গুচ্ছ/সােণার বালা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন


সোণার বালা।



 মেয়েটি বড় সুন্দরী। ছোট খাট বেঁটে গড়ন, মাথায় একরাশি কালো কালো কোঁকড়া চুল, চাঁপার কলির মত বর্ণ, তাই মায়ে আদর করিয়া নাম রাখিয়াছিল নিরুপমা। নিরূপমার বয়স যখন আট বৎসর, তখন হইতে তাহার মা মেয়ের বিবাহের জন্য বড়ই ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। হিন্দুর ঘরের, ব্রাহ্মণের ঘরের বিশেষত: গৃহস্থের ঘরের মেয়ে বেশীদিন আইবুড়া রাখা উচিত নয়, এই ভাবিয়া নিরুপমার মা তাঁহার স্বামীকে বড়ই ব্যস্ত করিয়া তুলিতেন। নিরুপমার পিতা এক একদিন রাগ করিয়া বলিতেন “হ্যাঁগা, তোমার হয়েছে কি? তুমি দেখ্‌ছি মেয়েটাকে বাড়ীথেকে বিদার কর্‌তে পারলেই বাঁচ।” নিরুর মাতা অপ্রস্তুত হইয়া বলিতেন “আমি কি তাই বলছি? তবে হিন্দুর ঘরের মেয়ে বিশেষতঃ আমাদের গরীবের ঘরের, আর কতদিন আইবুড়ো রাখবো। তার উপর তোমার যে গতর, এখন থেকে খুঁজতে আরম্ভ করলে তবে যদি কালে বিয়ে হয়। নিরু আমার শ্বশুরঘরে গেলে আমার দিন কি ভাবে কাটবে তা ভগবানই জানেন।” ফলে কোন কাজই হইত না, নিরুর পিতা কন্যার বিবাহ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকিতেন। নিরু বাপমার একমাত্র সন্তান, আঁধারঘরের মাণিক, পিতৃগৃহ আলো করিয়াই রছিল। নিরুর মাতা সাধুসন্ন্যাসী দেখিলেই মেয়ের হাত দেখাইতেন, আর বলিতেন “মেয়েটি কেমনঘরে পড়বে বল্‌তে পার বাবা?” যে যেমন পূজা পাইত, সে ঠিক সেই ওজনে ভবিষ্যৎ-বাণী করিয়া যাইত; কেহ বলিত, তোমার মেয়ে রাজরাণী হইবে; আবার কেহব বলিত, তোমার মেয়ে সুখে থাকিবে।

