গুচ্ছ/বশীকরণ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন


বশীকরণ



 বিবাহ না করিয়াও পুলিন যখন জগতে বিবাহিত জীবনের অসারতা বুঝিতে পারিল, তখন মানব-জগতে এই নূতন সত্য প্রচার করিবার জন্য সে একটি সভা স্থাপন করিল। বিশ্বনিন্দুকগণ সেই সভার নাম রাখিয়াছিল “চিরকুমার সভা”।

 পুলিন স্বয়ং এই সভার সম্পাদক, তাহার সহপাঠগণের দলে যাহারা অবিবাহিত ছিল, তাহারা সকলেই এই সভার সদস্য। ক্ষীণক্লায়, দুরারোগ্য উদরাময়রোগগ্রস্ত, অধ্যাপক শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এই সভার সভাপতির আসন অলস্কৃত করিয়াছিলেন, অবশ্য তিনিও, অবিবাহিত। বিবাহিত অধ্যাপকের দল ও পুলিনের সহপাঠগণের মধ্যে যাঁহারা ইহারই মধ্যে বিবাহরূপ কলঙ্ক কালিমা মাখিয়াছিলেন, তাঁহারা অবশ্য এ সভায় স্থান পাইতেন না। প্রতি শনিবারে কলেজের ছুটির পরে সভার অধিবেশন হইত। অধিবেশনে বিবাহিত জীবনের অসারতা সম্বন্ধে বক্তৃতা করিয়া পুলিন ও প্রবোধ সর্ব্বাপেক্ষ অধিক প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিল। তাহারা যখন বিবাহ-প্রথাকে দেশের সকল দুঃখের কারণ বলিয়া দোষ দিয়া সভা গৃহ কাঁপাইয়া তুলিত, তখন বাহিরে দাঁড়াইয়া প্রবেশ লাভে বঞ্চিত বিবাহিত যুবকবৃন্দও কাঁপিয়া উঠিত।

 এক বৎসর কাল সভাটি বেশ চলিল; বিবাহযোগ্য কন্যাভারগ্রস্ত অভিভাবকগণ ভাবিয়া কুলকিনারা পাইল না। তাহারা বোধ হয় একমনে ভগবানকে ডাকিয়াছিল, কারণ এক বৎসর যাইতে না যাইতেই নিরুপায়ের উপায় স্বয়ং পথ দেখাইয়া দিলেন। বৎসরের শেষে বার্ষিক অধিবেশনের দিনে সভার একজন বিশিষ্ট সভ্যকে খুঁজিয়া পাওয়া গেলনা। গ্রীষ্মের ছুটির পরে এই সভ্যটিকে নীরবে বিবাহিতের দলে মিশিয়া যাইতে দেখিয়া পুলিন ও প্রবোধ ক্রোধে ও ক্ষোভে পাগল হইয়া উঠিল। সভার দিনে ভারতের ইতিহাস হইতে বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্তগুলি খুঁজিয়া বাহির করিয়া পুলিন যখন সেই তালিকার শেষে এই সভ্যের নামটি যোগ করিয়া দিল, তখন করতালির ধ্বনিতে সভাগৃহ মুখরিত হইয়া উঠিল। এই নূতন বিশ্বাসঘাতকটি যদি তাহা শুনিতে পাইত, তাহা হইলে হয় তো মাটিতে মিশিয়া যাইত, না হয় নিজের মস্তকে বজ্রাঘাত প্রার্থনা করিত।

 কিন্তু পুলিন ও প্রবোধের ওজস্বিনী বক্তৃতা সত্ত্বেও সভার সভ্যসংখ্যা কমিতে লাগিল। বিশ্বাসঘাতক নীচাশয় কন্যাকর্ত্তার দল ও অর্থলোলুপ অপরিণামদর্শী বরকর্তাগণ একে একে এই নূতন চিরকুমার সভার সভাগুলিকে ভাঙ্গাইয়া লইতে আরম্ভ করিল। বক্তৃতা করিয়া পুলিন ও প্রবোধের গলা ভাঙ্গিয়া যাইবার উপক্রম হইল, সভাগৃহের অনেকগুলি টেবিল ভাঙ্গিয়া গেল, কিন্তু তাহাসত্ত্বেও সভ্যসংখ্যা কমিতে লাগিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটী উপাধি পাইয়া পুলিন যখন নূতন উপাধি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইল, তখন সভার অবস্থা দেখিয়া তাহার বুক ভাঙ্গিয়া গেল। বাঁকে ঝাঁকে কন্যাদায়ুপ্রপীড়িতদুর্ব্বত্ত্বগণ সভার সভ্যসংখ্যা হ্রাস করিতে লাগিল, দুই একজন নূতন সভ্য আসিল বটে, কিন্তু তাহাতে ক্ষতির শতাংশের এক অংশও পূরণ হইল না। এম্‌-এ পরীক্ষা দিয়া পুলিন যখন দেশে ফিরিল তখন সভার সভ্য সংখ্যা মাত্র পাঁচজন।

 পুত্রের মন ভারি দেখিয়া পুলিনের মাতা যখন স্বামীর নিকটে পুলিনের বিবাহের কথা উত্থাপন করিলেন, তখন পুলিনের পিতা শিহরিয়া উঠিলেন। তিনি বলিলেন “সর্ব্বনাশ, তুমি ছেলেটিকে ঘরে রাখিতে দিবেনা দেখিতেছি। তোমার পুত্র যে জগৎ উদ্ধার করিবার জন্য চিরকুমার সভা স্থাপন করিয়াছে। সেকি কখনও বিবাহ করিতে পারে?” পুলিনের যশঃ কলিকাতা ছাড়াইয়া সুদূর পল্লীগ্রামেও ব্যাপ্ত হইয়াছিল। তাহার মাতা কিন্তু তাহা বুঝিলেন না, তিনি সহজে ছাড়িবার পাত্রী নহেন। অবশেষে বিরক্ত হইয়া পুলিনের পিতা বলিলেন “তুমি যদি ছেলের মত করাইতে পার তাহা হইলে তাহার বিবাহ দিতে আমার বিন্দু মাত্রও আপত্তি নাই।” বিজয়োল্লাসে মাতা যখন পুত্রের নিকট বিবাহের প্রস্তাব করিলেন, তখন পুলিন অন্নহীনতা, শিশুমড়ক এবং আরও কত, কি দুর্ব্বোধ্য কথা বলিয়া তাঁহাকে নির্ব্বাক করিয়া দিল, তিনি পলাইতে পথ পাইলেন না।

