গৌড়রাজমালা/দানসাগরের রচনাকাল

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

 শ্রীযুত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় “দানসাগরের” এবং “অদ্ভুত সাগরের” রচনাকাল-বিজ্ঞাপক শ্লোক প্রামাণ্য রূপে গৃহীত হইতে পারে না বলিয়া মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহার এরূপ মনে করিবার প্রথম কারণ,—“দানসাগরের” এবং “অদ্ভুতসাগরের” যে সকল পুঁথিতে কাল-বিজ্ঞাপক শ্লোক আছে, তাহা অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে লিপিবদ্ধ হইয়াছে; এবং উহা ছাড়া, এই দুই গ্রন্থের আরও কয়েকখানি প্রতিলিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে এই সকল শ্লোক নাই। সুতরাং, উভয় গ্রন্থের কাল-বিজ্ঞাপক শ্লোক পরবর্ত্তী কালে প্রক্ষিপ্ত হওয়া সম্ভব।

 আর এক হিসাবে দেখিতে গেলে, ঠিক বিপরীত সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে হয়। “দানসাগর” স্মৃতি-নিবন্ধ, এবং “অদ্ভুত সাগর” জ্যোতিষের নিবন্ধ। যাঁহারা স্মৃতি বা জ্যোতিষ শাস্ত্রের অনুশীলন করিতেন, তাঁহারই এই সকল পুস্তকের প্রতিলিপি প্রস্তুত করিতেন বা করাইতেন। স্মৃতি, জ্যোতিষ প্রভৃতি শাস্ত্রের অনুশীলনকারিগণ, গ্রন্থকারের জীবনী সম্বন্ধে বা গ্রন্থের রচনাকাল সম্বন্ধে, চিরকালই উদাসীন। সুতরাং, কোন কোন লিপিকর, অনাবশ্যক বোধে, আদর্শ পুস্তকের কাল-বিজ্ঞাপক বচন পরিত্যাগ করিয়া থাকিতে পারেন। সেই জন্য সকল পুস্তকে এই বচন দৃষ্ট হয় না।

 এসিয়াটিক্ সোসাইটীর পুস্তকালয়ে যে “অমৃত সাগরের” পুঁথি আছে, তাহার মঙ্গলাচরণের সহিত ভাণ্ডারকার-বর্ণিত পুঁথির মঙ্গলাচরণের তুলনা করিলে এইরূপ সিদ্ধান্তই যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হয়। বোম্বাইএর পুঁথির মঙ্গলাচরণের প্রথম নয়টি শ্লোকে, সেনরাজ-বংশ, গ্রন্থকার বল্লালসেন, এবং তাঁহার সহযোগী শ্রীনিবাস প্রশংসিত হইয়াছেন। এসিয়াটিক্ সোসাইটীর পুঁথিতে, এই নয়টি শ্লোকের পাঁচটি মাত্র দৃষ্ট হয়; ২, ৩, ৪ এবং ৬ নং শ্লোক একেবারে পরিত্যক্ত হইয়াছে। বোম্বাইএর পুস্তকে এই নয়টি শ্লোকের পরে, সাতটি শ্লোকে, যে যে মূল গ্রন্থ হইতে “অদ্ভুত সাগরের” বচন-প্রমাণ উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহাদের তালিকা প্রদত্ত হইয়াছে; এবং তৎপরে আর দ্বাদশটি শ্লোকে গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় সংক্ষেপে উক্ত হইয়াছে। এইরূপ তালিকা এবং বিষয়-সূচী অনেক নিবন্ধেই দৃষ্ট হয়। কিন্তু এসিয়াটিক্ সোসাইটীর পুঁথির ভূমিকায় এই ১৯টি শ্লোকের একটিও স্থানলাভ করে নাই। এই সকল শ্লোকও কি তবে প্রক্ষিপ্ত? বিষয়-সূচীর পর, বোম্বাইএর পুঁথিতে নিম্নোক্ত শ্লোক তিনটি আছে—

