পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৩৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।


ছড়ানাে। দেয়াশালাই ধরাইয়া বিনয় তেলের শেজ জ্বালাইল— শেজের উপর বেহারার করকোষ্ঠী নানা চিহ্নে অঙ্কিত। লিখিবার টেবিলের উপর যে একটা সাদা কাপড়ের আবরণ আছে তাহার নানান জায়গায় কালী এবং তেলের দাগ। এই ঘরে তাহার প্রাণ যেন হাঁপাইয়া উঠিল। মানুষের সঙ্গ এবং স্নেহের অভাব আজ তাহার বুক যেন চাপিয়া ধরিল। দেশকে উদ্ধার, সমাজকে রক্ষা, এই-সমস্ত কর্তব্যকে সে কোনােমতেই স্পষ্ট এবং সত্য করিয়া তুলিতে পারিল না— ইহার চেয়ে ঢের সত্য সেই অচিন পাখি যে একদিন শ্রাবণের উজ্জ্বল সুন্দর প্রভাতে খাঁচার কাছে আসিয়া আবার খাঁচার কাছ হইতে চলিয়া গেছে। কিন্তু সেই অচিন পাখির কথা বিনয় কোনােমতেই মনে আমল দিবে না, কোনােমতেই না। সেইজন্য মনকে আশ্রয় দিবার জন্য, যে আনন্দময়ীর ঘর হইতে গোরা তাহাকে ফিরাইয়া দিয়াছে সেই ঘরটির ছবি মনে আঁকিতে লাগিল।

 পঙ্খের-কাজ-করা উজ্জ্বল মেজে পরিষ্কার তক্ তক্ করিতেছে; এক ধারে তক্তপােশের উপর সাদা রাজহাঁসের পাখার মতাে কোমল নির্মল বিছানা পাতা রহিয়াছে; বিছানার পাশেই একটা ছােটো টুলের উপর রেড়ির তেলের বাতি এতক্ষণে জ্বালানাে হইয়াছে; মা নিশ্চয়ই নানা রঙের সুতা লইয়া সেই বাতির কাছে ঝুকিয়া কাঁথার উপর শিল্পকাজ করিতেছেন, লছমিয়া নীচে মেজের উপর বসিয়া তাহার বাঁকা উচ্চারণের বাংলায় অনর্গল বকিয়া যাইতেছে, মা তাহার অধিকাংশই কানে আনিতেছেন না। মা যখন মনে কোনাে কষ্ট পান তখন শিল্পকাজ লইয়া পড়েন— তাঁহার সেই কর্মনিবিষ্ট স্তব্ধ মুখের ছবির প্রতি বিনয় তাহার মনের দৃষ্টি নিবদ্ধ করিল ; সে মনে মনে কহিল, “এই মুখের স্নেহদীপ্তি আমাকে আমার সমস্ত মনের বিক্ষেপ হইতে রক্ষা করুক। এই মুখই আমার মাতৃভূমির প্রতিমাস্বরূপ হউক, আমাকে কর্তব্যে প্রেরণ করুক এবং কর্তব্যে দৃঢ় রাখুক। তাঁহাকে মনে মনে একবার ‘মা’ বলিয়া ডাকিল এবং কহিল, ‘তােমার অন্ন যে আমার অমৃত নয়, এ কথা কোনাে শাস্ত্রের প্রমাণেই স্বীকার করিব না।’

২৯