পত্রাবলী (১৯১২-১৯৩২)/১২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
১২
কটক
১১।১০।১১
রাত্রি ৮টা

পরম পূজনীয় মেজদাদা,

 আজই সন্ধ্যায় আপনার দীর্ঘ পত্রখানি পাইলাম। আমার শিশুসুলভ কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য আপনি যে শ্রম স্বীকার করিয়াছেন তাহার জন্য আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা কিরূপে প্রকাশ করিব তাহা জানি না। ভাষা অপারগ বোধ করে; কারণ ভাষা চিন্তাকে অর্দ্ধেক প্রকাশ করে ও অর্দ্ধেক গোপন করে। মানুষ যদি ভাষাকে আরও পূর্ণতর করিতে পারিত তবে প্রকাশের পঙ্গুতা হ্রাস পাইত। বলিতে পারি না আপনার অপূর্ব্ব বর্ণনা কত সুন্দর লাগিয়াছে—কি জীবন্ত তাহার আবেদন। আপনার বর্ণিত দৃশ্যাবলী যেন আমার মানস চক্ষুর সম্মুখে নৃত্য করিতে থাকে এবং যেন জীবন্ত ও বাস্তব হইয়া উঠে কেবল তাহাই নহে স্মৃতিচারণা ও অনুপ্রেরণার অভাবে পূর্ব্বে দৃষ্ট যে সমস্ত দৃশ্যাবলী বিস্মৃতির গভীরে সুপ্ত ছিল তাহা পুনরায় জাগিয়া উঠে। চলচ্চিত্রের ছবির মত দার্জ্জিলিং-এর অপূর্ব্ব দৃশ্যাবলী যেন আমার চক্ষের সম্মুখে একের পর এক ফিরিয়া আসে। পুরীর নীল সমুদ্র, যেখানে সুনীল জলরাশি উন্মাদ তরঙ্গ মালায় বালুকা বেলায় আছাড় খাইয়া পড়িতেছে—তাহাদের উপর যেন মাঝে মাঝে শুভ্রতার স্পর্শ, নীল আকাশের দিকে হাত বাড়াইয়া আকাশের সঙ্গ কামনা করিতেছে—যেন আমার নয়ন সম্মুখে শিলাকীর্ণ নগ্ন নারাজ পর্ব্বত বিশাল মহানদীর তীরে মহীয়ান উচ্চতায় বিরাজমান। ভুবনেশ্বরের উদয়গিরি ও খণ্ডগিরির ঐতিহাসিক গুহাবলী—যাহা সব আমি পূর্ব্বে দেখিয়াছি এখন আমার মানসপটে ক্রীড়াশীল হইয়া উঠিয়াছে। এখানে আমার চক্ষের সম্মুখে “Happy-Snowdon” চিত্রখানি রহিয়াছে! ইহা কি অপূর্ব্ব। আকাশে ক্রীড়াশীল চঞ্চল রং-এর মেলা, তুষারমৌলী পর্ব্বতশিখরে প্রতিফলিত নিম্নে সুশীতল হ্রদের জলরাশিতেও যেন সেই সুমহান বর্ণনাবলীর প্রতিফলন। পর্ব্বতের তুষারশীর্ষে উজ্জ্বল, রক্তাভ ছটা। এই সবকিছু যেন হিন্দু পুরাণে বর্ণিত হেমকূট পর্ব্বতের ছবি অথবা গ্রীক দেব-দেবীদের বাসভূমি মাউন্ট অলিম্পাস।

 জানি না কেন এই সব আবোল তাবোল লিখিয়া আপনার সময় নষ্ট করিতেছি। কিন্তু কি যেন ভিতর হইতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করিতেছে। জানি না হয়ত আপনার পক্ষে ইহা ক্লান্তিকর হইতেছে।

 পক্ষকাল পূর্ব্বে মাতাঠাকুরাণীর নিকট আপনি সুনির্ব্বাচিত চিত্রাবলী সম্বলিত পোষ্ট কার্ডের প্যাকেট পাঠাইয়াছেন। আপনার নির্ব্বাচন অনবদ্য। এরূপ অপূর্ব্ব দৃশ্যাবলীর সঙ্কলন দুর্ল্লভ রুচিজ্ঞানের পরিচায়ক। মাতাঠাকুরাণী যখন সর্ব্বোৎকৃষ্টখানি নির্ব্বাচন করিতে বলিয়াছিলেন তখন আমি বলিয়াছিলাম যে সবগুলিই অপূর্ব্ব ও অতুলনীয়। চিত্রগুলি এতই সুন্দর যে হয়ত সৌন্দর্য্যের আতিশয্যে স্বর্গকেও নরক করিয়া তুলিতে পারে। সত্যানুগ না হইলেও তাহা মনোমুগ্ধকর। আমরা চিত্রগুলি সাতিশয় উপভোগ করিয়াছি। কয়েকখানি আমি নিজের কাছে রাখিয়া দিয়াছি।

