ঘরে-বাইরে/১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
◄  ১৪
১৬  ►

নিখিলেশের আত্মকথা

রাত্রি তিনটের সময় জেগে উঠেই আমার হঠাৎ মনে হয়, যে জগতে আমি একদিন বাস করতুম সে যেন মরে ভূত হয়ে আমার এই বিছানা, এই ঘর, এই-সব জিনিসপত্র দখল করে বসে আছে। আমি বেশ বুঝতে পারলুম, মানুষ কেন পরিচিত লোকের ভূতকেও ভয় করে। চিরকালের জানা যখন এক মুহূর্তে অজানা হয়ে ওঠে তখন সে এক বিভীষিকা। জীবনের সমস্ত ব্যবহার যে সহজ স্রোতে চলছিল, আজ তাকে যখন এমন খাদে চালাতে হবে যে খাদ এখনো কাটা হয় নি, তখন বিষম ধাঁধা লেগে যায়; তখন নিজের স্বভাবকে বাঁচিয়ে চলা শক্ত হয়; তখন নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমিও বুঝি আর-একজন কেউ।

 কিছুদিন থেকে বুঝতে পারছি, সন্দীপের দলবল আমাদের অঞ্চলে উৎপাত শুরু করেছে। যদি আমার স্বভাবে স্থির থাকতুম তা হলে সন্দীপকে জোরের সঙ্গে বলতুম, এখান থেকে চলে যাও। কিন্তু গোলমালে অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছি। আমার পথ আর সরল নেই। সন্দীপকে চলে যেতে বলার মধ্যে আমার একটা লজ্জা আসে। ওর সঙ্গে আর-একটা কথা এসে পড়ে; তাতে নিজের কাছে ছোটো হয়ে যাই।

 দাম্পত্য আমার ভিতরের জিনিস ছিল; সে তো কেবল আমার গৃহস্থ-আশ্রম বা সংসারযাত্রা নয়। সে আমার জীবনের বিকাশ। সেইজন্যেই বাইরের দিক থেকে ওর উপরে একটুও জোর দিতে পারলুম না; দিতে গেলেই মনে হয় আমার দেবতাকে অপমান করছি। এ কথা কাউকে বোঝাতে পারব না। আমি হয়তো অদ্ভুত। সেইজন্যেই হয়তো ঠকলুম। কিন্তু আমার বাইরেকে ঠকা থেকে বাঁচাতে গিয়ে ভিতরকে ঠকাই কী করে!

 যে সত্য অন্তর থেকে বাইরেকে সৃষ্টি করে তোলে আমি সেই সত্যের দীক্ষা নিয়েছি। তাই আজ থেকে আমাকে বাইরের জাল এমন করে ছিন্ন করতে হল। আমার দেবতা আমাকে বাইরের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেবেন। হৃদয়ের রক্তপাত করে সেই মুক্তি আমি পাব। কিন্তু যখন পাব তখন অন্তরের রাজত্ব আমার হবে।

 সেই মুক্তির স্বাদ এখনই পাচ্ছি। থেকে থেকে অন্ধকারের ভিতর থেকে আমার অন্তরের ভোরের পাখি গান গেয়ে উঠছে। যে-বিমলা মায়ার তৈরি সেই স্বপ্ন ছুটে গেলেও ক্ষতি হবে না, আমার ভিতরের পুরুষটি এই আশ্বাসবাণী থেকে থেকে বলে উঠছে।