 মায়ের মন কিন্তু বুঝেন, পুত্র যখন চিরকুমার সভার ভবিষ্যৎ চিন্তায় আকুল, মাতা তখন গোপনে গোপনে সুন্দরীকন্যার অনুসন্ধানে ব্যস্ত। আইন পড়িতে কলিকাতায় আসিয়া পুলিন একটী ঘোর দুঃসংবাদ শুনিয়া বসিয়া পড়িল। বিবাহিতের দল তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া শুনাইল যে প্রবোধ বিবাহ করিয়াছে। সুমেরু পর্ব্বত যদি মক্ষিকায় নাড়িত, শিলা যদি জলে ভাসিয়া যাইত, বানরে যদি সঙ্গীত গাহিত, তাহা হইলেও পুলিন বোধ হয় এতদূর আশ্চর্যাম্বিত হইতনা। যে প্রবোধ তাহার দক্ষিণ হস্ত, যে প্রবোধ বলিয়াছিল সে স্ত্রীজাতিকে কুষ্ঠব্যাধির ন্যায় ঘৃণা করে, যে প্রবোধ তাহার ভারত-যুদ্ধে মধ্যম পাণ্ডব, সেই প্রবোধের এই কাজ! বিবাহিতের দল তাহার অবস্থা দেখিয় তাহাকে ঘিরিয়া তাণ্ডব নৃত্য জুড়িয়া দিল। পুলিন বহুকষ্ট্রে তাহাদিগের ব্যূহ ভেদ করিয়া বাহিরে আসিল, আসিয়া দেখিল সম্মুখেই প্রবোধ। কিন্তু প্রবোধ যখন তাহাকে দেখিয়া সলজ্জভাবে নতদৃষ্টিতে পাশ কাটাইয়া চলিয়া গেল, তখন তাহার আর কিছুই বুঝিতে বাকি রহিল না।

 রাগে, লজ্জায় অপমানে পুলিন যেন কেমনতর হইয়া গেল সে কেবল বসিয়া বসিয়া ভাবিত যে মূঢ় মানব তাহার উচ্চ উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিল না, সকলে মিলিয়া তাহার জীবনের ব্রত পণ্ড করিয়া দিল। সে স্থির করিল সে নিজে জগতের আদর্শ হইয়া থাকিবে, কখনও স্ত্রীজাতির ছায়া মাড়াইবেন।

 অসভ্য জগৎ যেমন ভাবে চলিতেছিল্‌ ঠিক তেমনি ভাবেই চলিয়া যাইতে লাগিল। পুলিনের উচ্চ আদর্শ মূঢ় মানবকে মোহ মুক্ত করিতে পারিলনা। দেখিয়া শুনিয়া মানুষের উপরে পুলিনের একটা বিজাতীয় ঘূণা জন্মিয়া গেল, তাহার আইন পড়া আর শেষ হইলনা; সে মফস্বলের একটি কলেজে চাকরী লইয়া বিদেশে চলিয়া গেল। পুলিন পিতামাতার একমাত্র সন্তান, তাহার পিতা নব্য তন্ত্রে শিক্ষা দীক্ষা লাভ করিয়াও প্রাচীন শিক্ষার প্রভাব একেবারে বিস্তৃত হইতে পারেন নাই। এক মাত্র পুত্র সেও বিবাহ করিলনা; বংশ লোপ হইবে, পিন্ডলোপ হইবে, পিতৃপিতামহের ভিটায় সন্ধ্যাকালে দীপ জ্বলিবেন, এই চিন্তা শেষ বয়সে তাঁহাকে আকুল করিয়া তুলিয়াছিল। পুলিনের মাতা সর্ব্বদা চোখের জলে ভাসিতেন, তাঁহার দশা দেখিয়া পুলিনের পিতা আরও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন।

 গ্রীষ্মাবকাশে পুলিন কর্ম্মস্থান হইতে গৃহে ফিরিল, তখন তাহার পিতামাতা তাহাকে ধরিয়া পড়িলেন। পুলিন মাতার চোখের জল গ্রাহ্য করে নাই; কিন্তু পিতার সনির্ব্বন্ধ অনুরোধ এড়াইতে পারিলনা। তিনি যখন কাতর কণ্ঠে প্রাচীন বংশ লোপ ও পিতৃ-পিতামহের পিন্ডলোপের আশু সম্ভাবনা জানাইলেন, তখন পুলিন নীরবে শুনিয়া গেল। তাহার মনে যাহাই থাকুক না কেন, প্রকাশ্যে সে কোন আপত্তি করিতে পারিল না। পুলিন বিবাহ করিবে এই সংবাদ নক্ষত্রবেগে বঙ্গদেশ ছাইয়া ফেলিল, নানাদেশ হইতে চিরকুমার সভার ভূতপূর্ব্ব সভ্যগণ উপহার পাঠাইতে লাগিল। পুলিনের কিন্তু অনুতাপ বা লজ্জার চিহ্নমাত্র দেখা গেল না। সে ঠিক করিয়া রাখিয়াছিল যে সে পিতার আদেশ পালন করিবে বটে, কিন্তু তথাপি জগতের আদর্শ হইয়া থাকিবে। সে বিবাহ করিবে কিন্তু স্ত্রীর মুখ দর্শন করিবেনা।