 আপনার বর্ণনাগুলি এত জীবন্ত যে যদি চিত্রকলার কিছু জানিতাম তবে নিজের মনে ছবিগুলি ধরিয়া রাখার জন্য এবং আত্মতৃপ্তির জন্য আঁকিবার চেষ্টা করিতাম। কিন্তু উক্ত কলায় আমি অনভিজ্ঞ, তাই মানসপটে বিধৃত চিত্রাবলী লইয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে।

 আমি সহজেই কল্পনা করিতে পারি, আপনার মনের অবস্থা বােম্বাই হইতে সুয়েজ যাইবার সময় কিরূপ হইয়াছিল। সুনীল জলধি ও নীল আকাশের নিরবচ্ছিন্নতা হইতে জীবন্ত প্রকৃতির স্পর্শ কামনায় হৃদয় কাতর। আমি একমাসের অধিক কলিকাতায় এক যােগে থাকিতে চাহি না। কারণ হাস্যময়ী প্রকৃতির সৌন্দর্য্য কামনায় প্রাণ ব্যাকুল হইয়া উঠে। অন্তরের জ্বালা জুড়াইবার জন্য দুর্ল্লভ মুহূর্ত্তে অনুপ্রেরণা দিবার জন্য প্রকৃতি না থাকিলে— আমার মনে হয় মানুষ সুখী হইতে পারে না। প্রকৃতির সঙ্গ ও শিক্ষা না পাইলে, জীবন মরুলােকে নির্ব্বাসনের মত, সকল রস ও অনুপ্রেরণা হারায়। জীবনের রৌদ্রোজ্জ্বল দিক ম্লান হইয়া যায়। আপনি আমার জন্য যে কষ্ট স্বীকার করিয়াছেন এবং আপনার অচিন্ত্য বর্ণনাগুলির জন্য আপনাকে বারংবার ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া, আমি আর কি বা করিতে পারি।

 আশা করি এতদিনে আপনাকে লণ্ডনে লেখা চিঠিগুলি পাইয়াছেন।

১৬।১০।১২

 আজ ডাক যাইবার দিন; আজই এই চিঠিখানি ডাকে দিতে হইবে। গত সােমবার আপনার একখানি পত্র পাইয়াছি। জানিয়া আনন্দিত হইলাম যে ক্যাপ্টেন ও মিসেস ওয়েব্যাণ্ডের কাছাকাছি আপনি আছেন; ও তাঁহাদের সহিত প্রায়ই দেখাশুনা হয়।

 এখন লণ্ডনে কখন সূর্য্যোদয় ও সূর্য্যাস্ত হয়? এখন কি পার্লামেন্টের অধিবেশন চলিতেছে? লণ্ডনের কুয়াসার অভিজ্ঞতা হইল কি? শীত ত আসিল।

 আপনার পুরাতন বন্ধু সুধীর রায়ের সহিত দেখা হইয়াছে জানিয়া আনন্দিত হইলাম। মার্শাই হইতে লণ্ডন যাওয়ার পথে প্যারিসে আসিয়াছিলেন কি?

 আমি পূর্ব্বেই বলিয়াছি ব্যস্ত থাকিলে আমাকে আলাদা পত্র দিবার জন্য কষ্ট করিবেন না। তাহাই আবার বলিতেছি—আপনাকে কত পত্র লিখিতে হয় ও হাতে কত অল্প সময়।

 আপনার দীর্ঘ পত্রখানি মেজ জামাইবাবুকে পাঠাইতেছি ও তাঁহার পড়া হইলে সেজ জামাইবাবুকে পাঠাইতে বলিয়াছি। কিন্তু আমাকে ফেরৎ দিতে হইবে।

 স্কুল বন্ধ। আমাদের ১১ই নভেম্বর পর্য্যন্ত দীর্ঘ অবকাশ। নাদু, রাঙ্গামামাবাবু ও আমি ছুটিতে এখানেই থাকিব। অন্য সকলে কলিকাতায়। নদাদা এখানে আসিয়াছেন। বাবা ও মা ওখানে ভালই আছেন।

 আমার মনে হয় এই পত্রখানি কলিকাতায় জি. পি. ও. তে মাতাঠাকুরাণীর পত্রের সঙ্গী হইবে। বিলম্ব হইলেও আমাদের বিজয়ার প্রণাম গ্রহণ করিবেন।

 যথাযোগ্য জানিবেন। ইতি—

আপনার স্নেহের 
সুভাষ 

(ইংরাজী হইতে অনূদিত)