 মাস্টার-মশায়ের কাছে খবর পেলুম, সন্দীপ হরিশ কুণ্ডুর সঙ্গে যোগ দিয়ে খুব ধুম করে মহিষমর্দিনীপুজোর আয়োজন করছে। এই পুজোর খরচা হরিশ কুণ্ডু তার প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করতে লেগে গেছে। আমাদের কবিরত্ন আর বিদ্যাবাগীশ -মশায়কে দিয়ে একটি স্তব রচনা করা হচ্ছে যার মধ্যে দুই অর্থ হয়। মাস্টারমশায়ের সঙ্গে এই নিয়ে সন্দীপের একটু তর্কও হয়ে গেছে। সন্দীপ বলে, দেবতার একটা এভোলুশ্যন আছে; পিতামহরা যে দেবতা সৃষ্টি করেছিলেন পৌত্রেরা যদি সেই দেবতাকে আপনার মতো না করে তোলে তা হলে যে নাস্তিক হয়ে উঠবে। পুরাতন দেবতাকে আধুনিক করে তোলাই আমার মিশন, দেবতাকে অতীতের বন্ধন থেকে মুক্তি দেবার জন্যেই আমার জন্ম। আমি দেবতার উদ্ধারকর্তা।

 ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি, সন্দীপ হচ্ছে আইডিয়ার জাদুকর। সত্যকে আবিষ্কার করায় ওর কোনো প্রয়োজন নেই, সত্যের ভেলকি বানিয়ে তোলাতেই ওর আনন্দ। মধ্য-আফ্রিকায় যদি ওর জন্ম হত তা হলে নরবলি দিয়ে নরমাংস ভোজন করাই যে মানুষকে মানুষের অন্তরঙ্গ করার পক্ষে শ্রেষ্ঠ সাধনা, এই কথা নূতন যুক্তিতে প্রমাণ করে ও পুলকিত হয়ে উঠত। ভোলানোই যার কাজ নিজেকেও না ভুলিয়ে সে থাকতে পারে না। আমার বিশ্বাস, সন্দীপ কথার মন্ত্রে যতবার নূতন-নূতন কুহক সৃষ্টি করে, প্রত্যেকবার নিজেই মনে করে ‘সত্যকে পেয়েছি’— তার এক সৃষ্টির সঙ্গে আর-এক সৃষ্টির যতই বিরোধ থাক।

 যাই হোক, দেশের মধ্যে মায়ার এই তাড়িখানা বানিয়ে তোলায় আমি কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারব না। যে তরুণ যুবকেরা দেশের কাজে লাগতে চাচ্ছে গোড়া থেকেই তাদের নেশা অভ্যাস করানোর চেষ্টায় আমার যেন কোনো হাত না থাকে। মন্ত্রে ভুলিয়ে যারা কাজ আদায় করতে চায় তারা কাজটারই দাম বড়ো করে দেখে, যে মানুষের মনকে ভোলায় সেই মনের দাম তাদের কাছে কিছুই নেই। প্রমত্ততা থেকে দেশকে যদি বাঁচাতে না পারি তবে দেশের পূজা হবে দেশের বিষনৈবেদ্য, দেশের কাজ বিমুখ ব্রহ্মাস্ত্রের মতো দেশের বুকে এসে বাজবে।

 বিমলার সামনেই সন্দীপকে বলেছি, তোমাকে আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। এতে হয়তো বিমলা এবং সন্দীপ দুজনেই আমার মতলবকে ভুল বুঝবে। কিন্তু এই ভুল বোঝার ভয় থেকে মুক্তি চাই। বিমলাও আমাকে ভুল বুঝুক।

 ঢাকা থেকে মৌলবি-প্রচারকের আনাগােনা চলছে। আমাদের এলাকার মুসলমানেরা গােহত্যাকে প্রায় হিন্দুর মতােই ঘৃণা করত। কিন্তু দুই-এক জায়গায় গােরু জবাই দেখা দিল। আমি আমার মুসলমান প্রজারই কাছে তার প্রথম খবর পাই এবং তার প্রতিবাদও শুনি। এবারে বুঝলুম ঠেকানাে শক্ত হবে। ব্যাপারটার মূলে একটা কৃত্রিম জেদ আছে। বাধা দিতে গেলে ক্রমে তাকে অকৃত্রিম করে তােলা হবে। সেইটেই তাে আমাদের বিরুদ্ধ পক্ষের চাল।