 মহাসমারোহে কলিকাতায় পুলিনের বিবাহ লইয়া গেল। প্রবোধ, নরেশ প্রভৃতি পুলিনের ভূতপূর্ব্ব সহচরগণ একত্র হইয়া মহা আনন্দ করিতে লাগিল; কেহ বলিল এতদিনে মহাপুরুষের পতন হইল; কেহ বলিল কন্য-কর্ত্তাদের উৎপাতে বাঙ্গালা দেশে আর সাধু পুরুষ রহিল না; কেহ বলিল পুলিন দেওয়ালে লিখিয়া রাখিয়াছিল যে এইবার ডাকিলেই যাইব। প্রবোধের স্ত্রী বলিয়া পাঠাইলেন যে, মহাপুরুষদিগকে তাঁহার পূর্ব্ব হইতেই জানাছিল, তবে কেহ বা দুদিন আগে, কেহবা দুদিন পরে ধরাদিল। পুলিন নীরবে সমস্ত সহ্য করিয়া গেল। বিবাহের দিনে চিরকুমার সভার অধঃপতনের কারণ গুলি মূর্ত্তিমতী হইয়া বরের গৃহে দেখা দিলেন। সভার বাঁধা গৎগুলি প্রবোধের স্ত্রীর আগাগোড়া মুখস্থ ছিল, তিনি মহিলা সভায় তাহা আওড়াইয়া বিবাহ-বাড়ী কোমলকলহাস্যে মুখরিত করিয়া তুলিলেন। পুলিন তখন মনে মনে ভাবিতেছিল যে ক্ষুদ্রচেতা নরনারীগুলি জগতের যে কি সর্ব্বনাশ করিতেছে, তাহারা তাহা বুঝিতেছেনা। এইরূপে মহাপুরুষের কৌমারব্রত ভঙ্গ হইল।

 বিবাহের পরে দুইবৎসর কাটিয়াগেল, পুলিনের পিতা পুত্রের বিবাহ দিয়া অধিকতর বিপদে পড়িলেন। বিরাহের পরে যখন বধূ ঘরে আসিল, তখন পুত্র আর ঘরে আসিতে চাহিলন। বৃদ্ধ পুত্রবধূ লইয়া ব্যতিব্যস্ত হইয় পড়িলেন। পুলিনের স্ত্রীর নাম বিভা, সে সুন্দরী, সুশিক্ষিতা ও গুণশালিনী। বিবাহের সময় তাহার বয়স হইয়াছিল, সে নিতান্ত বালিকা ছিলনা, সে পতির অনাদরের কারণ বুঝিতনা বটে কিন্তু আদরের অভাব বুঝিত। বুধিয়া সে সর্ব্বদা ম্রিয়মাণ হইয়া থাকিত, তাহার সেই করুণ ভাবটি শ্বশুর শ্বশ্রূর বুকে সর্ব্বদা শেলের মত বিধিয়া থাকিত। বৃদ্ধ বৃদ্ধা উপায় না দেখিয়া ভগবানকে স্মরণ করিতেন, তাই অগতির গতি প্রসন্ন হইয়া পথভ্রান্তের পথনির্দ্দেশ করিয়া দিলেন।

 শোভা সম্পর্কে বিভার বড় বোন, বিভার বিবাহের পাঁচ ছয় বৎসর পূর্ব্বে তাহার বিবাহ হইয়াছিল। শোভা বড়ই রহস্যপ্রিয়া, বাড়ীতে তাহার সহিত কেহ আঁটিয়া উঠিতে পারিতনা। বিভার বিবাহের দুই বৎসর পূর্ব্বে শোভা স্বামীর সহিত বিদেশে চলিয়া গিয়াছিল, এবং বিভার বিবাহের সময় আসিতে পারে নাই বলিয়া কত দুঃখ করিয়া চিঠি লিখিয়ছিল। বিভার ভবিষ্যৎ মালিককেও এক খানা পত্র লিখিয়াছিল, কিন্তু তাহার সে কাব্যের উৎস পুলিনের নীরস মরুভূমিতে পড়িবামার শুকাইয়া গিয়াছিল। এই সময়ে ভগবান অগতির গতি নির্দ্দেশ করিবার জন্য শোভাকে দেশে পাঠাইয়া দিলেন।

 শোভা দেশে ফিরিয়া শুনিল যে বিভা শ্বশুর গৃহে। বিভার মাতার মুখে সে বাল্যসখীর দূরদৃষ্টের কথা শুনিয়া তাহার সহিত দেখা করিবার জন্য বড়ই ব্যস্ত হইয়া পড়িল। তাহার অনুরোধে বিভার মাতা বিভাকে আনিতে পাঠাইলেন, পুলিনের পিতা বাক্যব্যয় না করিয়া বধূকে পিত্রালয়ে পাঠাইয়া দিলেন। দীন, মলিনা পুত্রবধূর মূর্ত্তি তাঁহার চক্ষে অসহ্য হইয়া উঠিয়াছিল, তিনি বধূকে পিত্রালয়ে পাঠাইয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন। বিভা পিত্রালয়ে আসিল, দুই সখীতে মিলন হইল, শোভা অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিল, কিন্তু উত্তর পাইলনা, কারণ বিভা কাঁদিয়া ভাসাইয়া দিল।

 শোভা ছাড়িবার পাত্রী নহে, সে নানা উপায়ে সখীর মনের গোপন কথাগুলি জানিয়া লইল। সমস্ত জানিয়া সে বিভাকে অভয় দিয়া বলিল “তোর কোন ভয় নাই, আমি এর বিহিত করিব।” বিভা আশ্বাস পাইয়া আশায় বুক বাঁধিল।

(৩)

