ছেলেবেলা/১৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

যে মূর্তিকার আমাকে বানিয়ে তুলেছেন তাঁর হাতের প্রথম কাজ বাংলাদেশের মাটি দিয়ে তৈরি । একটা চেহারার প্রথম আদল দেখা দিল — সেটাকেই বলি ছেলেবেলা , সেটাতে মিশোল বেশি নেই । তার মালমসলা নিজের মধ্যেই জমা ছিল , আর কিছু কিছু ছিল ঘরের হাওয়া আর ঘরের লোকের হাতে । অনেক সময়ে এইখানেই গড়নের কাজ থেমে যায় । এর উপরে লেখাপড়া-শিক্ষার কারখানাঘরে যাদের বিশেষ রকম গড়ন-পিটন ঘটে তারা বাজারে বিশেষ মার্কার দাম পায় ।

আমি দৈবক্রমে ঐ কারখানাঘরের প্রায় সমস্তটাই এড়িয়ে গিয়েছিলুম । মাস্টার পণ্ডিত যাঁদের বিশেষ করে রাখা হয়েছিল তাঁরা আমাকে তরিয়ে দেবার কাজে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন । জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্য মশায় ছিলেন আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ মশায়ের পুত্র , বি. এ. পাশ-করা । তিনি বুঝে নিয়েছিলেন , লেখাপড়া-শেখার বাঁধা রাস্তায় এ ছেলেকে চালানো যাবে না । মুশকিল এই যে , পাশ-করা ভদ্রলোকের ছাঁচে ছেলেদের ঢালাই করতেই হবে , এ কথাটা তখনকার দিনের মুরুব্বিরা তেমন জোরের সঙ্গে ভাবেন নি । সেকালে কলেজি বিদ্যার একই বেড়াজালে ধনী অধনী সকলকেই টেনে আনবার তাগিদ ছিল না । আমাদের বংশে তখন ধন ছিল না কিন্তু নাম ছিল , তাই রীতিটা টিঁকে গিয়েছিল । লেখাপড়ার গরজটা ছিল ঢিলে । ছাত্রবৃত্তির নীচের ক্লাস থেকে এক সময়ে আমাদের চালান করা হয়েছিল ডিক্রুজ সাহেবের বেঙ্গল একাডেমিতে । আর-কিছু না হোক , ভদ্রতা রক্ষার মতো ইংরেজি বচন সড়গড় হবে , অভিভাবকদের এই ছিল আশা । ল্যাটিন শেখার ক্লাসে আমি ছিলুম বোবা আর কালা , সকলরকম এক্‌সে সাইজের খাতাই থাকত বিধবার থান কাপড়ের মতো আগাগোড়াই সাদা । আমার পড়া না করবার অদ্ভুত জেদ দেখে ক্লাসের মাস্টার ডিক্রুজ সাহেবের কাছে নালিশ করেছিলেন । ডিক্রুজ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন , পড়াশোনা করবার জন্যে আমরা জন্মাই নি , মাসে মাসে মাইনে চুকিয়ে দেবার জন্যেই পৃথিবীতে আমাদের আসা । জ্ঞানবাবু কতকটা সেইরকমই ঠিক করেছিলেন । কিন্তু এরই মধ্যে তিনি একটা পথ কেটেছিলেন । আমাকে আগাগোড়া মুখস্থ করিয়ে দিলেন কুমারসম্ভব । ঘরে বন্ধ রেখে আমাকে দিয়ে ম্যাকবেথ তর্জমা করিয়ে নিলেন । এ দিকে রামসর্বস্ব পণ্ডিতমশায় পড়িয়ে দিলেন শকুন্তলা । ক্লাসের পড়ার বাইরে আমাকে দিয়েছিলেন ছেড়ে , কিছু ফল পেয়েছিলেন । আমার ছেলেবয়সের মন গড়বার এই ছিল মালমসলা , আর ছিল বাংলা বই যা-তা , তার বাছবিচার ছিল না ।

