চিত হইতে দৃষ্ট হয়। এমন কালে এই প্রাচীন হিন্দুজাতি অন্যান্য জাতির সহিত প্রতিদ্বম্বিতায় প্রবৃক্ত না হইলেও চিরপ্রথিত আপনার স্বতন্ত্র রীতি নীতির গুণে আপনি একটা পৃথক জাতি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অতঃপর এই জাতির ভাগ্যলক্ষী ইহার কি প্রকার গতি বিধান করেন তাই বলা যায় না।

 এক্ষণে এই সাগর সমান হিন্দুজাতির রীতি নীতি জ্ঞান ধৰ্ম্ম মান ও মহত্ত্ব বহু প্রকার দোষে মলিনীভূত হইয়াছে। তথাপি তৎসমুদায়ের মধ্যে যে সকল গভীর অর্থ আমরা দেখিতে পাই, তাহা বাক্যেতে বলিব কি, মনেতেও সম্পূর্ণ রূপে আয়ত্ত করিতে পারি না। যেমন শৈলরাজ হিমাচল, যেমন সিন্ধু ও গঙ্গানদী, এই হিন্দুজাতিও তদ্রুপ। এখনো ভারতের মহত্ত্বের পরিচয় স্বরূপ ঐ সকল পৃথিবীবিখ্যাত প্রাকৃতিক বস্তু যেমন বিদ্যমান আছে, সেই রূপ হিন্দুজাতিও ভারতের দীপক স্বরূপ হইয়া দীপ্তি পাইতেছে। যে জন্য ঈশ্বরনির্দেশে এই হিন্দুজাতি মনুষ্য জাতির আদিম উন্নতির প্রমাণ স্বরূপ দণ্ডায়মান আছে—যে জন্য তাঁহারই বিধানে এই প্রলয়ঙ্কর কাল হিন্দুজাতির কোন প্রধান ধৰ্ম্ম ও নীতি শাস্ত্রকে বিলুপ্ত করিতে পারে নাই—যে জন্য হিন্দু রীতি নীতি তৎসহোযোগিনী মিশ্রণভাববর্জ্জিতা সংস্কৃত ভাষার ন্যায় এখনো অন্য কোন দেশীয় রীতি নীতির সহিত মিশ্রিত হইয়া কলঙ্কিত হয় নাই—যে জন্য হিন্দুগণ ভিন্ন ভিন্ন রাজার অধীন হইয়াও সামাজিক রীতি নীতি সম্পর্কে এখনো সম্পূর্ণ স্বাধীন রহিয়াছেন—সেই জন্য এখনো সেই হিন্দুজাতিকে সুদৃঢ় বন্ধনে রক্ষিত হইতে হইতেছে। সেই জন্য এখন আবশ্যক হইতেছে যে, হিন্দুগণ আপনাদের জ্ঞান শক্তি মহত্ত্বে উত্থিত হউন এবং উচ্চশির হইয়া পৃথিবীস্থ সমুদায় উন্নত ও সুসভ্য জাতির সহিত মনুষ্যত্বের মহোচ্চ প্রতিষ্ঠা লাভ করুন। এই নিমিত্ত এখন চেষ্টা হইতেছে যে সমুদায় ভারতবর্ষের সর্ব্বত্র-বিস্তারিত সকল প্রকার হিন্দু দৃশ্য একত্রিত হয়—হিন্দুদিগের কি আছে তাহা হিন্দুগণ বিজ্ঞাত ও তৎতাবতের সহিত পরিচিত হয়েন এবং যত্নের সহিত সমুদায় রক্ষা ও ধারণ করেন। আমি এই মাত্র যাহা বলিলাম তাহা যদি সত্য হয়—যদি এই প্রাচীন ঋগ্বেদের একটী অক্ষর মাত্র বিনষ্ট না হইবার কোন বিশেষ গূঢ় তাৎপৰ্য্য থাকে—যদি এই মহানিধি স্বরূপ মহাভারত ও অতুল্য রামায়ণ এখনো উন্নত-জ্ঞান-সমন্বিত সুপণ্ডিত দিগের হৃদ্য পথ্য বলিয়া পরিগণিত হয়—এবং যদি আমাদের রীতি নীতি এখনো সেই সকল আৰ্য্য শাস্ত্রের উদাহরণ বা ছায়া স্বরূপ হয়, তবে হিন্দুগণ! প্রাণপণে হিন্দু নাম, হিন্দু শাস্ত্র, হিন্দু রীতি নীতি রক্ষা কর—হিন্দুসমাজকে দোষবিমুক্ত ও সেই নামের উপযুক্ত করিয়া ধারণ কর; তাহা হইলে কেবল বঙ্গদেশের কেন—কেবল ভারতবর্ষের কেন—সমস্ত পৃথিবীর মঙ্গল লাভ হইবে।