“शाके ख-नव-खेंद्वब्दे आरेभे द्भुतसागरं।
गौड़ेंद्र-कुंजरालान-स्तंभवाहु र्महीपतिः॥१॥
ग्रंथेस्मिनसमाप्त एव तनयं साम्राज्यरक्षा-महा-
दीक्षापर्वणि दीक्षणाम्निजकृते र्निष्पत्तिमभ्यर्थ्य सः।
नानादान-चितांबु-संचलनतः सूर्य्यात्मजा-संगमं
गंगायां विरचय्य निर्जरपुरं भार्य्यानुयातो गतः॥२॥
श्रीमल्लक्ष्मणसेन-भूपति रतिश्लाघ्यो यदुद्योगतो
निष्पन्नोद्भुतसागरः कृति रसौ वल्लाल-भूमीभुजः।
ख्यातः केवलमग्लुवः (?) सगरज-स्तोमस्य तत् पूरण-
प्रावीण्येन भगीरथ स्तु भुवनेष्वद्यापि विद्योतते॥३॥

 মর্ম্মানুবাদ—রাজা বল্লালসেল ১০৯০ শাকে “অদ্ভুতসাগরের” আরম্ভ করিয়াছিলেন (১)। তিনি এই গ্রন্থ অসমাপ্ত রাখিয়া, এবং তনয়ের উপর সমাপ্ত করিবার ভার অর্পণ করিয়া, স্বৰ্গারোহণ করিয়াছিলেন (২)। লক্ষ্মণসেনের উদ্যোগে “অদ্ভুতসাগর” সমাপ্ত হইয়াছিল (৩)।

 এই তিনটি শ্লোক একত্রে গ্রথিত। ইহার একটি ফেলিয়া, আর একটি রাখিবার উপায় নাই। কিন্তু এসিয়াটিক্ সোসাইটীর পুঁথিতে তাহাই করা হইয়াছে। প্রথম দুটি পরিত্যক্ত এবং তৃতীয়টি মাত্র লিপিবদ্ধ হইয়াছে। এ অবস্থায়, “শাকে খ-নব-খেংদ্বব্দে” ইত্যাদি শ্লোকটিকে প্রক্ষিপ্ত বলা যায় না।

 রাখালবাবুর দ্বিতীয় যুক্তি,—বোধগয়ার দুইখানি শিলালিপির[১] উপসংহারে আছে—

“श्रीमल्लख्वणसेनस्यातीतराज्ये सं ५१ भाद्र दिने २९”
“श्रीमल्लक्ष्मणसेन-देवपादाना-मतीतराज्ये सं ७४ वैशाख्य-वदि १२ गुरौ॥”