 শিক্ষকতা করিয়া ছাত্র মহলে পুলিনের খুব প্রশংসা হইয়াছিল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাহার বেতন বৃদ্ধি হইল, সে পাটনায় বদলী হইল। শোভা যখন দেশে ফিরিল, পুলিন তখন পাটনায়। পাটনায় একটি সুন্দর ছোট বাঙ্গলায় পুলিনের বাস। সে কাহারও সহিত মিশিত না আপনার পড়া-শুনা ও কলেজের কাজ লইয়াই ব্যস্ত থাকিত। সুতরাং একদিন সকালে তাহার ভৃত্য যখন আসিয়া সংবাদ দিল যে একটি ভদ্রলোক তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছেন, তখন সে বড়ই আশ্চর্য্য হইয়া গেল। সে বাহিরে আসিয়া দেখিল যে নীলবর্ণের চশমা-ধারী একটি ভদ্রলোক তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। পুলিনকে দেখিয়াই তিনি বলিয়া উঠিলেন “এই যে, আপনারই নাম পুলিন বাবু? আমার নাম শ্রীনিশীথনাথ ঘোষাল। মহাশয়ের সহিত আমার সম্পর্ক বড়ই নিকট। আমার স্বামিনী মহামহিমান্বিত শ্রীল শ্রীযুক্তা শোভনা-দেবীর খাস-সখী, এবং খুল্লতাতপুত্রী শ্রীযুক্তা বিভাদেবীর সহিত আপনার বিবাহ হইয়াছে। শ্রীমতীর আদেশে আমি আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছি। আমরা সম্প্রতি পাটনায় আসিয়াছি, উদ্দেশ্য স্বাস্থ্য সংস্কার। মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিবার ইচ্ছাটা বড়ই বলবতী ছিল।” এই কথা কয়টি গুনিয়া পুলিন হাড়ে চটিয়া গেল। লোকটির কথাবার্ত্তা হাবভাব সমস্তই যেন বিদ্ধপব্যঞ্জক কিন্তু কথাগুলি অত্যন্ত গম্ভীর ভাবে অথচ হাসি-মুখে বলা। সে ভাবিয়া কিছু ঠিক করিতে না পারিয়া বলিয়া ফেলিল “বসুন, চা খাবেন কি?” ভদ্রলোকটি এক গাল হাসিয়া উত্তর করিলেন “চা না খাওয়াইয়া শ্রীমতী কি আমাকে এতদূর আসিতে দিয়াছেন? আমার যে কাহিল শরীর?” কথা শুনিয়া পুলিন হাসিয়া ফেলিল। কারণ আগস্তুকের ঈষৎ স্থূল দেহে দুর্ব্বলতার চিহ্ন মাত্র দেখা যাইতেছিলনা। তিনি বোধ হয় পুলিনের মনের ভাব বুঝিতে পারিয়াছিলেন কারণ তিনি বলিয়া উঠিলেন “আমার শরীর দেখিয়া ভাবিবেন না যে আমি বড় বলবান্‌, তিল তিল করিয়া, দিন দিন আমার শরীরটি ক্ষীণ হইয়া বাইতেছে। সেই জন্যইত বায়ু পরিবর্ত্তনে আসিয়াছি। আপনার বাড়ীতে কি তামাকের বন্দোবস্ত আছে?”

 পুলিন অপ্রস্তুত হইয়া বলিল “না।”

 নিশীথ। থাক, আমার পকেটে সিগারেট আছে। আপনি বসুন। দাঁড়িয়ে রইলেন যে?

 পুলিন বসিয়া পড়িল, তাহার বড়ই জালাতন বোধ হইতেছিল, নিশীথ বাবু বলিয়া যাইতে লাগিলেন “এই দারুণ গ্রীষ্মে, এবং এই কাটফাটা রৌদ্রে, এবং বিশেষতঃ এই দুর্ব্বল শরীরে শ্রীমতী যে বিনা কারণে আমাকে এতদূর পাঠান নাই, তাহ আপনি অবশ্যই বুঝিতে পারিতেছেন।”

 পুলিন। কি কারণ?

 নিশীথ। আপনার বিবাহের সময় আমরা বিদেশে ছিলাম শ্রীমতী আপনাকে দেখেন নাই বলিয়া বড়ই ব্যাকুল হইয়াছেন।

 পুলিন। তিনি কি এখানে আসিয়াছেন?

 নিশীথ। তিনি না আসিলে আমি কি এখানে আসিতে পারিতাম?

 পুলিন। আপনার কোথায় আছেন?

 নিশীথ। এই বড় রাস্তার মোড়ের উপরে; শ্রীমতীর আদেশ যে আজ রাত্রে আপনি দীনের কুটীরে পদার্পণ করবেন।

 পুলিন। কলেজ থেকে ফিরিবার সময় দেখা করে এলে হ’তনা?

 নিশীথ। সর্ব্বনাশ, তাহলে কি আমার রক্ষা থাকবে? মহাশয় মাপ করুন; এই দুর্ব্বল অবস্থায় পারিবারিক শান্তিভঙ্গের কল্পনা করিলেও আমার মাথা ঘুরিতে থাকে।

 পুলিন নিরুপায় হইয়া বলিল “আচ্ছা যাব।”

 সন্ধ্যার সময়ে পুলিন নিশীথ বাবুর বাসায় উপস্থিত হইল। সে দেখিল বাঙ্গালাটি সুন্দর সাজান, দু একদিনের জন্য বেড়াইতে আসিয়া লোকে যে এমন ভাবে থাকিতে পারে তাহা পুলিনের কল্পনাতীত। তাহাকে দেখিয়া একজন বেহারা বাড়ীর ভিতরে খবর দিতে গেল। অবিলম্বে নিশীথ বাবু তাহাকে অভ্যর্থনা করিতে আসিলেন। তিনি বলিলেন “আসুন আসুন, আপনাকে দেখে আমার দেহে প্রাণ ফিরে এল। আর একটু বিলম্ব হইলেই গরীবের চাকরীটি যেত আর কি?