 ভ্রাতৃগণ! এখন প্রণিধান কর, হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য কি? আমরা হিন্দু, আমরা একটী স্বতন্ত্র জাতি—এইটা ভালরূপে আমাদের হৃদয়ঙ্গম করান ইহার প্রধান তাৎপৰ্য্য। পৃথিবীতে যেমন আর পাঁচটী জাতি আছে, যাহারা ধন ধান্য সমৃদ্ধিতে সুসম্পন্ন—যাহাদের নাম যশ সৰ্ব্বত্র শ্রুত হওয়া যায়—যাহারা পৃথিবীর উপরিস্থিত এক এক খণ্ড আকাশকে আলোকিত করিয়া রাখিয়াছে—আমরাও সেই রূপ একটী জাতি, আমাদেরও অন্যান্য জাতির ন্যায় ঐ রূপ প্রতিভান্বিত হওয়া আবশ্যক। ইহাই আমাদের হৃদয়ঙ্গম হইলে হিন্দু মেলার উদ্দেশ্য সফল হয়।

 আমাদের যে সকল অভাব তন্মমধ্যে প্রধান অভাব এই যে আমাদের ঐ সামাজিক ভাব বা যথার্থ জাতি বোধটী নাই। এইটি থাকিলে আর সমুদায় শীঘ্র বা বিলম্বে লাভ হইতে পারে। অতএব এই বিষয়টীর সবিশেষ আলোচনা করা কর্ত্তব্য। আমরা সৰ্ব্ব সাধারণ মনুষ্যের প্রতি যে কৰ্ত্তব্য তাহা যেমন পূর্ব্ব পুরুষদিগের নিকট শিখিয়াছি, জাতি সাধারণের প্রতি কৰ্ত্তব্য তেমন শিক্ষা করিতে পারি নাই। পরন্তু ইহাও সুস্পষ্ট সত্য যে আমাদের পূর্ব্ব পুরুষের জাতীয় ভাব বন্ধনে বা তাহার শিক্ষা দানে অপারগ ছিলেন তাছা নহে। তাহারা যে সময়ে জীবিত ছিলেন সে সময়ের উপযোগী যেরূপ কৰ্ত্তব্য তাহা তাঁহারা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা তাঁহাদের উচ্চশিরষ্কতা বহুদৰ্শিতা ও সৰ্ব্ব বিষয়ে দক্ষতা গুণে আমাদের যে সকল সমাজিক নিয়ম বদ্ধন করিয়া দিয়া গিয়াছেন, সে সকল নিয়ম আমাদিগকে বহুল বিপ্লব হইতে এত কাল পর্য্যন্ত রক্ষা করিয়া আসিতেছে—আরো কত কাল পর্য্যন্ত আমাদিগকে রক্ষা করিবে তাহা কে বলিতে পারে? অামাদের ক্রটি এই যে আমরা সেই সকল সমাজিক নিয়মাবলীর অর্থ বা ভাব বিশিষ্ট রূপে অবগত নহি, অথচ আমরা তাহা লোকাচার বা কুলাচার বলিয়া প্রতিপালন করিয়া আসিতেছি। এই কারণে দুইটী অশুভ ফল উৎপন্ন হয়। এক এই যে, আমরা যখন তখন তাহা ভাঙ্গিয়া ফেলিতে চাই; দ্বিতীয় এই যে, সেই সকল সামাজিক ভাব হইতে যে জাতি সাধারণের প্রতি কর্ত্তব্য কৰ্ম্মের শিক্ষা হয়, তাহা আমাদের নাই। এই শেষোক্ত বিষয়টী এস্থলে বিবেচ্য। সকলেই স্বীকার করিবেন যে, আমাদের বোধ এই রূপ যে আমরা কেবল এক একটী স্বতন্ত্র মনুষ্য। আমরা সামাজিক লোক, সমাজের সহিত আমাদের কোন সম্পর্ক আছে, এরূপ আমাদের ধারণা নাই; সমাজের জন্য আমাদের কিছু করিতে হইবে তাহা আমাদের স্বপ্নের অগোচর। সমাজের প্রতি এই রূপ উদাসীন থাকিয়া, জাতি সাধারণের প্রতিও আমরা সেই রূপ সম্পর্কশূন্য হইয় পড়িয়ছি।

 এইটী আমাদের প্রধান দোষ ও প্রধান অভাব; অতএব এই বিষয়টী আমাদের আরো বিশেষ আলোচনা করা কৰ্ত্তব্য। ইহারই উপরে আমাদের জাতীয় উন্নতি অনেক নির্ভর করিতেছে।