উঠলুম বিলেতে গিয়ে , জীবনগঠনে আরম্ভ হল বিদিশি কারিগরি — কেমিস্ট্রিতে যাকে বলে যৌগিক বস্তুর সৃষ্টি । এর মধ্যে ভাগ্যের খেলা এই দেখতে পাই যে , গেলুম রীতিমতো নিয়মে কিছু বিদ্যা শিখে নিতে ; কিছু কিছু চেষ্টা হতে লাগল , কিন্তু হয়ে উঠল না । মেজবোঠান ছিলেন , ছিল তাঁর ছেলেমেয়ে , জড়িয়ে রইলুম আপন ঘরের জালে । ইস্কুলমহলের আশেপাশে ঘুরেছি ; বাড়িতে মাস্টার পড়িয়েছেন , দিয়েছি ফাঁকি । যেটুকু আদায় করেছি সেটা মানুষের কাছাকাছি থাকার পাওনা । নানা দিক থেকে বিলেতের আবহাওয়ার কাজ চলতে লাগল মনের উপর । পালিত সাহেব আমাকে ছাড়িয়ে নিলেন ঘরের বাঁধন থেকে । একটি ডাক্তারের বাড়িতে বাসা নিলুম । তাঁরা আমাকে ভুলিয়ে দিলেন যে , বিদেশে এসেছি । মিসেস স্কট আমাকে যে স্নেহ করতেন সে একেবারে খাঁটি । আমার জন্যে সকল সময়েই মায়ের মতো ভাবনা ছিল তাঁর মনে । আমি তখন লণ্ডন য়ুনিভর্সিটিতে ভরতি হয়েছি , ইংরেজি সাহিত্য পড়াচ্ছেন হেনরি মরলি । সে তো পড়ার বই থেকে চালান দেওয়া শুকনো মাল নয় । সাহিত্য তাঁর মনে , তাঁর গলার সুরে প্রাণ পেয়ে উঠত — আমাদের সেই মরমে পৌঁছত যেখানে প্রাণ চায় আপনখোরাক , মাঝখানে রসের কিছুই লোকসান হত না । বাড়িতে এসে ক্ল্যারেণ্ডন প্রেসের বইগুলি থেকে পড়বার বিষয় উলটে-পালটে বুঝে নিতুম । অর্থাৎ নিজের মাস্টারি করার কাজটা নিজেই নিয়েছিলুম ।

নাহক থেকে থেকে মিসেস স্কট মনে করতেন , আমার মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে । ব্যস্ত হয়ে উঠতেন । তিনি জানতেন না , ছেলেবেলা থেকে আমার শরীরে ব্যামো হবার গেট বন্ধ । প্রতিদিন ভোরবেলায় বরফ-গলা জলে স্নান করেছি । তখনকার ডাক্তারি মতে এরকম অনিয়মে বেঁচে থাকাটা যেন শাস্ত্র ডিঙিয়ে চলা ।

আমি য়ুনিভর্সিটিতে পড়তে পেরেছিলুম তিন মাস মাত্র । কিন্তু আমার বিদেশের শিক্ষা প্রায় সমস্তটাই মানুষের ছোঁওয়া লেগে । আমাদের কারিগর সুযোগ পেলেই তাঁর রচনায় মিলিয়ে দেন নূতন নূতন মালমসলা । তিন মাসে ইংরেজের হৃদয়ের কাছাকাছি থেকে সেই মিশোলটি ঘটেছিল । আমার উপরে ভার পড়েছিল রোজ সন্ধেবেলায় রাত এগারোটা পর্যন্ত পালা করে কাব্যনাটক ইতিহাস পড়ে শোনানো । ঐ অল্প সময়ের মধ্যে অনেক পড়া হয়ে গেছে । সেই পড়া ক্লাসের পড়া নয় । সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনের মিলন ।

বিলেতে গেলেম , বারিস্টর হই নি । জীবনের গোড়াকার কাঠামোটাকে নাড়া দেবার মতো ধাক্কা পাই নি , নিজের মধ্যে নিয়েছি পূব-পশ্চিমের হাত মেলানো — আমার নামটার মানে পেয়েছি প্রাণের মধ্যে ।