আনন্দ-তুফান/আরতি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

আরতি।[১]

পালিত হইয়া যথা বায়সের বাসে,—
কর্ম্মদোষে—পিক-শিশু,
যবে জ্ঞান লভি’ ডাকে কুহুরবে,
শঙ্কা বড় উপজে তাহার।
বস্তুতও কাক-কুল হেরি’ এ ঘটনা,
বড় জ্বালা দেয় তারে ধরি’।
অবশেষে দেয় দূরে ফেলি, বাসা হ’তে—
যতদূর সামর্থ্য তা’দের।
আহা, তেমতি তোমারে ছাড়ি’ তারা!
মায়াবিনী বায়সীর বাসা—এই সংসার-নিবাসে,
কর্ম্মদোষে আসিয়াছি আমি।
যবে ছিল শিশুকাল,
পারি নাই ডাকিতে তোমারে;
শুনি নাই তবে, কি ব’লে ডাকিব মা তোমায়!
ক্রমে কাল-চক্র ঘুরিল যখন,
শক্তি আসি’, জ্ঞানরূপে, পশিল শরীরে,
হেরিলাম ‘মায়ার’ সংসার,—

অসার সকলি এ সংসারে;
ভয় বড় হইল তখন।
কিন্তু গো মা! ডরে, কাঁদিলাম যবে উচ্চৈঃস্বরে,
শত্রুদলও চিনিল তখনি;
জ্বালা দিল কত মতে তা’রা।—
ছাড়িল না কিন্তু মা আমারে।
এইরূপে যায় কিছুকাল, হাসি খেলি,
মুগ্ধ হয়ে মায়ার বাসায়—বদ্ধভাবে;
খাদ্যাখাদ্য, ভাল মন্দ, নারি বিচারিতে।
বড় জ্বালা দেয় যবে মায়া,
ডাকি তবে ‘নিস্তারিণী বলি’ মা তোমায়!
শত্রুদল ‘তারা’-নামে জ্বলে,
তাই তা’রা প্রহারে আমায়,—
বাঁধে গো মা বিষম বন্ধনে;
শক্তিহীন, না পারি কাটিতে ডুরি—কোন মতে।
অমানিশা হইলে অতীত,
উদিলে আকাশে রবি-ছবি,
হাসে যথা কমলের প্রাণ,—
তেমতি মা! মায়া-তামসীরে,
কোনক্রমে করিয়া যাপন,
হেরেছি তোমারে জ্যোতির্ম্ময়ি,—হৃদাকাশে।

হাসে প্রাণ আলোক হেরিয়া;
‘অহঙ্কার’ ধরে না হৃদয়ে!
মনে হয়,—“না ডরি শমনে যেন আর।
অন্য কথা কহিব কি আর—
শত্রুদলও ঘোষে মা সু-যশ!
যা’ হেরি সংসারে এবে, সবই শান্তিময়,
শান্তিময়ি! তব আবির্ভাবে।”
হয় নাই পূজামোর উপচার বিনা;
বলি-দান করিয়াছি পদে–রিপুদলে;
আরতি মা! করিব এখন,
অবশিষ্ট যা’ আছে আমার প্রিয় বলি’ ধরামাঝে—
নিবেদিয়া চরণে তোমার, তৃপ্তিহেতু। এইরূপে;–
জ্বল রে ‘সু-যশ’-ধূপ! উঠ রে সৌরভ,—
পাপ-গন্ধ হ’ক বিদূরিত।
‘পঞ্চভূত!’ জ্বাল পঞ্চদীপ;
মোহ-অন্ধকার যা’ক দূরে।
‘জ্ঞান’ ভাই! ধর হে আলোক—
হের মাতা দুৰ্গতিনাশিনী—হৃদয়-মন্দিরে তব।
‘দয়া!’ তুমি কর বাদ্যধ্বনি;
সংসারের অন্য কোন রোল

না যেন শ্রবণে পশে আর।
‘ক্ষমা!’ তুমি কর শঙ্খনাদ,
বিসংবাদ যা’ক পলাইয়া।
‘প্রাণ’ ভাই! চামর ধরিয়া—
এ শরীরে—শ্বাস-বায়ু করহ বীজন।
‘ভক্তি!’ তুমি দেখ যুক্তকরে—
লুকাতে না পান মাতা পতিতপাবনী।
আরতি করিব আমি মা’র,
ভুলাইব মায়া-মোহিনীরে।



  1. আরতি বা আরাত্রিক ব্যাপারের প্রকৃত তত্ত্ব যদি কোন সদাশয় সরল ব্যক্তি এই লেখকাভিমানীকে বুঝাইয়া দেন, তাহা হইলে আনন্দ-তুফানের আরাত্রিক একরূপ হইয়াছে কি না বুঝা যাইবে।