কঙ্কাবতী/দ্বিতীয় ভাগ/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


সপ্তম পরিচ্ছেদ

বনে

পুঁটলী হাতে করিয়া কঙ্কাবতী ব্যাঘ্রের নিকট আসিয়া অধোবদনে দাঁড়াইলেন। ব্যাঘ্র মধুরভাষে বলিলেন, — “কঙ্কাবতী! তুমি বালিকা! পথ চলিতে পরিবে না। তুমি আমার পৃষ্ঠে আরোহণ কর, আমি তোমাকে লইয়া যাই। তাহাতে আমার কিছুমাত্র ক্লেশ হইবে না।”

 কঙ্কাবতী গাছ-কোমর বাঁধিয়া বাঘের পিঠের উপর চড়িয়া বসিলেন। ব্যাঘ্র বলিলেন,— “কঙ্কাবতী! আমার পিঠের লোম তুমি দৃঢ় রূপে ধরা। দেখিও, যেন পড়িয়া যাইও না।”

 কঙ্কাবতী তাহাই করিলেন। ব্যাঘ্র বনাভিমুখে দ্রুতবেগে ছুটিলেন। বিজন অরণ্যের মাঝখানে উপস্থিত হইয়া ব্যাঘ্ৰ জিজ্ঞাসা করিলেন,— “কঙ্কাবতী! তোমার কি ভয় করিতেছে?”

 কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,— “তোমার সহিত যাইব, তাতে আবার আমার ভয় কি?”

 কঙ্কাবতী একথা বলিলেন বটে, কিন্তু একেবারেই যে তাঁহার ভয় নাই, তাহা নহে। বাঘের পিঠে তিনি আর কখনও চড়েন নাই, এই প্রথম। সুতরাং ভয় হইবার কথা।

 ব্যাঘ্র বলিলেন,— “কঙ্কাবতী! কেন আমি বাঘ হইয়াছি, সে কথা তোমাকে পরে বলিব। এ দশা হইতে শীঘ্রই আমি মুক্ত হইব, সেজন্য তোমার কোনও চিন্তা নাই। এখন কোনও কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিও না।”

 এইরূপ কথা কহিতে কহিতে দুইজনে যাইতে লাগিলেন। অবশেষে বৃহৎ এক অত্যুচ্চ পৰ্ব্বতের নিকট গিয়া দুইজনে উপস্থিত হইলেন।

 ব্যাঘ্র বলিলেন,— “কঙ্কাবতী! কিছুক্ষণের নিমিত্ত তুমি চক্ষু বুজিয়া থাক। যতক্ষণ না আমি বলি, ততক্ষণ চক্ষু চাহিও না।”

 কঙ্কাবতী চক্ষু বুজিলেন। ব্যাঘ দ্রুতবেগে যাইতে লাগিলেন। অল্পক্ষণ পরে, খল-খল করিয়া বিকট হাসির শব্দ কঙ্কাবতীর কর্ণ-কুহরে প্রবেশ করিল।

 কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,— “কি বিকট, কি ভয়ানক হাসি! ওরূপ করিয়া কে হাসিল?”

 বাঘ উত্তর করিলেন,— “সে কথা সব তোমাকে পরে বলিব। এখন শুনিয়া কাজ নাই। এখন তুমি চক্ষু উন্মীলন কর, —আর কোনও ভয় নাই।”

 কঙ্কাবতী চক্ষু চাহিয়া দেখিলেন যে, এক মনোহর অট্টালিকায় আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। পরিষ্কৃত, নানা ধনে পরিপূরিত, নানা সাজে সুসজ্জিত। রজতকাঞ্চনহীরা, মাণিক, মুকুতা চারিদিকে রাশি রাশি স্তূপাকার রহিয়াছে দেখিয়া কঙ্কাবতী মনে মনে অদ্ভূত মানিলেন। অট্টালিকাটি কিন্তু পর্ব্বতের অভ্যন্তরে স্থিত। বাহির হইতে দেখা যায় না। পৰ্ব্বত-গাত্রে সামান্য একটি নিবিড় অন্ধকারময় সুড়ঙ্গ দ্বারা কেবল ভিতরে প্রবেশ করিতে পারা যায়! পৰ্ব্বতের শিখরদেশ হইতে অট্টালিকার ভিতর আলোক প্রবেশ করে। কিন্তু আলোক আসিবার পথও এরূপ কৌশলভাবে নিবেশিত ও লুক্কায়িত আছে যে, সে পথ দিয়া ভূচর-খেচর কেহ অট্টালিকার ভিতর প্রবেশ করিতে পারে না; অট্টালিকার ভিতর হইতে কেহ যাইতেও পারে না। অট্টালিকার ভিতর, বসন, খাট, পালঙ্ক প্রভৃতি কোনও দ্রব্যের অভাব নাই। নাই কেবল আহারীয় সামগ্রী।