 আমার প্রধান প্রধান হিন্দু প্রজাকে ডাকিয়ে অনেক করে বােঝাবার চেষ্টা করলুম। বললুম, নিজের ধর্ম আমরা রাখতে পারি, পরের ধর্মের উপর আমাদের হাত নেই। আমি বােষ্টম বলে শাক্ত তাে রক্তপাত করতে ছাড়ে না! উপায় কী? মুসলমানকেও নিজের ধর্মমতে চলতে দিতে হবে। তােমরা গােলমাল কোরাে না।

 তারা বললে, মহারাজ, এতদিন তাে এ-সব উপসর্গ ছিল না।

 আমি বললুম, ছিল না, সে ওদের ইচ্ছা। আবার ইচ্ছা করেই যাতে নিবৃত্ত হয় সেই পথই দেখাে। সে তাে ঝগড়ার পথ নয়।

 তারা বললে, না মহারাজ, সেদিন নেই; শাসন না করলে কিছুতেই থামবে না।

 আমি বললুম, শাসনে গােহিংসা তাে থামবেই না, তার উপর মানুষের প্রতিহিংসা বেড়ে উঠতে থাকবে।

 এদের মধ্যে একজন ছিল ইংরেজি-পড়া; সে এখনকার বুলি আওড়াতে শিখেছে। সে বললে, দেখুন, এটা তাে কেবল একটা সংস্কারের কথা নয়; আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান, এ দেশে গােরু যে—

 আমি বললুম, এ দেশে মহিষেও দুধ দেয়, মহিষেও চাষ করে, কিন্তু তার কাটামুণ্ড মাথায় নিয়ে সর্বাঙ্গে রক্ত মেখে যখন উঠোনময় নৃত্য করে বেড়াই, তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে মুসলমানের সঙ্গে ঝগড়া করলে ধর্ম মনে মনে হাসেন, কেবল ঝগড়াটাই প্রবল হয়ে ওঠে। কেবল গােরুই যদি অবধ্য হয় আর মােষ যদি অবধ্য না হয়, তবে ওটা ধর্ম নয়, ওটা অন্ধ সংস্কার।

 ইংরেজি-পড়া বললে, এর পিছনে কে আছে সেটা কি দেখতে পাচ্ছেন? মুসলমানেরা জানতে পেরেছে তাদের শাস্তি হবে না। পাঁচুড়েতে কী কাণ্ড তারা করেছে শুনেছেন তাে?

 আমি বললুম, এই-যে মুসলমানদের অস্ত্র করে আজ আমাদের উপরে হানা সম্ভব হচ্ছে, এই অস্ত্রই যে আমরা নিজের হাতে বানিয়েছি। ধর্ম যে এমনি করেই বিচার করেন। আমরা যা এতকাল ধরে জমিয়েছি আমাদের উপরেই তা খরচ হবে।

 ইংরেজি-পড়া বললে, আচ্ছা ভালাে, তাই খরচ হয়ে যাক। কিন্তু এর মধ্যে আমাদেরও একটা সুখ আছে— আমাদেরই এবার জিত— যে আইন ওদের সকলের চেয়ে বড়াে শক্তি সেই আইনকে আজ আমরা ধূলিসাৎ করেছি; এতদিন ওরা রাজা ছিল, আজ ওদেরও আমরা ডাকাতি ধরাব। এ কথা ইতিহাসে কেউ লিখবে না, কিন্তু এ কথা চিরদিন আমাদের মনে থাকবে।

 এ দিকে খবরের কাগজে অখ্যাতিতে আমি বিখ্যাত হয়ে পড়লুম। শুনছি চক্রবর্তীদের এলাকায় নদীর ধারে শ্মশান-ঘাটে দেশসেবকদের দল আমার কুশপুত্তলি বানিয়ে খুব ধুম করে সেটাকে দাহ করেছে; তার সঙ্গে আরাে অনেক অপমানের আয়ােজন ছিল। এরা কাপড়ের কল খুলে যৌথ কারবার করবে বলে আমাকে খুব বড়াে শেয়ার কেনাতে এসেছিল। আমি বলেছিলুম, যদি কেবল আমার এই-ক’টি টাকা লােকসান যেত খেদ ছিল না। কিন্তু তােমরা যদি কারখানা খােল তবে অনেক গরিবের টাকা মারা যাবে, এইজন্যেই আমি শেয়ার কিনব না।

 কেন মশাই, দেশের হিত কি আপনি পছন্দ করেন না?