 দেখিতে দেখিতে নিরু বারবছরে পড়িল, তখন তাহার মা পাগলের মত হইয়া উঠিলেন। চারিদিক হইতে ঘটক আসিতে লাগিল, কিন্তু কোন সম্বন্ধই নিরুর পিতার পছন্দ হইলনা। নিরুর মাতা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি উত্তর করিতেন “মেয়ের বরাতে যা আছে তা হবেই, আমি কি করবো বল?” অনেকদিন পরে জগৎপুরের রাজবাড়ী হইতে নিরুর সম্বন্ধ আসিল, পাত্রপক্ষ কন্যা পছন্দ করিয়া গেল, নিরুর পিতারও বর পছন্দ হইল। মেয়ে রাজরাণী হইবে ইহাতে কোন্‌ পিতার আপত্তি থাকে। নিরুর মাতার ইহাতে বিশেষ আপত্তি থাকিলেও তিনি মেয়ের অকল্যাণের ভয়ে প্রকাশ্যে কোন কথা বলেন নাই। তাঁহার ইচ্ছাছিল যে, সমানঘরে মেয়ের বিবাহ হয়, কারণ তাহা হইলে নিরু কখন কখনও বাপের বাড়ী আসিয়া থাকিতে পরিবে, মেয়েজামাই লইয়া সাধ আহলাদ করিতে পাইবেন। তাই একদিন মুখ ফুটিয়া স্বামীকে বলিয়া ফেলিয়াছিলেন “দেখ, রাজবাড়ীতে নিরুর বিয়ে হলে সময় অসময় আন্‌তে পারব না, হয়ত মরবার সময় একবার চোখেও দেখতে পাব না।” নিরুর পিতা উত্তর করিলেন “এই জন্যই বলে বারহাত কাপড়ে মেয়েমানুষের কাছা নাই। নিরু যদি রাজরাণী হয় তাহলে কি তোমার মরণের সময় রক্ষা থাক্‌বে। জগৎপুর শুদ্ধ তোমার এই বাড়ীর উঠানে এসে বস্‌বে।”  মেয়ের মার কোন আপত্তিই টিকিল না, মহা ধূমধামে নিরুর বিবাহ হইয়াগেল, নিরু শ্বশুরালয়ে চলিয়াগেল। বউ বড় হইয়াছে; বাপের বাড়ী থাকিলে ছেলের ঘরে মন বসিবে না, এই অছিলা করিয়া নিরুর শ্বাশুড়ী দ্বিরাগমনের পরে তাহাকে আর পিত্রালয়ে যাইতে দিলেন না। নিরুর পিতা দুই একবার লইয়া যাইতে আসিয়াছিলেন কিন্তু বৈবাহিকার নিকট কটুকথা শুনিয়া ভগ্নহৃদয়ে গৃহে ফিরিয়াছিলেন। তাঁহার বৈবাহিক বলিতেন যে “জগৎপুরের রাজবাড়ীর বধূকে কেহ কখনও পিত্রালয়ে যাইতে দেখে নাই।” যৌবনোদগমে নিরুপমার বিবাহ হইয়াছিল, বিবাহের জল গায়ে লাগিয়া পূর্ণবিকশিত চম্পক কলিকার ন্যায় তাহার রূপ ফুটিয়া উঠিল। কিন্তু তাহার অনিন্দ্যসুন্দরকান্তি যাহার অধিকারে আসিয়াছিল, সে তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিত না। শ্বশুর-শ্বাশুড়ী যতদিন বাঁচিয়া ছিলেন, ততদিন নিরুপমা বিশেষ কোনও অভাব বুঝিতে পারেনাই। স্বামীকে সে বড় ভয় করিত,সুতরাং তাঁহার নিকটে যাইতনা। শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর সেবা করিয়া তাহার দিন কাটিত। শ্বাশুড়ী সময়ে সময়ে দুঃখ করিয়া বলিতেন “পোড়াকপালীর রূপ যেন উছলিয়া পড়িতেছে। আহা আর জন্মে কি পাপ করিয়াছিল যে তাহার ফলে ছেলের মনের মত হইল না।” নিরুপমা সে সব বড় বুঝিতন, কেবল পিত্রালয়ে যাইবার জন্য তাহার প্রাণ মধ্যে মধ্যে ব্যাকুল হইয়া উঠিত।

 জগৎ পুরের রাজপুত্রের নাম শ্যামাদাস। তিনি বাল্যকাল হইতে শিক্ষার জন্য কলিকাতায় থাকিতেন, ছুটির সময় বাড়ীতে আসিতেন। কুমার শ্যামাদাস উচ্চশিক্ষিত। ধনী সন্তানের সচরাচর যাহা হয়না, কুমারের তাহাই হইয়াছিল, তিনি সুশিক্ষিত হইয়াছিলেন। স্কুলে কলেজে শিক্ষা শেষ হইলেও তিনি লেখাপড়ার চর্চ্চা পরিত্যাগ করেন নাই এবং সেই ওজর করিয়া তিনি বাড়ীতে থাকিতে চাহিতেন না। তাঁহার পিতা মাতা বহু চেষ্টা করিয়াও তাঁহাকে গৃহে রাখিতে পারেন নাই। পুত্রের চরিত্র দোষ ছিলনা বলিয়া পিতা পুত্রের কলিকাতায় থাকা সম্বন্ধে বিশেষ আপত্তি করিতেন না,তিনি ভাবিয়াছিলেন কালে সমস্তই ঠিক হইয়া যাইবে। কিন্তু তাহার বহুপূর্ব্বেই কালপ্রাপ্ত দেখিয়া কাল আসিয়া তাঁহাদিগকে লইয়া গেল। শ্বশুর মরিলেও নিরুপমা বিশেষ অভাব বোধ করে নাই, কিন্তু শ্বাশুড়ী মরিলে সে অকূল পাথরে পড়িল, কারণ সে তখন বৃহৎ রাজসংসারের কর্ত্রী হইয়া উঠিল, তখন সে দেখিল যে তাহার বিষম বিপদ। যাঁহার বিষয় যাঁহার সম্পত্তি, তিনি কলিকাতায় থাকেন, দেশে সকলে তাহারই মুখাপেক্ষী হইয়া থাকে। দেবতার সেবা, ক্রিয়াকর্ম্ম সকল বিষয়ে, সকলেই তাহার হুকুম লইতে আসে। সে মহাবিপদে পড়িয়া যায়। ভিক্ষুক আসিয়া ভিক্ষ চায়, কন্যাদায়গ্রস্ত ব্রাহ্মণ আসিয়া সাহায্য প্রার্থনা করে, দেওয়ান আসিয়া বলে “মহারাণীর কি হুকুম?” নিরুপমা ভাবে আমি কে? ইহারা আমাকে কেন জ্বালাতন করিতে আসে? উত্তর না পাইয়া দেওয়ান ফিরিয়া যাইত; ভিখারী, আর্ত্ত, দরিদ্র বিফল হইয়া চলিয়া যাইত নিরুপমা কোন কথাই বলে না।