 “শ্রীমল্লক্ষ্মণসেনস্যাতীতরাজ্যে সং ৫১”—ইহার অর্থ লক্ষ্মণসেনের রাজ্য লুপ্ত হওয়ার পর হইতে গণিত ৫১ সম্বতে, অথবা লক্ষ্মণসেনের রাজ্যলাভ হইতে গণিত ৫১ সম্বতে, অথচ লক্ষ্মণসেনের রাজ্যলোপের পরে। কিল্‌হর্ণ এক সময় শেষোক্ত অর্থ গ্রহণ করিয়া, সং ৫১ = ১১২০ + ৫১ = ১২৭১ খৃষ্টাব্দ ধরিয়াছিলেন। রাখালবাবু এই অর্থই বজায় রাখিতে যত্ন করিয়াছেন। এখানে শব্দার্থ লইয়া কাট্যাং কুট্যাং না করিয়া, এই মাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এই দুইখানি বোধগয়ার লিপির অক্ষরের, [বিশেষতঃ প এবং দএর,] সহিত গয়ার ১২৩২ সম্বতের (১১৭৫ খৃষ্টাব্দের) গোবিন্দপালদেবের গতরাজ্যের চতুর্দ্দশ সম্বৎসরের শিলা-লিপির,[২] অথবা বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনের[৩] প এবং দ অক্ষরের তুলনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায়,—১২৩২ সম্বতের গয়ার লিপির এবং বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনের প এবং দ পুরাতন নাগরীর ঢঙ্গের; পক্ষান্তরে, আলোচ্য বোধগয়ার লিপিদ্বয়ের প এবং দ বর্ত্তমান বাঙ্গালা প এবং দ এর মত। ঠিক এই প্রকারের প এবং দ চট্টগ্রামে প্রাপ্ত ১১৬৫ শকাব্দের [১২৪৩ খৃষ্টাব্দের] তাম্রশাসনে[৪] দেখিতে পাওয়া যায়। দ্বাদশ শতাব্দের শেষ ভাগে গৌড়-মণ্ডলে পুরাতন নাগরী ঢঙ্গের প, এবং দ’ই যে প্রচলিত ছিল, বল্লভদেবের “শকে নগ-নভো-রুদ্রৈঃ সংখ্যাতে” অর্থাৎ ১১০৭ শকের (১১৮৪-৮৫ খৃষ্টাব্দের) আসামের তাম্রশাসন তাহার সাক্ষ্যদান করিতেছে।[৫] সুতরাং “শ্রীমল্লক্ষ্মণসেনস্যাতীতরাজ্যে সং ৫১” ১১৭১ খৃষ্টাব্দরূপে গ্রহণ না করিয়া, [আনুমানিক ১২০০ খৃষ্টাব্দে লক্ষ্মণসেনের মৃত্যু ধরিয়া,] ১২৫১ খৃষ্টাব্দ বলিয়া গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। এই সিদ্ধান্তের এক আপত্তি আছে। লক্ষ্মণসেনের “অতীতরাজ্য” হইতে কোন সম্বৎ প্রচলিত হইবার প্রমাণ নাই। উত্তরে বলা যাইতে পারে—গোবিন্দপালদেবের “গতরাজ্য” বা “বিনষ্টরাজ্য” হইতেও কোন সম্বৎ প্রচলিত নাই। পক্ষান্তরে গোবিন্দপালদেবের রাজ্যলাভ হইতেও কোন সম্বৎ প্রচলিত হওয়ার প্রমাণ নাই। “গতরাজ্যে” “অতীতরাজ্যে” বা “বিনষ্টরাজ্যে” প্রভৃতি বিশেষণ-পদের এই রূপ অর্থ প্রতিভাত হয়—গোবিন্দপালদেবের রাজ্যলোপের পরে, মগধে অরাজকতা উপস্থিত হইয়াছিল; লক্ষ্মণ-সেনের রাজ্যলোপের পরেও মগধে অরাজকতা উপস্থিত হইয়াছিল। তখন মগধে কেহ “প্রবর্দ্ধমান-বিজয়রাজ্য” প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন না; অথবা যিনি মগধ করায়ত্ত করিয়াছিলেন, মগধবাসিগণ তাঁহাকে তখনও অধিপতি বলিয়া স্বীকার করিতে প্রস্তুত ছিলেন না। এই নিমিত্ত “গতরাজ্যের” বা “অতীত রাজ্যের” সম্বৎ-গণনা প্রচলিত হইয়া থাকিবে। এই সম্পর্কে আর একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে,—লক্ষ্মণ-সম্বতের সূচনা এবং প্রচলন হইল কবে হইতে? পুত্র বিশ্বরূপসেনের সময়ে লক্ষ্মণ-সম্বৎ প্রচলিত ছিল না। বিশ্বরূপসেনের (কেশবসেনের?) ইদিলপুরের তাম্রশাসনের সম্পাদন-কাল, “সং ৩ জ্যৈষ্ঠ দিনে—” এবং মদনপাড়ে প্রাপ্ত তাম্রশাসনের সম্পাদন-কাল, “সং ১৪ আশ্বিনদিনে ১॥” পাল এবং সেন-রাজগণের সময় গৌড়-মণ্ডলে শকাব্দ বা বিক্রম-সম্বৎ প্রচার লাভ করিয়াছিল না; নৃপতিগণের বিজয়-রাজ্যের সম্বৎসরই প্রচলিত ছিল। পাল এবং সেনবংশের রাজ্য-নষ্টের পর, কিছুদিন “বিনষ্টরাজ্যের” বা “অতীতরাজ্যের” সম্বৎ ব্যবহৃত হইয়াছিল। তাহার পরে, প্রচলিত অব্দের অভাব পূরণের জন্য, “লক্ষ্মণাব্দ” উদ্ভাবিত হইয়া থাকিবে।

  1. সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা, ১৭শ ভাগ (১৩১৮), ২১৪ এবং ২১৬ পৃঃ।
  2. Cunningham’s Archæological Survey Report, Vol. III, plate রাখালবাবু অনুসন্ধান-সমিতিকে এই শিলা-লিপির একখানি প্রতিলিপি প্রদান করিয়া উপকৃত করিয়াছেন।
  3. J. A. S. B., 1896, Part, I, plates I and II.
  4. J. A. S. B., 1874, Part I, plate XVIII.
  5. Epigraphia Indica, Vol. V, plates 19-20.