 আমরা এক্ষণে যে রূপ জীবন যাপন করিতেছি, ইহাতে আমরা সামাজিক মনুষ্য, ইহা কখনই বলা যাইতে পারে না। সমাজের শুভাশুভ বিষয়ে আমরা বিশেষ তত্ত্ব লই না; সমাজের কোন ব্যক্তি পুণ্য অনুষ্ঠান করিলে, কোন ব্যক্তি পাপাচারে রত হইলে, কোন ব্যক্তি অন্যায় রূপে কোন ব্যক্তি কর্ত্তৃক অত্যাচরিত হইলে বা বলাভাবে কোন সৎ পুরুষের দেশহিতকর কোন মহদুদ্দেশ্য সিদ্ধির বাধা জন্মিলে, আমদের তাহাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি বোধ হয় না। তজ্জনিত সমাজের কোন মঙ্গলামঙ্গলের বিষয়ে আমরা চিন্তা করি না। যাহা আমাদের গাত্রে অসিয়া প্রবল রূপে আঘাত না করে, তাহার প্রতি আমাদের দৃষ্টিপাত হয় না। আমাদের প্রথম সম্বন্ধ আপনার সহিত, দ্বিতীয় সম্বন্ধ পরিবারের সহীত, তৃতীয় সম্বন্ধ জীবিকার সহিত; তাহার পর আর কাহা্রো সহিত আমাদের কোন সম্বন্ধ আছে কিনা তাহা আমাদের গোচর নাই। তাহার এক বিশিষ্ট প্রমাণ এই যে, এপর্য্যন্ত আমাদের দেশের সাময়িক ও সংবাদ পত্রাদিতে ঐ রূপ সামাজিক বিষয় সকলের আলোচনা দৃষ্ট হয় না। কেবল মধ্যে মধ্যে কোন কোন মহাত্মা কর্ত্তৃক যে সকল সামাজিক সংস্কার ঘটনা বা তাহার প্রস্তাব উত্থিত হয়, সংবাদ পত্রাদি তাহারই সম্বন্ধে দুই চারি কথা বলিয়া, তাহা সেই সময়ের কাগজ, ইহারই মাত্র পরিচয় দেয়। লোকদিগেরও চর্চ্চা এই রূপ বিপথগামিনী হইয়াছে যে, তাঁহারা সংবাদ পত্রাদিতে কেবল ভিন্ন ভিন্ন দেশের যুদ্ধ বিবরণ, আশ্চৰ্য্য শিশু ও পশুর জন্ম বৃত্তান্ত, রাজকৰ্ম্মচারীদিগের নিয়োগ বা অবকাশের তালিকা প্রভৃতি কৌতূহল জনক বা স্বার্থসম্বন্ধীয় সংবাদ দেখেন, আর কিছুই দেখিতে চান না। নগরের বা গ্রামের কোন স্থানে বিজ্ঞাপন পত্র আলম্বিত হইলে, তাহা কোন দ্রব্য বিক্রয়ের তালিকা অথবা মিউনিসিপালিটী সংক্রান্ত কি না, লোকে প্রথমত এই দেখিতে তথায় আগমন করে; যদি তাহা সেরূপ না হয়, তবে আর, যাহাই হউক, তাহার সহিত তাহদের কোন সম্পর্ক আছে, এরূপ বিবেচনা হয় না।

 আমাদের ত এই রূপ ভাব, এই রূপ আচরণ, তার যাহারা জাতীয় গৌরবে গৌরবান্বিত, তাহাদের ব্যবহার কি রূপ, তাহাও প্রণিধান করিয়া দেখা যাউক। আমাদের মধ্যে যাঁহারা সেই সকল দেশে গিয়াছিলেন তাঁহারা স্বচক্ষে দেখিয়াছেন যে জাতীয় কোন একটী মহৎ কাৰ্য্যে তাহাদের সমুদায় লোকে আসিয়া যোগ দেয়,—চিকিৎসা শিল্প বিজ্ঞান প্রভূতির নিমিত্ত প্রত্যেক ব্যক্তি যথাশক্তি সাহায্য ও উৎসাহ দান করিয়া থাকে,—দূর দেশে বিদেশে অবস্থান করিয়াও তাহারা স্বজাতির প্রতি এক অবিচ্ছেদ্য স্নেহশৃঙ্খলেবদ্ধ থাকেন—স্বজাতির নামে তাঁহাদের আনন্দাশ্রু বিনির্গত হইতে থাকে। এই সকল দেখিয়া আমরা বিশিষ্ট রূপে জানিতে পারিতেছি যে, কেবল বসিয়া বসিয়া অবকাশ কালে দেশোন্নতির আলোচনা করিলে দেশোন্নতি হয় না। তজ্জন্য মনের প্রগাঢ় অভিনিবেশ আবশ্যক এবং দৃঢ় যত্ন ও অধ্যবসায় অবশ্যক। যাহারা ইতিহাসে কোন জাতির অভ্যুদয় বৃত্তান্ত পাঠ করিয়াছেন, তাহারাও দেখিয়াছেন যে, দেশের নিমিত্ত যাঁছাদের মরণে ভয় নাই, বন্ধনে ক্লেশ নাই, দুঃখ দারিদ্র্যে পরিতাপ নাই, রোগ শোকাদিতে সঙ্কপের ভঙ্গ নাই—এমন সকল লোকই সমাজের হিত—জাতির গৌরব—দেশের উন্নতি সাধন করিতে সমর্থ হইয়াছেন। তাহারা পরের দুঃখ আপনার বলিয়া জ্ঞান করেন, সমাজের মঙ্গলের