পাতা:আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনা - প্রবীর ঘোষ.pdf/১৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

একটি মনঃ যে নিজেকে দেখছে ও একই সঙ্গে নিজেকে তৈরি করছে। আমাদের ব্যক্তিগত ‘মন’ বা ‘চেতনা'কে বিশ্ববাপী মনের সমুদ্রে বিচ্ছিন্ন কিছু দ্বীপ বলে ভাবা যেতে পারে। (প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা এখানে 'ভাবা যেতে পারে' কথাটির প্রতি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। 'ভাবা যেতে পারে’ কথাটি আরও একটি ইঙ্গিত বহন করে—'না-ও ভাবা যেতে পারে'।) এই ভাবনা স্মরণ করিয়ে দেয় অতীন্দ্রিয়বাদের সেই ধারণাকে—ঈশ্বর বিভিন্ন খণ্ডিত ব্যক্তি-মনের সমষ্টিস্বরূপ। অধ্যাত্মিক প্রগতির উপযুক্ত স্তরে উন্নীত হলে মানুষের মন তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে সেই অখণ্ড-মনে লীন হয়ে যায়।”

 অধ্যাত্মবাদীদের 'আত্মা-পরমাত্মা’ চিন্তার সঙ্গে পল ডেভিসের চিন্তার সাদৃশ্য থাকায় অধ্যাত্মবাদীরা আনন্দে উদ্বেল, যেন এই সাদৃশ্য অধ্যাত্মবাদকে বিজ্ঞান-এর শিলমোহর দেবে। পরিবর্তে পল ডেভিসের এ-জাতীয় কল্পনা নির্ভর চিন্তা তাঁকে ‘ধার্মিক-বিজ্ঞানী' হিসেবে চিহ্নিত করছে মাত্র।

 আর এক ঈশ্বর ভক্ত বিজ্ঞানী ক্যাফাটস পদার্থ বিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী হলেও ঈশ্বর চিন্তায় পল ডেভিসের কাছাকাছি তাঁর অবস্থান। ক্যাফাটস তাঁর ‘দি কনসাস ইউনিভার্স’ গ্রন্থে লিখছেন, “যদিও আমরা আমাদের বোধের গভীরে ‘সমগ্র'-এর অন্তর্নিহিত ঐক্যকে বুঝতে পারি, বা অনুভব করতে পারি [অর্থাৎ, লেখক ও তাঁর সমমানসিকতার মানুষরা অনুভব করতে পারেন, তাঁদের আত্মা পরমাত্মারই অংশ। এই ‘আত্মা-পরমাত্মা' ব্যাপারটা তাঁদের কাছে শুধুমাত্র মানসিকভাবে অনুভবের বিষয়। এমনই অনুভবের মধ্য দিয়েই মানসিক কারণে কত যে শারীরিক অসুখ হয়, অলীক-দর্শন, অলীক-শ্রবণ ইত্যাদি সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, শুধু এই নিয়েই একটা বড় বই লিখে ফেলা যায়। এবং লেখার ইচ্ছেও অবশ্য রয়েছে।] কিন্তু বিজ্ঞানে শুধুমাত্র বিভিন্ন 'অংশ’-এর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েই আলোচনা করা সম্ভব। অবিভাজ্য-পূর্ণ যা থেকে অংশের জন্ম, সেই পূর্ণ সম্পর্কে বিজ্ঞান কিছুই বলতে পারে না [পূর্ণ = পরমাত্মা সম্পর্কে অনুভব ছাড়া কোনও প্রমাণই যখন নেই, তখন বিজ্ঞান 'পূর্ণ' সম্পর্কে কিছু বলবে—প্রত্যাশা রাখাটাই পাগলামী।]

 ক্যাফাটস-এর এই উক্তিকে টপ্ করে লুফে নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশন তাঁদের মুখপত্র 'উদ্বোধন’-এর ৯৬তম বর্ষের ৩য় সংখ্যায় ক্যাফাটস-এর উল্লিখিত অংশটি তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা হিসেবে লিখছে, “যাঁরা বেদান্ত পড়েছেন বা ‘কথামৃত’ পড়েছেন তাঁরাই লক্ষ্য করবেন যে, বেদান্তের ব্রহ্ম বর্ণনা (“সর্বং খন্বিদং ব্রহ্ম”) বা শ্রীরামকৃষ্ণ সাধারণ লোককে বোঝাবার জন্য যেভাবে ব্রহ্মের কথা বলেছেন (“ব্রহ্ম বাক্য মনের অতীত, ব্রহ্ম যে কি, তা মুখে বলা যায় না।”), তার সঙ্গে আধুনিক পদার্থবিদদের 'পূর্ণ'-এর বর্ণনার বিশেষ সাদৃশ্য আছে।”

 আর এক পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্রিটজফ কাপরা ‘দি টাও অফ ফিজিক্স’ গ্রন্থে পরমাণুর নড়া-চড়া বা কম্পনের মধ্যে নটরাজের নৃত্যকে অনুভব করার

১৪৪