 পুলিন। থাক, আমি বাহিরেই বসি।

 নিশীথ। মহাশয়, তা'হলে আমার কাঁচা মাথাটী এখুনি উড়ে যাবে।

 পুলিন অগত্য উঠিল, উঠিবার সময়ে মনে মনে ভাবিল নিশীথ বাবু বড়ই স্ত্রৈণ, এমন স্ত্রৈণ লোকত সচরাচর দেখা যায় না। সে বাড়ীর ভিতরে গিয়া দেখিল যে অন্দরটিও পরিপাটিরূপে সাজান। সেই সময়ে বলয়কঙ্কণগুঞ্জনে কক্ষটি মাতাইয়া তুলিয়া নিশীথ বাবুর শ্রীমতী প্রবেশ করিলেন। তিনি পুলিনকে দেখিয়া হাসিয়া বলিলেন “লজ্জা কি? ভিতরে এসে বস।” পুলিন কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তাহা দেখিয়া শোভা তাহার হাত ধরিয়া একখানি চেয়ারে বসাইল, পুলিন কলের পুতুলটির মত বসিল। নিশীথ বাবু তাহার অবস্থা দেখিয়া হাসি চাপিয়া রাথিতে না পারিয়া মুখের ভিতরে কাপড় এবং রুমাল গুঁজিতেছিলেন। আহার শেষ করিয়া পুলিন যখন রাত্রিতে গৃহে ফিরিল তখন তাহার অজ্ঞাতসারে তালিকার প্রতি অস্ফুট প্রীতির ভাব আসিয়া তাহার হৃদয় অধিকার করিতেছিল, আর তাহার সঙ্গে সঙ্গে নিশীথ বাবুর প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞার ভাবটিও কমিয়া আসিতেছিল।

8

 শোভা দেবীর তূণে বশীকরণের যে কয়টি অমোঘ অব্যর্থ অস্ত্র ছিল, তাহার মধ্যে তাঁহার রন্ধন বিদ্যাটি অন্যতম। নিশীথ বাবুরা পাটনায় আসিবার পর পুলিনের প্রায় প্রত্যহই তাঁহাদের বাটিতে নিমন্ত্রণ হইত। পুলিন নিমকহারাম নহে। সে সর্ব্বত্র শোভার রন্ধনের প্রশংসা করিয়া বেড়াইত। এইরূপে শোভা ও নিশীথ বাবুর সহিত পুলিনের ঘনিষ্ঠত বাড়িয়া গেল। কিছুদিন পরে শোভা যখন প্রস্তাব করিল যে, পুলিন বাসা উঠাইয়া দিয়া তাহাদিগের সহিত আসিয়া থাকুক, তখন কৃতজ্ঞ লবণভোজী পুলিন, নিশীথ বাবুর শ্রীমতীর আদেশ, অগ্রাহ্য করিতে পারিল না। পাটনার পাচকের হাত হইতে পরিত্রাণ পাইয়া পুলিন বাঁচিয়া গেল, অল্প দিনের মধ্যে তাহার শ্রী ফিরিয়া গেল, রুক্ষ স্বভাব অনেকটা কোমল হইয়া আসিল।

 একদিন প্রভাতে শোভা পুলিনকে বলল “ওগে গাঙ্গুলী মশাই, নূতন খবরটা গুনেছ? দেশ থেকে আমার খুড়িমা আর আমার একটি বোন হাওয়া খেতে পাটনায় আসছে। বাড়ীটা এতদিন খালি খালি ঠেকতো; এইবারে গুল্‌জার হবে।” পুলিন অপ্রস্তুত হইয়া বলিয়া উঠিল “এইবারে তা হলে আমি একটা বাসা ঠিক করে নিই? আমি থাকলে তাঁদের অসুবিধা হবে।” শোভা হাসিয়া তহিকে উদ্ধাংশ দিল! সে বলিল “ঘোষাল মশায়ের মত তুমিও কি একটি সঙ্‌ নাকি? তিনিত শ্বাশুড়ী আসছে বলে এখন থেকেই জড় সড় হচ্ছেন।”

 পুলিন। আপনার ভগিনীও ত আসছেন?

 শোভা। এলেই বা, সেত আর তোমার ঘাড়ে পড়বে না, আমার বোন অত লাজুক নয়।

 পুলিন। কেন?

 শোভা। অতশত আমি জানিন ভাই। তবে মোট কথা তোমার এখান থেকে যাওয়া টাওয়া হচ্ছেনা।

 ইহার আর জবাব নাই বুঝিয়া পুলিন মাথাটি নীচু করিয়া কলেজে চলিয়া গেল। দুই তিন দিন পরে বিভা ও বিভার মাতা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পুলিন বিবাহের পরে আর শ্বশুরবাড়ী যায় নাই, সুতরাং পত্নী বা শ্বশ্রূকে চিনিতে পারিল না। বিভার মাতা আসিয়া রান্না ঘরে আশ্রয় লইলেন। অন্য ঘরগুলিতে মাদুরের ম্যাটিং কার্পেট-মোড়া বলিয়া অপবিত্র জ্ঞানে তিনি সে দিক্‌ মাড়াইতেন না। তাঁহারা আসিবার পরে পুলিন দূর হইতে তাঁহাকে একবার প্রণাম করিয়া আসিয়াছিল, তাহার পর আর শ্বশ্রূর সাক্ষাৎ পায় নাই। শোভা বিভার নাম বদলাইয়া দিয়াছিল, অথচ মিল্‌ থাকিবে বলিয়া তাহাকে প্রভা বলিয়া ডাকিত। শোভার তাড়নায় বিভা পুলিনের সম্মুখে বাহির হইত, কিন্তু সে কোন মতেই ঘোমটা ছাড়িল না। বিভা আসিবার পরে পুলিন দেখিত যে তাহার ঘরটি সদা সর্ব্বদা পরিষ্কার থাকে, উচ্ছৃঙ্খল ভাবে ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত পুস্তকের রাশি কে যেন আসিয়া সাজাইয়া দিয়া যায়, তাহার বস্ত্রগুলি মলিন হইলে বদলাইয়া দেয়, কামিজে বা কোর্টে বোতামের অভাব হয় না। পুলিন কিছুই বুঝিতে পারিতন, কিন্তু মনে অশান্তির অভাব অনুভব করিত। ইহা তাহার জীবনে নুতন।