জন্য সমস্ত জীবন ক্ষেপণ করেন, শয়নে স্বপ্নে দেশের উন্নতি চিন্তা করেন। তাঁহারা এই সকল কার্য্যে সর্ব্বস্ব সমর্পণ করেন—স্বদেশের নিমিত্ত প্রাণ দেওয়াকেও তাঁহারা অতি সামান্য কৰ্ম্ম মনে করেন। এমন সকল মহাশয় ব্যক্তি বিপক্ষ হস্তে আপনার রক্তস্রোত বহাইয়া দিয়া সমাজে শান্তির স্রোত প্রবাহিত করিয়াছেন, কত অন্যায়াচরণ সহ্য করিয়া ন্যায় স্থাপন করিয়াছেন; কত কাল ধরিয়া অশেষ কষ্ট স্বীকার করিয়া তাঁহারা এক একটী রাক্ষস সমাজকে সহৃদয় জন সমাজে পরিণত করিয়া গিয়াছেন।

 জাতীয় উন্নতির পক্ষে অন্যান্য দেশে যেমন ঘটিয়াছে,—এখানেও তাহাই ঘটিবে—তবে আমাদিগের উন্নতির সম্ভাবনা। তদ্ভিন্ন এদেশের উন্নতির আশা করা বৃথা। আমরা দুগ্ধফেণ-নিভ সুকোমল শয্যায় শয়ান থাকিয়া আপনাপন ধন মান সম্পদ ভাবিতে ভাবিতে এবং সুখের স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে কখনই জাতীয় উন্নতি সাধনে সমর্থ, হইব না। ইহা নিশ্চয়ই জানিতেছি—নিশ্চয়ই জানিতেছি। আমাদিগেরও শরীর হইতে ঘৰ্ম্ম ও রক্ত প্রবাহ্নিত হইবে—আমরাও এই দেশের ও সমাজের উন্নতির চেষ্টায় দুঃখ দারিদ্র্যের ভার লইয়া দেশ বিদেশে ভ্রমণ করিব—আমরাও সেই সকল বিদেশে বা স্বদেশে হয়ত খলস্বভাব লোকদিগের ষড়্‌ যন্ত্রে উৎপীড়িত হইব—হয়ত বা কোথাও কারারুদ্ধ হইয়া জীবনের অবশিষ্টাংশ বৃথায় অবসান করিব। আমরাও রৌদ্র রাষ্ট ঝটিকাদি সহ্য করিয়া—অনাহারে ক্লিষ্ট শরীর হইয়া—কখন সমুদ্রোপরি, কখন অরণ্য মধ্যে কেবল দেশের কল্যাণ ধ্যান করিতে করিতে রজনী অতিবাহিত করিব। যদি কখন এই দেশ এই জাতি পুনরুন্নত হয়, তাহার শুল্ক স্বরূপ এই সকল কষ্ট ক্লেশ আমাদিগকে সহ্য করিতেই হইবে, ইহার সন্দেহ নাই। এজন্য আমাদিগকে অকাতরে দিন যামিনী পরিশ্রম করিতে হইবে—শরীরের অস্থি গুলি পৰ্য্যন্ত দান করিতে হইবে এবং সহস্র বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে অগ্রসর হইতে হইবে। এতদ্ভিন্ন এতৎসদৃশ কার্য্যের অন্য কোন উপায় নাই; দেশোন্নতির জন্য কোন সুগম রাজবর্ত্ম প্রস্তুত হইতে পারে না।

 সকল দেশেই দেশোন্নতির এই সকল উপায়। আমরা কি শুনি নাই যে, এক জন সম্রাট্‌ স্বয়ং ভিন্ন দেশে গিয়া পোত নিৰ্ম্মাণ করিতে শিক্ষা করিয়া স্বদেশীয়দিগকে তাহা শিখাইয়াছিলেন? আমরা কি জানি না যে, যে সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি−যাহা শৈশবাবধি আমাদের পরিচিত হইয়াছে, তাহার এক এক তত্ত্ব উদ্ভাবন করিতে কত শত লোকের সাহায্য এবং কত বিজ্ঞানবেত্তা পণ্ডিতের ২৷৩ শত বৎসরের অপ্রতিহত যত্ন আবশ্যক হইয়াছে। আমরা কি শুনি নাই যে, কোন লোকহিতব্ৰত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুকালে আপনার শরীরকে চিকিৎসা শিক্ষার্থীদিগের শারীরস্থান তত্ত্ব পরীক্ষার নিমিত্ত খণ্ডিত বিখণ্ডিত হইতে দিয়া মহানন্দে স্বীয় অমূল্য জীবন ব্ৰত উদ্‌যাপন করিয়া ছিলেন? আমাদের দেশের উন্নতির পক্ষেও ঐ সকল উপায়; তদ্ভিন্ন অন্য উপায় নাই।