 কারবার করলে দেশের হিত হতেও পারে, কিন্তু দেশের হিত করব বললেই তাে কারবার হয় না। যখন ঠাণ্ডা ছিলুম তখন আমাদের ব্যবসা চলে নি। আর, খেপে উঠেছি বলেই কি আমাদের ব্যবসা হু হু করে চলবে?

 এক কথায় বলুন-না, আপনি শেয়ার কিনবেন না।

 কিনব যখন তােমাদের ব্যবসাকে ব্যবসা বলে বুঝব। তােমাদের আগুন জ্বলছে বলেই যে তােমাদের হাঁড়িও চড়বে, সেটার তাে কোনাে প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখছি নে।

 এরা মনে করে, আমি খুব হিসাবি, আমি কৃপণ। আমার স্বদেশী কারবারের হিসাবের খাতাটা এদের খুলে দেখাতে ইচ্ছা করে। আর সেই-যে একদিন মাতৃভূমিতে ফসলের উন্নতি করতে বসেছিলুম, তার ইতিহাস এরা বুঝি জানে না। ক-বছর ধরে জাভা মরিশস থেকে আখ আনিয়ে চাষ করালুম। সরকারি কৃষিবিভাগের কর্তৃপক্ষের পরামর্শে যত রকমের কর্ষণ বর্ষণ হতে পারে তার কিছুই বাকি রাখি নি। অবশেষে তার থেকে ফসলটা কী হল? সে আমার এলাকার চাষীদের চাপা অট্টহাস্য। আজও সেটা চাপা রয়ে গেছে। তার পরে সরকারি কৃষিপত্রিকা তর্জমা করে যখন ওদের কাছে জাপানি সিম কিংবা বিদেশী কাপাসের চাষের কথা বলতে গেছি তখন দেখতে পেয়েছি, সেই পুরোনো চাপা হাসি আর চাপা থাকে না। দেশে তখন দেশসেবকদের কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। বন্দে মাতরং মন্ত্র তখন নীরব। আর সেই-যে আমার কলের জাহাজ— দূর হোক, সে-সব কথা তুলে লাভ কী! দেশহিতের যে আগুন এরা জ্বাললে তাতে আমারই কুশপুত্তলি দগ্ধ হয়ে যদি থামে তবে তো রক্ষা।


এ কী খবর! আমাদের চকুয়ার কাছারিতে ডাকাতি হয়ে গেছে। কাল রাত্রে সদর খাজনার সাড়ে সাত হাজার টাকার এক কিস্তি সেখানে জমা হয়েছিল; আজ ভোরে নৌকা করে আমাদের সদরে রওনা হবার কথা। পাঠাবার সুবিধা হবে বলে নায়েব ট্রেজরি থেকে টাকা ভাঙিয়ে দশ কুড়ি টাকার নোট করে তাড়াবন্দি করে রেখেছিল। অর্ধেক রাত্রে ডাকাতের দল বন্দুক-পিস্তল নিয়ে মালখানা লুটেছে। কাসেম সর্দার পিস্তলের গুলি খেয়ে জখম হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ডাকাতেরা কেবল ছ হাজার টাকা নিয়ে বাকি দেড় হাজার টাকার নোট ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে ফেলে চলে এসেছে। অনায়াসে সব টাকাই নিয়ে আসতে পারত। যাই হোক, ডাকাতের পালা শেষ হল, এইবার পুলিসের পালা আরম্ভ হবে। টাকা তো গেছেই, এখন শান্তিও থাকবে না।

 বাড়ির ভিতর গিয়ে দেখি, সেখানে খবর রটে গেছে। মেজোরানী এসে বললেন, ঠাকুরপো, এ কী সর্বনাশ!