 শোভা সুযোগ পাইলেই বিভাকে পুলিনের নিকট পাঠাইয়া দিত, ইহাতে বিভা যত না সঙ্কুচিত হউক পুলিন তাহা অপেক্ষাও অধিকতর সঙ্কুচিত হইত। ইহা দেখিয়া নিশীথ বাবু বড়ই আনন্দ উপভোগ করিতেন। তিনি বলিতেন “কিহে পুলিন ভায়া আছ কেমন? খুড়িমা এসে কোন অসুবিধা হচ্ছে না’ত?” নিরীহ পুলিন একগাল হাসিয়া উত্তর দিত “কষ্ট কি দাদা, আপনার কাছে রাজার হালে আছি। খুড়িমা এসে ব্যঞ্জনের সংখ্যা দ্বিগুণ বাড়িয়া গেছে।” নিশীথ বাবু হাসিতেন ও মনে মনে বলিতেন শোভার ঔষধ ধরিতেছে।

 পুলিন অধিক পান খাইত না, কিন্তু শোভা তাহাকে কিছুতেই ছাড়িত না। শোভার অনুরোধেই হউক, আর আদেশেই হউক, পুলিনের পান খাওয়া বাড়িয়ছিল। নিশীথ বাবু পানে বড় সুপারী খাইতেন, কিন্তু পুলিনের অধিক সুপারী সহ্য হইত না। বিভা আসিবার পর হইতে শোভা পুলিনের পান সাজিবার ভার তাহার হাতে দিয়াছিল। ক্রমে পুলিনের এমন অভ্যাস হইয়া গেল যে বিভা পান না সাজিলেই তাহার সুপারী লাগিত। পুলিন আর কাহারও হাতে পান খাইত না। শোভাও সকল সময়ে বিভার হাতে পান পাঠাইয়া দিত।

 এইরূপে দুইমাস কাটিয়া গেল। পুলিনের স্বভাব চরিত্র ধীরে ধীরে পরিবর্ত্তিত হইতেছিল, কিন্তু সে তাহা বুঝিতে পারিতে ছিলনা। বিভ আসিয়া ধীরে ধীরে যে তাহার হৃদয় অধিকার করিতে ছিল তাহা সে বুঝিতে পারিত না। সে ভাবিত, এক সময়ে একটা উদ্দাম দুর্দ্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা আসিয়া মানব হৃদয়কে মাতাইয়া তুলে, তাহারই নাম প্রেম। সর্ব্বস্বের সহিত সর্ব্বস্ব বিনিময় না হইলে যে প্রেম অঙ্কুরিত হয় না তাহা সে জানিত না। সে তখনও ভাবিত যে সে আদর্শরূপে জগতের সম্মুখে রহিয়াছে।

 এইভাবে দিন কাটিয়া যাইতে দেখিয়া বিভার মাতা শোভাকে বলিলেন “মা কি করে কি হবে? এত দিন বাড়ী ঘর ছেড়ে এসেছি আর কতদিন বিদেশে থাকব? জামায়ের ত মনের ভাব কিছু বুঝিতে পারা গেল না।” শোভা বলিল “ভয় কি খুড়িমা, আমার অসুধ বেশ ধরেছে,আপনি বিভাকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন না।” বিভা সেখানে বসিয়াছিল, সে ঘোমটা টানিয়া পলাইয়া গেল। তখন বিভার মাতা কহিলেন “দেখ বাছা, আমরা সেকেলে মানুষ, অসুধ বিসুধে বিশ্বাস করি। তুই যখন চিঠি লিখলি যে মাছ জালে পড়েছে, আপনা হতে এসে ধরা দিয়েছে,তখন আমি ভব-ঠাকুর-ঝির কাছে থেকে একটা জড়ি আর একটা ধারণ করিবার অসুধ সঙ্গে নিয়ে এসে ছিলুম। সেই দুটো একবার দিলে হয় না?

 শোভা। সর্ব্বনাশ, খুড়িমা, ও কথা মুখেও এনো না। তোমার কি মনে নেই, মুখুয্যের জামাই ভয়ানক বখাটে ছিল, মুখুয্যে গিন্নি ভব পিসির অসুধ খাইয়ে জামাইবশ করতে গিয়ে জন্মের মত পাগল করে দিয়েছেন। আমি পুলিনকে জড়ি-টড়ি খাওয়াতে পারবনা।

 বিভা-মা। তবে কি হবে মা? মাদুলীটা ধারণ করাতে পারলে ভাল হত।

 শোভা। তোমার জামাইকে একবার জিজ্ঞাসা করি।  শোভা এই বলিয়া বাহিরে উঠিয়া আসিল, দেখিল বিভা বরান্দায় দাঁড়াইয়া আছে। তাহাকে দেখিয়া শোভা হাসিয়া লুটাইয়া পড়িয়া, তাহার পর বিভাকে জিজ্ঞাসা করিল “খুড়িমা কি বল্লেন শুনেছিস?” বিভা বলিল হাঁ, তাহার পরে প্রাণের ব্যাকুলতায় বলিয়া ফেলিল “দিদি, তোমার পায়ে পড়ি, তুমি যেন অসুধ টসুধ খাওয়াইওনা। মাদুলী পরিয়ে কাজ নেই, আমার অদৃষ্ট্রে যা আছে তা হবেই।” শোভা হাসিয়া বলিয়া উঠিল “ইস, এত? কবে থেকে লো?” বিভা চোখ রাঙ্গাইয়া বলিল “যাও—তোমার সকলি ঠাট্টা।”

 শোভা বিভাকে ছাড়িয়া নিশীথ বাবুকে লইয়া পড়িল, খুল্লতাত-পত্নীর। কথা বলিয়া হাসিয়া স্বামীর অঙ্গে লুটাইয়া পড়িল। তাহার বিলম্ব দেখিয়া, বিভার মাতা কি বুঝিয়া, আর কোন দিন সে কথা উত্থাপন করেন নাই। শোভা তাহার পর হইতে একটা রহশ্বয়ের ছুতা পাইয়া গেল, সে কথায় কথায় নিশীথ বাবুকে বলিত “তোমাকে কটা মাদুলী পরিয়ে বশ করেছি বলত?

