পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪৮১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


 সুচরিতা কহিল, “বিনয় ব্রাহ্ম না হলে কোন্ মতে বিয়ে হবে?”

 পরেশ কহিলেন, “হিন্দুমতে।”

 সুচরিতা সবেগে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, “না না, আজকাল এ-সব কী কথা হচ্ছে! এমন কথা মনেও আনা উচিত নয়। শেষকালে ঠাকুরপুজো করে ললিতার বিয়ে হবে! এ কিছুতেই হতে দিতে পারব না।”

 গােরা নাকি সুচরিতার মন টানিয়া লইয়াছে, তাই সে আজ হিন্দুমতে বিবাহের কথায় এমন একটা অস্বাভাবিক আক্ষেপ প্রকাশ করিতেছে। এই আক্ষেপের ভিতরকার আসল কথাটা এই যে, পরেশকে সুচরিতা এক জায়গায় দৃঢ় করিয়া ধরিয়া বলিতেছে, ‘তােমাকে ছাড়িব না। আমি এখনাে তােমার সমাজের, তােমার মতের, তােমার শিক্ষার বন্ধন কোনোমতেই ছিঁড়িতে দিব না।’

 পরেশ কহিলেন, “বিবাহ-অনুষ্ঠানে শালগ্রামের সংস্রব বাদ দিতে বিনয় রাজি হয়েছে।”

 সুচরিতা চৌকির পিছন হইতে আসিয়া পরেশের সম্মুখে চৌকি লইয়া বসিল। পরেশ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এতে তুমি কী বল?”

 সুচরিতা একটু চুপ করিয়া কহিল, “আমাদের সমাজ থেকে ললিতাকে তা হলে বেরিয়ে যেতে হবে।”

 পরেশ কহিলেন, “এই কথা নিয়ে আমাকে অনেক চিন্তা করতে হয়েছে। কোনো মানুষের সঙ্গে সমাজের যখন বিরােধ বাধে তখন দুটো কথা ভেবে দেখবার আছে, দুই পক্ষের মধ্যে ন্যায় কোন্ দিকে এবং প্রবল কে। সমাজ প্রবল তাতে সন্দেহ নেই; অতএব বিদ্রোহীকে দুঃখ পেতে হবে। ললিতা বারম্বার আমাকে বলছে, দুঃখ স্বীকার করতে সে যে শুধু প্রস্তুত তা নয়, এতে সে আনন্দ বােধ করছে। এ কথা যদি সত্য হয় তা হলে অন্যায় না। দেখলে আমি তাকে বাধা দেব কী করে!”

 সুচরিতা কহিল, “কিন্তু, বাবা, এ কিরকম হবে!”

 পরেশ কহিলেন, “জানি এতে একটা সংকট উপস্থিত হবে। কিন্তু

৪৭১