 যাঁহার ঘর বাড়ী, যাঁহার বিষয় সম্পত্তি, তিনি চাহিয়াও দেখেন না। নিরুপমা ভাবিয়া কুল পাইল না। গতিক সুবিধা নয় দেখিয়া পুরাতন দেওয়ান অবসর চাহিল। রাজা কলিকাতা হইতে টাকা চাহিয়া পাঠাইলে দেওয়ান জবাব দিল; বলিয়া পাঠাইল, সে বৃদ্ধ হইয়াছে, কার্য্যে অক্ষম। তখন বাধ্য হইয়া নিরুপমার স্বামীকে দেশে ফিরিতে হইল, স্বামী আসিলে সে তাঁহার দেখা পাইল না। তবে শ্বাশুড়ী থাকিতে তাহাকে বাধ্য হইয়া প্রসাধন করিতে হইত, এবারে তাহাও হইল না।

 রাজা দেশে ফিরিয়া সকলকে কলিকাতায় লইয়া যাইতে প্রস্তুত হইলেন। দাসী আসিয়া নিরুপমাকে বলিয়া গেল, “মহারাণী, মহারাজের হুকুম হইয়াছে সকলকে কলিকাতায় যাইতে হইবে।” নিরুপমা উত্তর করিল “মহারাজকে গিয়া বল আমি যাইতে পারিব না। আমি গেলে দেবসেবা হইবে না।” নিরুপমা স্বামীকে বড়ই ভয় করিত, তথাপি সাহস করিয়া এত বড় একটা কথা বলিয়া ফেলিল। দাসী উত্তর গুনিয়া চমকাইয়া গেল, কিন্তু সে কি করিবে, সেই উত্তর লইয়াই ফিরিল। মরণ সময়ে নিরুপমার শ্বাশুড়ী বলিয়া গিয়াছিলেন “মা, আমিত চলিলাম। শ্যামাদাসের ভাবগতিক দেখিয়া আমার বড়ই ভয় হইতেছে, বরাতে ভগবান যে কি লিখিয়াছেন তাহা বলিতে পারি না। যতদিন বাঁচিয়া থাকিবে, ততদিন কখনও গোপালের সেবা ভুলিও না। গোপাল অবশ্যই একদিন। মুখ তুলিয়। চাহিবেন।” গোপাল জগৎপুর রাজবংশের গৃহ-দেবতা। নিরুপমা জানিত শ্বাশুড়ীর চাইতে আপনার তাহার আর কেহই নাই, সেই জন্যই সে বলিয়াছিল, সে কলিকাতায় যাইবে না। কিন্তু তাহার সে আপত্তি টিকিলনা, রাজা বলিয়া পাঠাইলেন যে গোপারও কলিকাতায় বাইবেন। নিরুপমা আর কোনও উত্তর করিলন, কলিকাতায় যাওয়াই স্থির হইল। দাসদাসীআত্মীয়াগণ জিনিষ পত্র গুছাইয়া কলিকাতা স্বাত্রা করিলেন।