 আমি উড়িয়ে দেবার জন্যে বললুম, সর্বনাশের এখনো অনেক বাকি আছে। এখনো কিছু কাল খেয়ে পরে কাটাতে পারব।

 না ভাই, ঠাট্টা নয়, তোমারই উপর এদের এত রাগ কেন? ঠাকুরপো, তুমি নাহয় ওদের একটু মন রেখেই চলো-না। দেশসুদ্ধ লোককে কি—

 দেশসুদ্ধ লোকের খাতিরে দেশকে সুদ্ধ মজাতে পারব না তো!

 এই সেদিন শুনলুম, নদীর ধারে তোমাকে নিয়ে ওরা এক কাণ্ড করে বসেছে! ছি ছি! আমি তো ভয়ে মরি! ছোটোরানী মেমের কাছে পড়েছে, ওর তো ভয়ডর নেই। আমি কেনারাম পুরুতকে শান্তি-স্বস্ত্যয়নের বন্দোবস্ত করে দিয়ে তবে বাঁচি। আমার মাথা খাও ঠাকুরপো, তুমি কলকাতায় যাও। এখানে থাকলে ওরা কোন্ দিন কী করে বসে।

 মেজোরানীদিদির ভয় ভাবনা আজ আমার প্রাণে সুধা বর্ষণ করলে। অন্নপূর্ণা, তােমাদের হৃদয়ের দ্বারে আমাদের ভিক্ষা কোনােদিন ঘুচবে না।

 ঠাকুরপাে, তােমার শােবার ঘরের পাশে ঐ-যে টাকাটা রেখেছ, ওটা ভালাে করছ না। কোন দিক থেকে ওরা খবর পাবে আর শেষকালে— আমি টাকার জন্যে ভাবি নে, ভাই— কী জানি—

 আমি মেজোরানীকে ঠাণ্ডা করবার জন্যে বললুম, আচ্ছা, ও টাকাটা বের করে এখনই আমাদের খাজাঞ্চিখানায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। পরশুদিনই কলকাতার ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়ে আসব।

 এই বলে শােবার ঘরে ঢুকে দেখি পাশের ঘর বন্ধ। দরজাটা ধাক্কা দিতেই ভিতর থেকেই বিমলা বললে, আমি কাপড় ছাড়ছি।

 মেজোরানী বললে, এই সকালবেলাতেই ছােটোরানীর সাজ হচ্ছে। অবাক করলে। আজ বুঝি ওদের বন্দে মাতরমের বৈঠক বসবে। ওলাে, ও দেবীচৌধুরানী, লুটের মাল বােঝাই হচ্ছে নাকি?

 আর-একটু পরে এসে সব ঠিক করা যাবে, এই বলে বাইরে এসে দেখি সেখানে পুলিস ইন্‌স্পেক্টর এসে উপস্থিত। জিজ্ঞাসা করলুম, কিছু সন্ধান পেলেন?

 সন্দেহ তাে করছি।

 কাকে?

 ঐ কাসেম সর্দারকে।

 সে কী কথা! ঐ তাে জখম হয়েছে।

 জখম কিছু নয়। পায়ের চামড়া ঘেঁষে একটুখানি রক্ত পড়েছে; সে ওর নিজেরই কীর্তি।

 কাসেমকে আমি কোনােমতেই সন্দেহ করতে পারি নে। ও বিশ্বাসী।

 বিশ্বাসী সে কথা মানতে রাজি আছি, কিন্তু তাই বলেই যে চুরি করতে পারে না তা বলা যায় না। এও দেখেছি পঁচিশ বৎসর যে-লােক বিশ্বাস রক্ষা করে এসেছে সেও একদিন হঠাৎ—

 তা যদি হয় আমি ওকে জেলে দিতে পারব না।

 আপনি দেবেন কেন? যার হাতে দেবার ভার সেই দেবে।

 কাসেম ছ হাজার টাকা নিয়ে বাকি টাকাটা ফেলে রাখলে কেন?