 অট্টালিকার ভিতর উপস্থিত হইয়া ব্যাঘ্র বলিলেন,— “কঙ্কাবতী! এখন তুমি আমার পৃষ্ঠ হইতে অবতরণ কর। একটুখানি এইখানে বসিয়া থাক, আমি আসিতেছি। কিন্তু সাবধান! এখানকার কোনও দ্রব্যে হাত দিও না, কোন দ্রব্য লইও না। যাহা আমি হাতে করিয়া দিব, তাহাই তুমি লইবে, আপনা আপনি কোনও দ্রব্য স্পর্শ করিবে না।”

 এইরূপ সতর্ক করিয়া ব্যাঘ্র সে স্থান হইতে চলিয়া গেলেন।

 কিছুক্ষণ পরে খেতু আসিয়া কঙ্কাবতীর সম্মুখে দাঁড়াইলেন।

 খেতু জিজ্ঞাসা করিলেন,— “কঙ্কাবতী আমাকে চিনিতে পার?”

 কঙ্কাবতী ঘাড় হেঁট করিয়া রহিলেন।

 খেতু পুনরায় বলিলেন,— "কঙ্কাবতী! এই বনের মাঝখানে আসিয়া তোমার কি ভয় করিতেছে?"

 কঙ্কাবতী মৃদুস্বরে উত্তর করিলেন,— "না, আমার ভয় করে নাই। তোমাকে দেখিয়া আমার ঘোমটা দেওয়া উচিত, লজ্জা করা উচিত। তাহা পারিতেছি না। তাই আমি ভাবিতেছি। তুমি কি মনে করিবে।

 খেতু বলিলেন,— “না, কঙ্কাবতী আমারে দেখিয়া তোমার ঘোমটা দিতে হইবে না, লজ্জা করিতে হইবে না; আমি কিছু মনে করিব না, তাহার জন্য তোমার ভাবনা নাই। আর এখানে কেবল তুমি আর আমি, অন্য কেহ নাই, তাতে লজ্জা করিলে চলিবে কেন? তাও বটে, আবার এখানে আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ নই। বিপদের আশঙ্কা বিলক্ষণ আছে।

 কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,— “কি বিপদ?"

 খেতু বলিলেন,— “এখন সে কথা শুনিয়া তোমার কাজ নাই। তাহা হইলে তুমি ভয় পাইবে। এখন সে কথা তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করিও না। তবে, এখন তোমাকে এইমাত্র বলিতে পারি যে, যদি তুমি এখানকার দ্রব্যসামগ্রী স্পর্শ না কর, তাহা হইলে কোনও ভয় নাই; কোনও বিপদ হইবার সম্ভাবনা নাই। যেইটি আমি হাতে তুলিয়া দিব, সেইটি লইবে; নিজ হাতে কোনও দ্রব্য লইবে না। একবৎসরকাল আমাদিগকে এইখানে থাকিতে হইবে। তাহার পর, এ সমুদয় ধনসম্পত্তি আমাদের হইবে। এই সমুদয় ধন লইয়া তখন আমরা দেশে যাইব। আচ্ছা! কঙ্কাবতী যখন আমি তোমাকে বিবাহ করি, তখন তুমি আমাকে চিনিতে পারিয়াছিলে?”

 কঙ্কাবতী উত্তর করিলেন,— “তা আর পারি নি? একবৎসরকাল তোমার জন্য পথপানে চাহিয়াছিলাম। যখন একবৎসর গত হইয়া গেল, তখনও তুমি আসিলে না, তখন মা আর আমি, হতাশ হইয়া পড়িলাম। মা যে কত কাঁদিতেন, আমি যে কত কাঁদিতাম, তা আর তোমাকে কি বলিব! কাল রাত্রিতে বাবা যখন বলিলেন যে, বাঘের সহিত আমি কঙ্কাবতীর বিবাহ দিব, আর সেই কথায় তুমি যখন বাহির হইতে বলিলে,— “তবে কি মহাশয়! দ্বার। খুলিয়া দিবেন?' সেই গৰ্জ্জনের ভিতর হইতেও একটু যেন বুঝিলাম যে, সে কাহার কণ্ঠস্বর। তারপর আবার, ঘরের ভিতর আসিয়া, যখন তুমি চুপি-চুপি মা'র কানে ও আমার কানে বলিলে,— 'কোনও ভয় নাই’। তখন তো নিশ্চয়ই বুঝিলাম যে, তুমি বাঘ নও।”