 ভ্রাতৃগণ! ইহার জন্য তোমাদিগকে উত্থিত হইতেই হইবে। এই কাল—এই দেশ—এই কালের সমুদায় ঘটনাবলি—তোমাদিগকে উত্থিত হইতে বলিতেছে। তোমরা যদি স্বেচ্ছাপূর্বক এই ভারত মাতার উন্নতির নিমিত্ত বদ্ধপরিকর না হও, অন্য প্রকারে বাধ্য হইয়া তোমাদিগকে তাহা হইতে হইবে। যখন সকল দেশ সুসভ্যতার অালোকে সমুজ্জ্বলিত, ভারতবর্ষ কখনই দীন ও মলিন হুইয়া থাকিবে না। যখন অন্যান্য জাতি উন্নতি শিখরে অধিরোহণ করিতেছে—হিন্দুজাতি সকলের অধম হইয়া থাকিবে না, বিলুপ্ত হইয়াও যাইবে না। ইহার নিমিত্ত সহস্ৰ অনুকূল ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেছি; যাহা প্রতিকূল বলিয়া আপাততঃ বোধ হয়, তাহাও অন্য প্রকারে অনুকূল ঘটনা বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। ভারতের কল্যাণ নিমিত্ত সকলে মুক্ত-হস্ত ও বদ্ধ-পরিকর হও, আর নিরস্ত থাকিলে চলিবে না। পূর্ব্বেই উল্লেখ করিয়াছি—এক কাল ছিল, যখন হিন্দুজাতি ভিন্ন আর কোন জাতি সভ্যতার স্বাদ জানিত না, যখন উন্নতি হউক বা না হউক, হিন্দুজাতিকে কাহারো সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়োজিত হইতে হইত না। সুতরাং সে সময়ে হিন্দুগণ কিছু কাল কোন নূতনতর উন্নতির সোপানে পদ নিঃক্ষেপ না করিলেও কতক অংশে এক প্রকার স্থিরপদে থাকিতে পারিয়াছিলেন। এখন আর সেরূপ থাকিবার যো নাই। এখন পৃথিবীর বহুল দেশে সভ্যতার আলোক বিকীর্ণ হইয়াছে এবং ঘটনা বশতঃ সেই সকল আলোক কিরণ এই ভারতবর্ষে—আমাদের গৃহাভ্যন্তরে—আসিয়া প্রকাশ পাইতেছে। জ্ঞান-ধর্ম্ম-সমুন্বত হিন্দুগণ চিরাস্বাদিত সভ্যতার সেই সকল প্রতিভাপুঞ্জ যেমন দেখিতেছেন; অমনি তাহার মৰ্ম্ম বুঝিতে সমর্থ হইতেছেন এবং কেহ বা তাহা গ্রহণ করিতে ব্যস্ত হইতেছেন। এই সময়ে, হিন্দুগণ! আর এক স্থানে সংস্থিত হইয়া। থাকিতে পার না। হয় অগ্রসর হও, নতুবা পশ্চাদ্বর্ত্তী হইতে হইবে। পশ্চাদ্বর্ত্তী হইয়াও সচ্ছন্দে থাকিতে পরিবে না, ঘরে বাহিরে সহস্র প্রকারে আঘাত ও নির্যাতন সহ্য করিতে হইবে। উদ্ভিদের বর্দ্ধন পক্ষে এই রূপ এক নিয়ম দেখা যায় যে, সে যদি আপনার মস্তকোপরি রৌদ্রের উত্তাপ প্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে সে সেই উর্দ্ধ দিকেই উত্থিত হইতে থাকে এবং সুস্থ সবল ও সরল শরীরে শাখা পল্লবে সুশোভিত হয়। কিন্তু যদি আপনার মস্তকোপরি সূর্য্য-রশ্মি প্রাপ্ত না হয়, তাহা হইলে চতুষ্পার্শ্বের আর যে দিকে তাহা প্রাপ্ত হয়, সেই দিকেই সে বক্রভাবে উত্থিত হয় এবং যথাকথঞ্চিত রূপে সেই সূর্য্য কিরণ গ্রহণ করিয়া, কতকঅংশে বিশুদ্ধ কতক অংশে প্রফুল্লিত, এইরূপ বিকলাঙ্গ লাভ করে। ঠিক ইহাই এখন হিন্দু-সমাজের অবস্থা। হিন্দুগণ! তোমরা যদি তোমাদের সমাজের উন্নতি সাধন না কর, যদি ইহার নিমিত্ত তোমাদের হৃদয় মন চেষ্টা ও যত্ন প্রযুক্ত না হয়, তাহা হইলে তোমরা অকৰ্ম্মণ্য হইয়া