 ঐ ধোঁকাটা মনে জন্ম দেবার জন্যেই। আপনি যাই বলুন, লােকটা পাকা। ও আপনাদের কাছারিতে পাহারা দেয়; এ দিকে কাছাকাছি এ অঞ্চলে যত চুরি ডাকাতি হয়েছে নিশ্চয় তার মূলে ও আছে।

 লাঠিয়ালরা পঁচিশ-ত্রিশ মাইল দূরে ডাকাতি সেরে এক রাত্রেই কেমন করে ফিরে এসে মনিবের কাছারিতে হাজরি লেখাতে পারে ইন্‌স্পেক্টর তার অনেক দৃষ্টান্ত দেখালেন।

 আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কাসেমকে এনেছেন?

 তিনি বললেন, না, সে থানায় আছে। এখনই ডেপুটিবাবু তদন্ত করতে আসবেন।

 আমি বললুম, আমি তাকে দেখতে চাই।

 কাসেমের সঙ্গে দেখা হবামাত্র সে আমার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললে, খােদার কসম, মহারাজ, আমি এ কাজ করি নি।

 আমি বললুম, কাসেম, আমি তােমাকে সন্দেহ করি নে। ভয় নেই তােমার, বিনা দোষে তােমার শাস্তি ঘটতে দেব না।

 কাসেম ডাকাতদের ভালাে বর্ণনা করতে পারলে না। কেবল খুবই অত্যুক্তি করতে লাগল— চারশাে, পাঁচশাে লোক, এত বড়াে বড়াে বন্দুক তলােয়ার ইত্যাদি। বুঝলুম, এ-সমস্ত বাজে কথা; হয় ভয়ের দৃষ্টিতে সব বেড়ে উঠেছে, নয় পরাভবের লজ্জা চাপা দেবার জন্যে বাড়িয়ে তুলেছে। ওর ধারণা, হরিশ কুণ্ডুর সঙ্গে আমার শত্রুতা, এ তারই কাজ; এমন-কি, তাদের এক্রাম সর্দারের গলার আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে বলে তার বিশ্বাস।

 আমি বললুম, দেখ কাসেম, আন্দাজের উপর ভর করে খবরদার পরের নাম জড়াস নে। হরিশ কুণ্ডু এর মধ্যে আছে কি না সে কথা বানিয়ে তােলবার ভার তাের উপর নেই।

 বাড়ি ফিরে এসে মাস্টারমশায়কে ডেকে পাঠালুম। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, আর কল্যাণ নেই। ধর্মকে সরিয়ে দিয়ে দেশকে তার জায়গায় বসিয়েছি; এখন দেশের সমস্ত পাপ উদ্ধত হয়ে ফুটে বেরােবে, তার আর কোনাে লজ্জা থাকবে না।

 আপনি কি মনে করেন এ কাজ—

 আমি জানি নে, কিন্তু পাপের হাওয়া উঠেছে। দাও দাও, তােমার এলেকা থেকে ওদের এখনই বিদায় করে দাও।

 আর একদিন সময় দিয়েছি। পরশু এরা সব যাবে।

 দেখাে, আমি একটি কথা বলি, বিমলাকে তুমি কলকাতায় নিয়ে যাও। এখান থেকে তিনি বাইরেটাকে সংকীর্ণ করে দেখছেন, সব মানুষের সব জিনিসের ঠিক পরিমাণ বুঝতে পারছেন না। ওঁকে তুমি একবার পৃথিবীটা দেখিয়ে দাও— মানুষকে, মানুষের কর্মক্ষেত্রকে, উনি একবার বড়াে জায়গা থেকে দেখে নিন।