 পুলিনের মনে হইত যে সে ঘরে এক নহে, কে যেন আসিয়া দূরে দাঁড়াইয়া আছে, সে তাহাকে আহবান করিবে সেই জন্য অপেক্ষা করিতেছে। ঘরের বাহিরে গিয়া দেখিত কেহই নাই, সে বড় আশ্চর্য্য হইয়া যাইত। সে একদিন কলেজ হইতে ফিরিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখিল যে তাহার চেয়ারে বসিয়া কে একজন ঘুমাইয়া আছে। নিকটে গিয়া দেখিল প্রভা (অর্থাৎ বিভা)। দেখিয়াই সে দুই পা পিছাইয়া আসিল, তাহার পিছনে একখানা চেয়ার ছিল, পুলিন তাহাতে বাধিয়া পড়িয়াগেল। পতনের শব্দে বিভার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। সে ব্যস্ত হইয়া উঠিয় দাঁড়াইল, পুলিনকে দেখিয় তাহার মুখ লজ্জায় লাল হইয়া গেল। তাহার হাত হইতে পুলিনের একটা বোতাম বিহীন কামিজ পড়িয়াগেল পুলিন তাহা দেখিল, বিভা লজ্জায় আরও আড়ষ্ট হইয়া গেল। সে পুলিনের ঘরে বসিয়া সেলাই করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িয়া ছিল। পুলিনও লজ্জিত হইয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইল। পড়িয়া গিয়া তাহার বড় লাগিয়াছিল, কিন্তু প্রভার সম্মুখে পড়িয়া গিয়া সে বড় লজ্জিত হইয়াছিল, সেই জন্য উঠিয় পড়িল। অপ্রস্তুত হইয়া দুইজনে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার পর পুলিনের মুখ ফুটিল, সে বলিল “আপনি বসুন, আমার কাজ আছে, আমি বাহিরে যাব।” প্রভা অর্থাৎ বিভা এক হাত ঘোমটা টানিয়া সরিয়া দাঁড়াইল।

 শোভা বিভাকে কত কথা শিখাইয়া দিয়াছিল, সে বলিয়া দিয়াছিল যদি কোনদিন নির্জ্জনে দেখা হয়, তুই কথা কহিস্‌, ঘোমটা টানিয়া যেন পালাস্‌ না। সেও মনে মনে স্থির করিয়া রাখিয়াছিল যে যদি কখনও নির্জনে দেখা হয় তাহা হইলে মন খুলিয়া কথা কহিবে, জিজ্ঞাসা করিবে সেকি অপরাধ করিয়াছে? কিন্তু সে সমস্তই ভুলিয়া গেল, লজ্জা আসিয়া তাহাকে অভিভূত করিয়া ফেলিল, সে নিষিদ্ধ অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিয়া ফেলিল। অনেকদিন পরে চিরকুমার সভার বাঁধা গৎগুলি পুলিনের মনে পড়িতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে তাহার রক্তও গরম হইয়া উঠিতেছিল। সে যেই বাহির হইবার জন্য মুখ ফিরাইল, অমনি দেখিতে পাইল ঘোষাল মহাশয় দুয়ারে দাঁড়াইয়া মন্দ মন্দ হাসিতেছেন। পুলিন লজ্জায় মরমে মরিয়া গেল। ঘোষাল মহাশয় বলিলেন “কি ভায় বি-থুড়ি প্রভার সঙ্গে আলাপ হচ্চে?” বিভা ওরফে প্রভা সরিয়া গিয়া প্রাচীরে মিশিয়া যাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। নিশীথ বাবু বলিতে লাগিলেন “তা বেশ বেশ, প্রভা মেয়েটি যেমন শান্ত তেমনি সুন্দরী, কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনও একটি বর জুটল না? সেই দুঃখেই প্রভা দিন দিন যেন কাল হয়ে যাচ্চে।” পুলিন উত্তর খুঁজিয়া না পাইয়া মাথা চুলকাইতে লাগিল। ঘোষাল মহাশয় অকারণে বেজায় হাসিতে আরম্ভ করিলেন। পুলিন ও বিভা দুইজনে আরও অপ্রস্তুত হইয়া গেল। এমন সময়ে শোভা আসিয়া তাহাদিগকে উদ্ধার করিল। সে পিছন হইতে বলিয়া উঠিল “ঠাকুরটি দেখছি সর্ব্বঘটেই আছেন। বাড়ীতে নিরিবিলি কারুর দুটো কথা কহিবার যে নাই।” নিশীথ বাবু বলিলেন “কি জান, বিবাহিত পুরুষের সহিত অবিবাহিতা যুবতীর গোপনে আলাপ করাটা সকলে ততদূর সঙ্গত মনে করে না। তবে আমার তাহাতে বিশেষ আপত্তি নাই।” প্রভা কুন্দ দন্তে অধর টিপিয়া তাঁহাকে একটি ছোট কিল্ দেখাইল, তখন হাসিতে হাসিতে কাশিতে কাশিতে ঘোষাল মহাশয় রণে ভঙ্গ দিলেন পুলিন ও বিভা পলাইয়া বঁচিল।

(৮)

 এইরূপে বড় সুখেই কিছুদিন কাটা গেল। ইতিমধ্যে সংবাদ আসিল, যে শোভার ছোট ভগিনীর বিবাহ, তাঁহাদিগের সকলকে দেশে ফিরিতে হইবে। শোভা জেদ করিয়া বসিল যে, পুলিন না গেলে সে যাইবে না। ঘোষাল মহাশয় বলিলেন “পুরাতনে কি আর মন উঠে না?” শোভা রাগিয়া একটি কিল্ দেখাইল, পুলিন সেইখানে বসিয়াছিল। সে হাসিয়া বলিল “দ্বন্দ্ব যুদ্ধটা না হয় পরেই করবেন? এখন আমার ছুটীনাই, কি করিয়া দেশে যাইব?”