কেবল পরপ্রত্যাশী ও পরভাগ্যোপজীবী হইবে। তাহা হইলে সুখ স্বচ্ছন্দতার অন্যে যে আদর্শ প্রদান করিবে তাহাই তোমাদের শিরোধাৰ্য্য হইবে;—আর তাহা হইলে ইহাও জানিবে যে, সেই অন্য দেশীয়—অন্য জাতীয় উন্নতির আদর্শ উদ্ভিদের পার্শ্ববর্ত্তী আলোকের ন্যায় তোমাদিগকে কেবল বিকলাঙ্গ করিবে—কখনই সুস্থ ও প্রকৃতিস্থ হইতে দিবে না—কখনই যথার্থ উন্নত হইতে দিবে না। ইহার উদাহরণ এখনই সহস্ৰ সহস্ৰ লক্ষিত হইতেছে। অনেকে বিজাতীয় সভ্যতা দর্শন করিয়া তল্লাভার্থ নিতান্ত লোলুপ হইতেছেন। তাঁহারা উন্নতি বলিয়া এমন কিছু গ্রহণ করিতেছেন, যাহা হিন্দুদিগের চিরকালের রুচি-বিরুদ্ধ; তাঁহারা মঙ্গলকর বলিয়া যাহা মনে করিতেছেন, হিন্দুগণ হয়ত বহুকালের পরীক্ষা দ্বারা তাহা নিশ্চয় অমঙ্গলকর বলিয়া জানিয়া রহিয়াছেন। এই জন্যই, যাঁহারা সেই সকল আদর্শকে আপনাদেরও সমুদায় হিন্দুদিগের আদর্শ করিতে চান, তাঁহারা হিন্দুদিগের পক্ষে বিকৃত-দর্শন ও গর্হণীয় হইয়া উঠিতেছেন। পরে এরূপ উদাহরণ আরো কত দেখা যাইবে, তাহার আশ্চৰ্য্য নাই। এমন অবস্থায় হিন্দুগণ! কোন্‌ দিকে গমন করিবেন? কেমন করিয়া আপনাদের উন্নতির স্পৃহা চরিতার্থ করিবেন? কি রূপে সমাজের শান্তি রক্ষা ও মঙ্গল বিধান করিবেন? ইহার নিমিত্ত আপনারা চিন্তা আলোচনা ও সর্ব্ব প্রযত্নে চেষ্টা করুন্‌, নতুবা আপনাদের পরস্পরের মধ্যে মতের ও ভাবের ও স্বাদের বিভিন্নতা ও অস্থিরতা প্রযুক্ত উত্তরোত্তর সমাজের আরো দুৰ্গতিই দর্শন করিতে হইবে। সংক্ষেপে এই বলা যাইতেছে, যে এক্ষণে আমাদের রাশি রাশি অভাব, তৎপুরণার্থ আমাদের বহুল শিক্ষার প্রয়োজন; সেই শিক্ষার এই উপযুক্ত সময়; যদি আমরা আত্ম চেষ্টা দ্বারা সুশিক্ষা প্রাপ্ত না হই, কুশিক্ষকে আমাদের সর্বনাশ করিবে।

 আমার অত্যন্ত দুঃখোদয় হয়, যখন দেখি যে ইংলণ্ডীয়গণ আমাদের বিবাহ নিয়মের দোষ গুণ বিচার করিয়া থাকেন। আমাদের বিবাহ নিয়মের বাস্তবিক কয়েকটী দোষ আছে, তজ্জন্য আমরা বাক্য নিঃসারণ করিতে পারি না, যদি তাহা না থাকে, তাহা হইলে সমুদায় পৃথিবীকে আমরাই দেখাইতে পারি, বিবাহ কি গুরুতর ও পবিত্র বন্ধন। আমাদের আতিথ্যের যে নিয়ম আছে, তাহা আমরা অতি অল্পই পালন করিয়া থাকি; যদি তাহা যথাবৎ প্রতিপালিত হয়, তাহা হইলে আর কোন দেশের আতিথ্যের নিয়মকে তাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বলিয়া আমাদের বোধ জন্মে না। আমাদের কতক খানি বৃথা মর্য্যাদা বোধ আছে এবং আমরা পরিশ্রমে কাতর; এই দুইটী দোষ যদি পরিত্যক্ত হয়, তাহা হইলে আমরা দেখাইতে পারি যে আমাদের গার্হস্থ্য নিয়ম ও পরিবার বন্ধন যথার্থ মনুষ্যোচিত, সুখকর ও মঙ্গলদায়ক। বিবিধ দোষে আমাদের হৃদয় ও মন সঙ্কুচিত সংক্ষোভিত ও মলিন হইয়া রহিয়াছে। আমাদের এক ক্রটি অন্য ক্রটির পোষকতা করতেছে—এক অভাব অন্য অভাবের উদ্ভব করিয়া দিতেছে—এই সকল দোষসমাকীর্ণ আমাদের এই হিন্দু সমাজের যদি দোষ সকল পরিত্যক্ত হয়, তাহা হইলে আমরা একবারেই উন্নত হইয়া দাড়াইতে পারি। পিতৃপিতামহ কর্ত্তৃক উপার্জ্জিত যে অমূল্য রত্নরাজি আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি, যদি উপযুক্ত হইয় তাহার সদ্ব্যবহার করিতে পারি, তাহা হইলেই আমরা উন্নত পদবীতে অধিরূঢ় হইয়া ক্রমশঃ উৎকৃষ্টতর গতি প্রাপ্ত হইতে পারিব, সন্দেহ নাই।