 খেতু বলিলেন,— “অনেক দুঃখ গিয়াছে। কঙ্কাবতী! তুমিও অনেক দুঃখ পাইয়াছ, আমিও অনেক দুঃখ পাইয়াছি। আর একবৎসরকাল দুঃখ সহিয়া এইখানে থাকিতে হইবে। তাহার পর ঈশ্বর যদি কৃপা করেন, তো আমাদের সুখের দিন আসিবে। দেখিতে দেখিতে একবৎসরকাল কাটিয়া যাইবে। তখন এই সমুদয় ঐশ্বৰ্য্য আমাদের হইবে। আহা! মা নাই, এত ধন লইয়া যে কি করিব? তাই ভাবি, মা যদি বাঁচিয়া থাকিতেন, তাহা হইলে পৃথিবীতে যাহা কিছু পুণ্যকৰ্ম্ম আছে, সমস্ত আমি মাকে করাইতাম। যাহা হউক, পৃথিবীতে অনেক দীন-দুঃখী আছে। কঙ্কাবতী! এখন কেবল তুমি আর আমি। যতদূর পারি, দুইজনে জগতের দুঃখ মোচন করিয়া জীবন অতিবাহিত করিব।”

 কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করিলেন,— “মাতার সৎকারকাৰ্য্য সমাপ্ত করিয়া আমাকে বাটীতে রাখিয়া, তাহার পর তুমি কোথায় যাইলে? কি করিলে? ফিরিয়া আসিতে তোমার একবৎসরের অধিক হইল কেন? তুমি ব্যাঘ্রের আকার ধরিলে কেন? সে সব কথা তুমি আমাকে এখন বলিবে না?”

 খেতু বলিলেন,— “না, কঙ্কাবতী! এখন নয়। একবৎসর গত হইয়া যাক, তাহার পর সব কথা তোমাকে বলিব।”

 কঙ্কাবতী আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না। কঙ্কাবতী ও খেতু, পৰ্ব্বত-অভ্যন্তরে সেই অট্টালিকায় বাস করিতে লাগিলেন। অট্টালিকায় কোনও দ্রব্য কঙ্কাবতী স্পর্শ করেন না। কেবল খেতু যাহা হাতে করিয়া দেন, তাহাই গ্রহণ করেন৷

 অট্টালিকার ভিতর সমুদয় দ্রব্য ছিল, কেবল খাদ্যসামগ্রী ছিল না৷ প্রতিদিন বাহিরে যাইয়া খেতু বনের ফলমূল লইয়া আসেন, তাহাই দুইজনে আহার করিয়া কালযাপন করেন! বাহিরে যাইতে হইলে, খেতু ব্যাঘ্ররূপ ধারণ করেন৷ বাঘ না হইয়া খেতু কখনও বাহিরে যান না৷ আবার অট্টালিকার ভিতর আসিয়া খেতু পুনরায় মনুষ্য হন৷ কেন তিনি ব্যাঘ্রের রূপ না ধরিয়া বাহিরে যান না, কঙ্কাবতী তাহা বুঝিতে পারেন না৷ খেতু মানা করিয়াছেন, সেজন্য জিজ্ঞাসা করিবারও যো নাই! এইরূপে দশ মাস কাটিয়া গেল।

 একদিন কঙ্কাবতী বলিলেন,— “অনেকদিন মাকে দেখি নাই। মাকে দেখিতে বড় ইচ্ছা! হয়, মা'ও আমাদের কোনও সংবাদ পান নাই; মা’ও হয় তো চিন্তিত আছেন। আমরা কোথায় যাইলাম, কি করিলাম, মা তাহার কিছুই জানেন না।”

 খেতু উত্তর করিলেন,— “অল্পদিনের মধ্যে পুনরায় দেশে যাইব, সেজন্য আর তাহাদিগকে কোনও সংবাদ দিই নাই। আর লোকালয়ে যাইতে হইলেই আমাকে বাঘ হইয়া যাইতে হইবে, সেজন্য আর যাইতে বড় ইচ্ছাও হয় না। কি জানি কখন কি বিপদ ঘটে, বলিতে তো পারা যায় না। যাহা হউক, মাকে দেখিতে যখন তোমার সাধ হইয়াছে, তখন কা’ল তোমার এ সাধ পূর্ণ করিব। কাল সন্ধ্যার সময় মা'র নিকট তোমাকে আমি লইয়া যাইব। কঙ্কাবতী! বৎসর পূর্ণ হইতে আর কেবল দুই মাস আছে; যদি তোমার ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে এই দুই মাস তুমি না হয়, বাপের বাড়ী থাকিও।”

 কঙ্কাবতী বলিলেন,— “না, তা আমি থাকিতে চাই না! তুমি এই বনের ভিতর নানা বিপদের মধ্যে একেলা থাকিবে, আর আমি বাপের বাড়ী থাকিব, তা' কি কখনও হয়? মা'র জন্য মন উতলা হইয়াছে— কেবল একবারখানি মাকে দেখিতে চাই। দেখাশুনা করিয়া আবার তখন ফিরিয়া আসিব।”