 শোভা। তাহা আমি জানিনা, কিন্তু তোমাকে যাইতেই হইবে।  পুলিন। যাইতেই যখন হইবে তখন আর উপায় কি?

 ঘোষাল। সুন্দর মুখেই সর্ব্বত্রই জয়।

 শোভা তাহাকে পুনরায় একটি কিল্‌ দেখাইল। স্থির হইয়াগেল যে ছুটী না পাইলেও পুলিনকে ছুটী লইতে হইবে। যথাসময়ে যাত্রা করিয়া সকলেই দেশে আসিলেন, যাত্রার পূর্ব্বে পুলিন দেখিল যে কে তাহার কাপড়চোপড়গুলি ট্রঙ্কে ও ব্যাগে গুছাইয়া রাখিয়াছে, দেখিয়াই সে বড় আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া গেল।

 শ্বশুরালয়ে আসিয়া প্রতিজ্ঞা-ভঙ্গের ভয়ে পুলিন ছট্‌ ফট্‌ করিয়া বেড়াইতে লাগিল। সে প্রথমদিন জেদ ধরিল যে সে অন্দরমহলে শয়ন করিবেন, কিন্তু শোভার হাত এড়াইতে পারিল না। অপরাহ্লে অন্দরমহলে একখানি পুরাতন ফটোগ্রাফ দেখিয়া তাহার মন বড় খারাপ হইয়া গেল। ফটোগ্রাফখানি তাহার ও বিভার, বিবাহের সময় তোলা। বিভাকে তাহার কিছুমাত্র মনে ছিল না, কিন্তু সে ছবির সহিত প্রভার সাদৃশ্য দেখিয়া তাহার মন খারাপ হইয়া গেল। সে শুনিয়াছিল যে বিভার বিবাহ হয় নাই, কিন্তু পাটনায় প্রভার মাথায় দুই একদিন সিঁদুরের দাগ দেখিয়াছিল। জিজ্ঞাসা করায় ঘোষাল মহাশয় বলিয়াছিলেন যে তাহাদের দেশে আইবুড় মেয়ের অল্প সিঁদুর পরিয়া থাকে, বিবাহ হইলে চওড়া করিয়া সিঁদূর পরে। মনে মনে এইসব কথা তোলাপাড়া করিয়া পুলিনের বড় সন্দেহ হইল, সে ভাবিল যে হয়ত তাহার ব্রতভঙ্গ করিবার জন্য একটা চক্রান্ত হইয়াছে। সেই জন্যই শোভা তাহাকে ভুলাইয়া পাটনা হইতে লইয়া আসিয়াছে। তাহার মনে কেমন সন্দেহ হইল, সে বলিয়া পাঠাইল যে, তাহার শরীর ভাল নহে, সে কালই পাটনায় ফিরিবে।  এই সংবাদ শুনিয়া শোভা ভয় পাইল, সে ভাবিল, শিকার বুঝি বা হাত ছাড়িয়া পালায়। তখন শোভা তাহার তূণ হইতে মৃত্যুবাণটি টানিয়া বাহির করিল। সে তখন হইতে বিভাকে শিখাইতে বসিল, অনেক চেষ্টার পরে তাহাকে পাখীর মত পড়াইয়া সাজাইয়া গোজাইয়া নিশ্চিন্ত হইল। রাত্রিতে আহারের সময় পুলিন বিস্মিত হইয়া দেখিল যে সেখানে আর কেহই নাই, কেবল সুসজ্জিত হইয়া প্রভা দাঁড়াইয়া আছে। তাহাকে দেখিয়া পুলিন স্থির হইয়া দাঁড়াইল। ব্যাপারটা তাহার কেমন ভাল ঠেকিতেছিল না, সে জিজ্ঞাসা করিল “ঘোষাল মশাই কোথায়? প্রভা কোন উত্তর না দিয়া নখ খুঁটিতে লাগিল। উত্তর না পাইয়া পুলিন অস্থির হইয়া পড়িল, তাহার মন তাহাকে বাহিরে লইয়া যাইতে চাহিতেছিল, বলিতেছিল এখানে তোমার বড় বিপদ, তুমি এখানে থাকিওনা, ইহার তোমার ব্রত ভঙ্গ করবে। আবার কাহার, অব্যক্ত হৃদয় বেদনা, কাহার অস্ফুট করুণ ক্রন্দন আসিয়া যেন তাহার পায় জড়াইয়া ধরিতেছিল, বলিতেছিল তুমি যখন আসিয়াছ তখন আর যাইতে পাইবেনা, তুমি ছাড়া এজগতে আর আমার বলিতে কেহ নাই।

 বিক্ষুব্ধ চিত্তকে শান্ত করিয়া পুলিন পলায়ন করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইল, মুখ ফুটিয়া বলিয়া ফেলিল “আমি বাহিরে যাই।” তখন হঠাৎ প্রভা তাহার হাত ধরিয়া ফেলিল, বলিল “না।” বিস্মিত হইয়া পুলিন জিজ্ঞাসা করিল “কেন প্রভা?” প্রভা অঞ্চলে মুখ লুকাইয়া বলিল “আমি প্রভা নই, আমি বি-বি-বিভা।” সে টলিতেছিল, পুলিন তাহাকে ধরিয়া ফেলিল, সে না ধরিলে বিভা বোধহয় পড়িয়া যাইত। পুলিন তাহাকে বক্ষে টানিয়া লইল, বিভা তাহার বুকে মুখ লুকাইয় কাঁদিতে লাগিল।

 বাহির হইতে দুয়ারের শিকল টানিয়া দিয়া শোভা বলিল “দূর পোড়ারমুখী, এত করিয়া বশীকরণের মন্ত্র শিখাইলাম,পড়াইলাম, সব ভুলেগেলি? তা হোক কাজ হইলেই হ’ল। এখন পাখীটাকে খাঁচায় তোল।”