 আমিও ঐ কথাই ভাবছিলুম।

 কিন্তু, আর দেরি কোরাে না। দেখো নিখিল, মানুষের ইতিহাস পৃথিবীর সমস্ত দেশকে সমস্ত জাতকে নিয়ে তৈরি হয়ে উঠেছে। এইজন্যে পলিটিক্সেও ধর্মকে বিকিয়ে দেশকে বাড়িয়ে তােলা চলবে না। আমি জানি, য়ুরােপ এ কথা মনের সঙ্গে মানে না; কিন্তু তাই বলেই যে য়ুরােপই আমাদের গুরু এ আমি মানব না। সত্যের জন্যে মানুষ মরে অমর হয়, কোনাে জাতিও যদি মরে তা হলে মানুষের ইতিহাসে সেও অমর হবে। সেই সত্যের অনুভূতি জগতের মধ্যে এই ভারতবর্ষেই খাঁটি হয়ে উঠুক শয়তানের অভ্রভেদী অট্টহাসির মাঝখানে। কিন্তু বিদেশ থেকে এ কী পাপের মহামারী এসে আমাদের দেশে প্রবেশ করলে!


সমস্ত দিন এই-সব নানা হাঙ্গামে কেটে গেল। শ্রান্ত হয়ে রাত্রে শুতে গেলুম। সেই টাকাটা আজ বের না করে কাল সকালে বের করে নেব স্থির করেছি।

 রাত্রে কখন এক সময় ঘুম ভেঙে গেল। ঘর অন্ধকার। একটা কিসের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছি। বুঝি কেউ কাঁদছে।

 থেকে থেকে বাদলা রাতের দমকা হাওয়ার মতাে চোখের জলে ভরা এক-একটা দীর্ঘনিশ্বাস শুনতে পাচ্ছি। আমার মনে হল আমার এই ঘরটার বুকের ভিতরকার কান্না।

 আমার ঘরে আর-কেউ নেই। বিমলা কিছুদিন থেকে কোনাে-একটা পাশের ঘরে শােয়। আমি বিছানা থেকে উঠে পড়লুম। বাইরের বারান্দায় গিয়ে দেখি, বিমলা মাটির উপর উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে।

 এ-সব কথা লিখতে পারা যায় না। এ যে কী, তা কেবল তিনিই জানেন যিনি বিশ্বের মর্মের মধ্যে বসে জগতের সমস্ত বেদনাকে গ্রহণ করছেন। আকাশ মূক, তারাগুলি নীরব, রাত্রি নিস্তব্ধ— তারই মাঝখানে ঐ একটি নিদ্রাহীন কান্না!

 আমরা এই-সব সুখ-দুঃখকে সংসারের সঙ্গে শাস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ভালাে মন্দ একটা-কিছু নাম দিয়ে চুকিয়ে ফেলে দিই। কিন্তু অন্ধকারের বক্ষ ভাসিয়ে দিয়ে এই-যে ব্যথার উৎস উঠছে এর কি কোনাে নাম আছে? সেই নিশীথরাত্রে, সেই লক্ষকোটি তারার নিঃশব্দতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি যখন ওর দিকে চেয়ে দেখলুম তখন আমার মন সভয়ে বলে উঠল, আমি একে বিচার করবার কে? হে প্রাণ, হে অসীম বিশ্ব, হে অসীম বিশ্বের ঈশ্বর, তোমাদের মধ্যে যে রহস্য রয়েছে আমি জোড়হাতে তাকে প্রণাম করি।

 একবার ভাবলুম, ফিরে যাই। কিন্তু পারলুম না। নিঃশব্দে বিমলার শিয়রের কাছে বসে তার মাথার উপর হাত রাখলুম। প্রথমটা তার সমস্ত শরীর কাঠের মতো শক্ত হয়ে উঠল। তার পরেই সেই কঠিনতা যেন ফেটে ভেঙে কান্না সহস্র ধারায় বয়ে যেতে লাগল। মানুষের হৃদয়ের মধ্যে এত কান্না যে কোথায় ধরতে পারে সে-তো ভেবে পাওয়া যায় না।

 আমি আস্তে আস্তে বিমলার মাথায় হাত বুলোতে লাগলুম। তার পরে কখন এক সময় হাৎড়ে হাৎড়ে সে আমার পা-দুটো টেনে নিলে; বুকের উপর এমনি করে চেপে ধরলে যে আমার মনে হল, সেই আঘাতে তার বুক ফেটে যাবে।