 কলিকাতায় জগৎপুরের রাজা প্রকাও বাড়ী করিয়াছেন, তিন মহল বাড়ী, সদর বাড়ীতে রাজা বাস করেন, দ্বিতীয় মহলে ঠাকুর বাড়ী, অন্দর মহলে নিরুপমা থাকে। রাজা কখনও অন্তঃপুরে প্রবেশ করেন না, কিন্তু দেবসেবা বা অন্দর-মহলের কোন ব্যবস্থার অভাব নাই। প্রত্যেক মহলের জন্য স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত আছে, স্বতন্ত্র কর্ম্মচারী নিযুক্ত আছে, তাহার নিরুপমার আদেশে দেবসেবা ও অন্দরমহলের কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া থাকে। নিরুপমা হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, এতদিনে সে নিশ্চিন্ত হইল।

 বহুদিন মেয়েটিকে না দেখিয়া নিরুপমার মাতা বড়ই অস্থির হইয়া উঠিলেন। তিনি ভাবিয়াছিলেন যে জামাই এখন রাজা হইয়াছে, মেয়ে এখন সর্ব্বময়ী কর্ত্রী, এখন চেষ্টা করিলেই মেয়েটিকে দেখিতে পাইবেন। কিন্তু তিনি অনেক সাধ্যসাধনা করিয়া ও স্বামীকে কলিকাতায় পাঠাইতে পারলেন না। অবশেষে তাহার কাঁদাকাটিতে জ্বালাতন হইয়া নিরুপমার পিতা চূড়ামণি যোগে পত্নীকে লইয়া গঙ্গাস্নান করিতে কলিকাতায় যাইতে সন্মত হইলেন। কলিকাতায় আসিয়া, একবার কন্যার সহিত সাক্ষাং করিবার জন্য উভয়েই বড় ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন। অনেক বাক্ বিতণ্ডার পরে স্থির করিলেন যে নিরুপমার বাড়ীতে গিয়া তাহাকে দেখিয়া আসাই ভাল।

 একদিন অপরাহে একখানি ভাড়াটিয়া গাড়ী কলিকাতায় জগৎপুরের রাজবাড়ীর ফটকে প্রবেশ করিল, গাড়ীতে স্ত্রীলোক দেখিয়া সদর বাড়ীর লোকে গাড়ী অন্দরে পাঠাইয়া দিল, নিরুপমার পিতা সদরে বসিয়া রছিলেন। নিরুপমার মাতা গাড়ী হইতে নামিয়া লোকজন দেখিতে না পাইয়া বড়ই আশ্চর্য্য হইলেন। অনেকক্ষণ পরে একজন দাসী আসিয়া তাহাকে দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কোথা থেকে আসছ'গা? নিরুপমার মাতা গ্রামের নাম করিবামাত্র সে বলিয়া উঠিল “তবে বুঝি তুমি রাণীমার বাপের বাড়ী থেকে আসছ? আহা!” আশঙ্কায় মাতার হৃদয় আকুল হইয়া উঠিল, তিনি ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “তোমাদের রাণীমা ভাল আছে ত?”

 দাসী। তাঁরত ভাল মন্দ সবই সমান। আহা, এমন লোকেরও এমন হয়।

 মাতা। কেন গো, কি হয়েছে?

 দাসী। তোমরা কি রাণীমার কোন খোঁজই রাখ না?