 হে ভ্রাতৃণণ! অসীম আকাশের প্রতিচ্ছায়া একখানি ক্ষুদ্র অস্পষ্ট আদর্শে যেমন অতি অল্প মাত্র প্রতিফলিত হয়, সমুদায় হিন্দুজাতির ভাব ও অভাব সেইরূপ এই ক্ষুদ্র বক্তৃতার মধ্যে যৎসামান্য মাত্র পরিব্যক্ত হইল। কত কথা স্মরণ হইল না, কত কথা সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করিতে পারিলাম না। বিস্তীর্ণ সাগর সদৃশ হিন্দুজাতি চিন্তার চক্ষুতে আবির্ভূত, এ দিকে আপনার অক্ষমতা অনুভূত, এ অবস্থায় কেবল ক্ষোভ মাত্র মনোমধ্যে উদিত হইতেছে। কিন্তু যাঁহারা হিন্দুদিগের ভাব ও অবস্থা সম্যক পৰ্য্যালোচনা করিয়া দেখিরাছেন—এই মহতী মেলাতে যে সকল স্বদেশহিতৈষী মহাশয়েরা সমাগত হইয়াছেন—তাঁহাদের কিছু অপরিজ্ঞাত নাই। এখন সকলে বিবেচনা করুন, অামাদের কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম কি? আমরা কি করিব? কোথায় যাইব? কি প্রকারে ভারত মাতার দুঃখ নিবারণ করিতে সমর্থ হইব? ইহার জন্য সকলে সচেষ্ট হও; যাহা কৰ্ত্তব্য বিবেচনা হইবে তাহাই করিব, এইরূপ প্রতিজ্ঞারূঢ় হও; সকলে এক-হৃদয় এক-প্রাণ হইয়া উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে পদ নিঃক্ষেপ কর। আমরা জাত্যভিমানপরবশ হইয়া কিছুই করিব না, আমরা ভারত মাতার এই সকল প্রত্যক্ষ দৃষ্ট নিদারুণ দুঃখের প্রতীকারের উপায় অন্বেষণ করিব—হিন্দুজাতির অসামান্য জ্ঞান ও গৌরবকে বিলোপ দশা হইতে রক্ষা করিতে চেষ্টা করিব। প্রভাব বিস্তার আমাদের লক্ষ্য নহে, আমরা কেবল মনুষ্য নামের যোগ্য হইব, এই আকাঙ্ক্ষা করি। আমরা বিজয় পতাকা উড্‌ডীন করিতে অভিলাষী নহি—সুখে স্বচ্ছন্দে ঈশ্বর সেবায় জীবন যাত্রা নির্ব্বাহ করিব, এই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা কোন কুসংস্কারে বদ্ধ থাকিব না, কোন বৃথা অভিমানেরও দাসত্ব করিব না, সৰ্ব্ব প্রকারে মনুষ্যোচিত সুখ স্বচ্ছন্দ অবস্থায় কল্যাণের পথে বর্ত্তমান থাকিয়া মনুষ্য জীবনের সার্থকতা লাভ করিব এই আমাদের সঙ্কল্প। বিদেশীয় সাহায্য—অন্য জাতির উন্নতির উপাদান যতদূর আমাদিগকে স্বপদে প্রতিষ্ঠিত রাখে, তাহা গ্রহণ করিতে আমরা সঙ্কুচিত হইব না, কিন্তু আমরা চির দিন হিন্দুই থাকিব, হিন্দু নাম কদাচ পরিত্যাগ করিতে পারিব না। হিন্দু ভাব পরিত্যাগ করিলে আমরা মনুষ্যত্ব হইতেই কতক বঞ্চিত হইব। আমরা স্ত্রী শিক্ষার বিরোধী নহি, আমরা জানি যে সুশিক্ষা ব্যতীত স্ত্রীলোকেরা কখন সুরক্ষিত হইতে পারে না। কিন্তু আমরা সুশিক্ষাই চাই, কুশিক্ষার আমরা সম্পূর্ণ বিরোধী। আমাদের স্ত্রীলোকেরা