 মাতা। তুমি একবার আমাকে তার কাছে নিয়ে চল।

 দাসী অগ্রসর হইয়া চলিল, নিরুপমার মাতা অন্দরমহলে নিরুপমার দেখা পাইলেন না, ঠাকুর বাড়ীতে গিয়া দেখিলেন, নিরুপমা একখানি মোটা তসরের সাড়ী পরিয়া গোপালের ভোগ রাঁধিতেছে, সোনার কর্ণ মলিন হইয়া গিয়াছে, তৈলাভাবে রুক্ষ কেশরাশি বাতাসে উড়িয়া বেড়াইতেছে। কন্যার আকৃতি দেখিয়া মাতার নয়নে জল আসিল। তিনি দূরে দাঁড়াইয়া ডাকিলন “নিরু!” বহুদিন পরে পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনিয়া নিরুপমা চমকাইয়া উঠিল, হাঁড়ী নামাইয়া বাহির হইয়া আসিল, একবার “মা” বলিয়া ডাকিয়া মাতার কণ্ঠলগ্ন হইল। দশবৎসর পরে মাতা-পুত্রীর মিলন হইল, অশ্রুজলে উভয়ের গণ্ডস্থল ভাসিয়া গেল, মাত কাঁদিলেন কন্যার অবস্থা দেখিয়া, কন্যা কাঁদিল মাতাকে দেখিয়া আনন্দে। মা কেন কাঁদিতেছেন নিরুপমা তাহা বুঝিতে পারিলন, সে ভাবিল যে তাহার মাতাও আনন্দে কাঁদিতেছেন। মাতা ভাবিয়াছিলেন কন্যা রাজরাজেশ্বরী হইয়াছে, তাহার ঐশ্বর্য্য দেখিয়া নয়ন সার্থক করিবেন। কিন্তু নিরাভরণা বেদনাক্লিষ্ট কন্যাকে দেখিয়া তাঁহার উল্লাস দুঃখে পরিণত হইল। অনেকক্ষণ কাঁদিয়া উভয়ে শান্তি লাভ করিলেন। দেবসেবা শেষ হইল, নিরুপমা প্রসাদ লইয়া আহারে বসিল। সামান্য দাসীর ন্যায় সামান্য পাত্রে, অন্যান্য মহিলাগণের সহিত কন্যাকে আহার করিতে দেখিয়া মাতার নয়ন আবার জলে ভরিয়া আসিল, কিন্তু কন্যা মনে ব্যথা পাইবে বলিয়া মনের কথা প্রকাশ করিলেন না।