যদি অবরোধ পরিত্যাগ করিয়া সতী লক্ষ্মীর ন্যায় স্বামীর বামপার্শ্ব শোভান্বিত করেন, তাহাই বা কেন অবাঞ্ছনীয় হইবে? কিন্তু যথেচ্ছাচারের সহিত আমাদের সম্মুখ সংগ্রাম। হিন্দুগণ সকল দেশের ভাষা ও সকল দেশের শাস্ত্র অধ্যয়ন করিবেন, তাহার সন্দেহ কি? কিন্তু তাঁহারা আপনাদের দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃত শাস্ত্রকে কখনই অবহেলা করিতে পরিবেন না। তদুভয় অগ্ৰেই আয়ত্ত করিতে হইবে, নতুবা তাঁহারা উন্নতির সুপথ প্রাপ্ত হইবেন না। যথার্থ সুখ, যথার্থ স্বচ্ছন্দতা, যথার্থ স্বাধীনতা, যথার্থ সভ্যতা, যথার্থ মঙ্গল, হিন্দুদিগের চিরদিনের আকাঙ্ক্ষিত ও উপভোগ্য বিষয়; এক দিনের নিমিত্তও আমরা তাহা গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হইব না ; এক দিনও আমরা উন্নতি-বিমুখ হুইব না; উন্নতির গণনায় কোন জাতির—কোন মনুষ্যের নিকট হীন প্রতিপন্ন হওয়া আর্য্য-ধৰ্ম্ম-সঙ্গত নহে, ইহা চির দিনই আমাদের স্মরণে থাকিবে।

 বয়োবৃদ্ধ পিতৃগণ! বয়ঃকনিষ্ঠ ভ্রাতৃগণ! সমবয়স্ক বন্ধুগণ ! আইস আমরা সকলে সমবেত চেষ্টা দ্বারা আমাদের সমাজের উন্নতি—দেশের উন্নতি সংসাধন করি। আর্য্যদিগের উপাৰ্জ্জিত মহামূল্য জ্ঞান ধৰ্ম্মের উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করি—হিন্দু নামের চির গৌরব রক্ষা করি। কি আশ্চৰ্য্য! পিতৃপুরুষগণ আমাদিগকে অক্ষয় ধনে ধনী করিয়া গিয়াছেন এবং আমাদের উন্নতির উচ্চতর ও বহুকালস্থায়ী সুদৃঢ় সোপান বাঁধিয়াও দিয়া গিয়াছেন। আমরা কি ঐ সকল সম্পদ ভোগ করিতেও পারিব না? সৎপুত্রের ন্যায় পিতৃ পুরুষ দিগের আসন পরিগ্রহ করিতে পারিব না? কিসের বিঘ্ন! কিসের বাধা! যদি আমরা সেই উন্নত পুরুষদিগের সন্তান হইয়া ঐ চিরপ্রথিত সুদৃঢ় উচ্চ পদবীতে অধিরোহণ করিতে সঙ্কুচিত বা অসমর্থ হই, তাছা হইলে আমাদিগকে ধিক্‌। আর বিলম্ব করিবার কাল নাই—অারো নিরস্ত থাকিলে নিশ্চিত অমঙ্গল। চারিদিকে নানা প্রকার কোলাহল শ্রুত হওয়া যাইতেছে; নানা আশঙ্কা উপস্থিত হইতেছে।—উত্থান কর, জাগ্রত হও, হিন্দুনাম বিলুপ্ত বা কলঙ্কিত হইতে দিও না। বঙ্গ দেশের জন্য—ভারতবর্ষের জন্য—সমুদায় পৃথিবীর জন্য হিন্দু নাম—হিন্দু কীৰ্ত্তি—হিন্দু গরিমা উজ্জ্বলভাবে রক্ষা কর। চারিদিকের ঘটনাবলী অামাদিগকে এই জন্য কৃতসঙ্কল্প হইতে বলিতেছে। যদি আমরা এই কার্য্যে অগ্রসর হই, আমাদের দুর্ব্বল শরীরে বল আসিবে, নির্ব্বীৰ্য্য মনে বীর্য্য আসিবে, উদ্যম চেষ্টা সাহস কিছুরই অভাব থাকিবে না; সকল বিঘ্ন চলিয়া যাইবে, যাহা এক্ষণে প্রতিবন্ধকতাচরণ করিতেছে, আমরা কাৰ্য্যানুবর্ত্তী হই, সে সকলই আমাদের অনুকূল হইয়া আসিবে। সিদ্ধিদাতা ঈশ্বর আমাদের সহায় হইবেন।

 

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০১৮ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৫৮ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।