 আহার করিয়া মাতাকে লইয়া নিরুপমা অন্দরমহলে ফিরিল। মাতা দেখিলেন যে অন্দরমহলে বহুমূল্য সাজসজ্জার কোনই অভাব নাই। নিরুপমা শয়ন-কক্ষের বাহিরে একখানি মাদুর পাতিয়া বসিল, তাহার মাতা ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিলেন যে সুসজ্জিত বহুমূল্য আসবাবে শয়ন কক্ষটি পরিপূর্ণ, কিন্তু কেহ যেন তাহা ব্যবহার করে না। নিরুপমা মাদুরের উপরে আঁচল বিছাইয়া গুইয়া পড়িল। একজন দাসী তাঁহাকে বাতাস দিতে আসিল, সে তাহার হাত হইতে পাখ কাড়িয়া লইয়া তাহাকে তাড়াইয়া দিল, তাহা দেখিয়া তাহার মাতার হৃদয় আরও আকুল হইয়া উঠিল। রাণীমায় মা আসিয়াছেন শুনিয়া অন্দর মহলের সকলেই তাঁহার সহিত দেখা করিতে আসিল। নিরুপমার মাতা তাহাদিগের নিকট একটি একটি করিয়া সকল কথা শুনিতে পাইলেন। এমন ভুবনমোহিনী রূপের দিকে রাজা কখনও চাহিয়াও দেখেন না, পথ ভুলিয়াও কখন অন্দরমহলে আসেন না, পত্নীকে কখনও একটি মিষ্ট কথাও বলেন না। এই সকল কথা শুনিয়া, নিরুপমার মাতা পাগল হইয়া উঠিলেন। কন্যার গৃহ তাঁহার বিষবৎ বোধ হইতেছিল তিনি নিরুপমার নিকট বিদায় লইয়া গৃহে ফিরিলেন। আসিবার সময় কন্যা মাতার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল “মা আবার আসিও, মাতাও কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন “আসিব বই কি মা, আবার আসিব।”  প্রথমে রাজা শ্যামাদাসের চরিত্রদোষ ছিলন, কিন্তু কুসংসর্গে পড়িয়া রাজা ক্রমশঃ চরিত্রহীন হইলেন, সে কথা নিরুপমার কর্ণে পৌঁছিতে বাকি রহিলনা। স্বামী কাহাকে বলে তাহা সে জানিতনা, স্বামীকে সে চিনিতে পারে নাই, তথাপি সে হৃদয়ে বেদন বোধ করিল। বড় হইয়া সংসারের কথা সে কতকটা বুঝিয়াছিল, তাহার প্রাপ্য হইতে যে সে বঞ্চিত হইয়াছে সে তাহা বুঝিয়াছিল। চারিদিকে সুখদুঃখ মিশ্রিত সংসারে কত শত শত ভাগ্যবতী স্বামীপুত্র লইয়া ঘর করিতেছে, তাহা দেখিয়া অজ্ঞাত আকাঙ্ক্ষায় তাহার হৃদয় আকুল হইয়া উঠিত, অপরিসীম যন্ত্রণায় তাহার ক্ষুদ্র নারীহৃদয় ফাটিয়া যাইত বটে, কিন্তু তাহার মুখ ফুটিত না। উপায় নাই দেখিয়া সে গোপালের সেবায় জীবন উৎসর্গ করিয়াছিল। সে ভাবিয়া লইল যে গোপাল তাহার পুত্র, তাই সে গোপালের বেশভূষায়, সাজসজ্জায় ও সেবায় দিন কাটাইয়া দিত। অন্দরমহলের ঐশ্বর্য্য তাহার অসহ্য বোধ হইত; তাই সে সমস্ত দিন ঠাকুর-বাড়ীতে কাটাইয়া দিত। রাত্রিতে তাহার সুসজ্জিত শয়ন-কক্ষের এককোণে একখানি মাদুর বা কম্বল পাতিয়া পড়িয়া থাকিত। তথাপি তাহার শয়ন-কক্ষ সর্ব্বদা সুসজ্জিত থাকিত, শয্যা কোনও দিন অপরিষ্কৃত থাকিলে দাসীগণ তিরস্কৃত হইত। একদিন কে তাহকে বলিয়ছিল যে রাজা বড় গোলাপ ফুল ভালবাসেন, তাহার পর হইতে বারমাস স্বগন্ধী বহুমূল্য গোলাপ ফুলে তাহার ঘরগুলি সাজান থাকত, সে যেন সর্ব্বদাই কক্ষের অধিষ্ঠাতৃ-দেবতার আগমনের অপেক্ষা করিত। তাহার রাশি রাশি বহুমূল্য অলঙ্কার ছিল, তাহা সে কখনও পরিতনা, দুহাতে দুগাছি সোণার বালা পরিয়া দিন কাটাইয়া দিত।  পাপের স্রোত বড় দ্রুত, তাহাতে গা ঢালিয়া দিলে আর গতিরোধ হয় না। পূর্ব্বে রাজসংসারে অর্থের অভাব ছিলনা, কিন্তু ক্রমশঃ তাহাও হইল, একে একে সমস্ত জমিদারীগুলি বন্ধক পড়িল। অবশেষে বিক্রয় হইয়া গেল। মধুর অভাব হইলে মধুমক্ষিকা থাকে না, শ্যামাদাসের অর্থাভাব দেখিয়া বন্ধুবান্ধব তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া গেল। যাহার চিরকাল জগৎপুরে রাজসংসারে প্রতিপালিত হইয়াছিল, তাহারাও ক্রমশঃ ছাড়িয়া গেল। নিরুপমা ক্রমশঃ একা পড়িল। একদিন শ্যামাদাসের মনে পড়িল যে,নিরুপমার বহুমূল্য অলঙ্কার আছে। রাজা ধীরে ধীরে অন্দরমহলে প্রবেশ করিলেন, যে দুই একজন দাসদাসী ছিল তাহারা আশ্চর্ঘ্য হইয়া গেল। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন “রাণী কোথায়?” একজন দাসী তাহাকে নিরুপমার শয়ন কক্ষ দেখাইয়া দিল, সে তখন গৃহের এক কোণে মাদুরের উপরে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। দাসী তাঁহাকে ডাকিয়া দিতে গেল, কিন্তু রাজা তাহাকে নিষেধ করিলেন, দাসী পলাইল। কক্ষে খাটের উপর বসিয়া রাজা ডাকিলেন “নিরুপমা,” জীবনে তাঁহার এই প্রথম পত্নী-সম্ভাষণ। ডাক শুনিয়া নিরুপমা তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল। উঠিয়াই স্বামীকে দেখিতে পাইল এবং এক হাত ঘোমটা টানিয়া কোণে গিয়া দাঁড়াইল। রাজা আবার ডাকিলেন “নিরুপমা?” নিরুপমা উত্তর দিলনা। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া রাজা বললেন “দেখ, বড়ই টাকার দরকার পড়েছে। তোমার গহনাগুলা একবার দিতে পার? আমি দিন কতক পরে আবার ফিরিয়ে দিব।” ঘোমটার ভিতরে বার কতক ঢোক গিলিয়া নিরুপমা বলিল “সে আর এখন আমার নেই। সে সব গোপালকে দিয়ে দিয়েছি।” রাজা তাহা শুনিয়া হতাশ হইয়া দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন, আবার জিজ্ঞাসা করিলেন “তোমার হাতে কি এখন কিছুই নেই?” নিরুপমা স্বামীর প্রশ্ন বুঝিতে ন পারিয়া ভাবিল স্বামী তাহার হাতের দুই গাছ সোণার বালা চাহিতেছেন। সে বলিল “তোমার যদি বড় দরকার হয়ত আমার হাতে দু-এক গাছা যা আছে নিয়ে যাও।” রাজা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন, তিনি বলিলেন “কই দাও?” নিরুপমা বলিল “মার কাছে শুনেছি এয়োস্ত্রীর হাত খালি করতে নাই। তুমি আমার হাতে দুগাছি সূতা বেঁধে দাও, আমি খুলে দিচ্চি।” কোথা হইতে একটু লাল সূতা লইয়া নিরুপমা স্বামীর নিকটে সরিয়া গেল, রাজা তাহার হাত দুইখানি লইয়া তাহাতে সূতা বাঁধিয়া দিলেন, নিরুপমা নীরবে বালা দুই গাছি খুলির স্বামীর হাতে দিল। রাজা বাহিরে চলিয়া গেলেন, নিরুপমা মেঝেয় লুটাইয়া পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল।

 সদরে যাইতে যাইতে রাজা বালা গাছি দেখিতে লাগিলেন। তিনি নিরুপমার বহুমূল্য অলঙ্কারের লোভে আসিয়াছিলেন; তাহা না পাইয়া তাঁহার একটু রাগও হইয়াছিল; কিন্তু নিরুপমা যে ভাবে বালা দুই গাছি খুলিয়া দিল তাহা দেখিয়া তিনি স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিলেন। যাইতে যাইতে ভাবিলেন, সামান্য গাছি সোণার বালা, তাহাতে তাঁহার কতক্ষণের খরচ চলিবে? হঠাৎ মস্তিষ্কের কোন নিভৃত কোণ হইতে উচ্চশিক্ষার লুক্কায়িত প্রভাব আসিয়া রাজার হৃদয় আচ্ছন্ন করিল। তিনি ভাবিলেন, আমি জগৎপুরের রাজা, সুশিক্ষিত, মূর্খ নহি। আমি কি করিতেছি? পিতৃকুলের যথাসর্ব্বস্ব উড়াইয়া দিয়া, যে স্ত্রীর কখনও মুখ দর্শন করি নাই, শেষে তাহার হস্তের অলঙ্কার লইয়া নিজের দুষ্প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিতে যাইতেছি। রাজা দাঁড়াইলেন, আর সদরে যাওয়া হইলনা। অন্দরে ফিরিলেন, দেখিলেন নিরাভরণা দেবী মূর্ত্তি লুটাইয়া লুটাইয়া কাঁদিতেছে। আকুল কণ্ঠে রাজা ডাকিলেন “নিরুপমা? নিরুপমা মুখ তুলিল, দেখিল দুয়ারে স্বামী দাঁড়াইয়া আছেন। কাঁদিয়া কাঁদিয়া তাহার চোখ দুটি ফুলিয়া উঠিয়াছে, রুক্ষকেশ চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, সে স্থির নেত্রে স্বামীর দিকে চাহিল। সে কেবল এক মুহূর্তের জন্য, তাহার পর সে স্বামীর বাহু পাশে আবদ্ধ হইল, সে ছিন্না ব্রততীর ন্যায় স্বামীর বুকে লুটাইয়া পড়িল।