পাতা:গৌড়রাজমালা.djvu/৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
গৌড়াধিপ শশাঙ্ক।

মালব-রাজ কান্যকুব্জে উপনীত হইয়া, যুদ্ধে গ্রহবর্ম্মাকে নিহত এবং রাজপুরী অধিকৃত করিয়া, তদীয় পত্নী, স্থানীশ্বররাজ-দুহিতা রাজ্যশ্রীকে, লৌহশৃঙ্খলাবদ্ধ-চরণে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়া, স্থানীশ্বর অভিমুখে যাত্রা করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। এই দুঃসংবাদ পাইবামাত্র, প্রভাকর-বর্দ্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যবর্দ্ধন দশ সহস্ৰ অশ্বারোহী লইয়া, মালব-রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-যাত্রা করিয়া, সহজেই মালব-সৈন্যের পরাভব সাধন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু এই বিজয়ের শ্রান্তি দূর হইতে না হইতে, ভগিনীর কারা-মোচনের পূর্ব্বেই, তিনি প্রবলতর প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। এই অভিনব প্রতিদ্বন্দ্বী—“গৌড়াধিপ” শশাঙ্ক[১]

 শশাঙ্কের পূর্ব্ব ইতিহাস সম্বন্ধে আমরা এতই অজ্ঞ যে তাঁহার এবং তাঁহার প্রতিষ্ঠিত গৌড়-রাজ্যের অভ্যুদয় নির্মেঘ-গগনে বিদ্যুৎ-প্রভার ন্যায় একেবারে আকস্মিক বলিয়া প্রতিভাত হয়। “হর্ষচরিত”-প্রণেতা বাণভট্ট শশাঙ্ককে “গৌড়াধিপ”, “গৌড়” এবং কখনও বা বিদ্বেষ-বশত “গৌড়াধম” এবং “গৌড়-ভুজঙ্গ” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইউয়ান্ চোয়াং “কর্ণসুবর্ণের রাজা” বলিয়া শশাঙ্কের পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। সংস্কৃত অভিধানে “গৌড়” শব্দের পর্য্যায়ে “পুণ্ড্র”, “বরেন্দ্রী" এবং “নীবৃতি” উল্লিখিত রহিয়াছে।[২] গৌড়ে বা বরেন্দ্র-দেশে শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছিল বলিয়াই, বোধ হয়, তিনি “গৌড়াধিপ” উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার রাজধানী “কর্ণসুবর্ণ” রাঢ়দেশে, [মুর্শিদাবাদ-নগরের ১২ মাইল ব্যবধানে] অবস্থিত ছিল বলিয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে। যিনি কর্ণসুবর্ণ হইতে কান্যকুব্জ জয়ার্থ যাত্রা করিতে সাহসী হইয়াছিলেন, তিনি যে পূর্ব্বেই বঙ্গ অধিকার করিয়াছিলেন, এবং মগধ ও মিথিলায় প্রাধান্য-স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহা নিঃসন্দেহে অনুমান করা যাইতে পারে। সাহাবাদ জেলার অন্তর্গত রোটাস্-গড়ে প্রাপ্ত একটি পাষাণ-নির্ম্মিত মুদ্রার ছাঁচে “মহাসামন্ত শশাঙ্কদেব” উৎকীর্ণ দেখিয়া, কোন কোন পণ্ডিত মনে করেন,—ইহা গৌড়াপিপ-শশাঙ্কের মুদ্রার ছাঁচ। এই অনুমান সত্য হইলে, মনে করিতে হইবে, শশাঙ্ক প্রথমে কোনও সার্ব্বভৌম নরপালের সামন্তশ্রেণী-ভুক্ত ছিলেন; এবং ষষ্ঠ শতাব্দের শেষভাগে, যে সুযোগে পশ্চিমদিকে স্থানীশ্বরের প্রভাকর-বর্দ্ধন এক অভিনব সাম্রাজ্যের ভিত্তি-স্থাপন করিয়াছিলেন, সেই সুযোগে, পূর্ব্বদিকে “লৌহিত্য-নদের উপকণ্ঠ হইতে গহনতালবনাচ্ছাদিত মহেন্দ্ৰ-গিরির উপত্যকা” পর্য্যন্ত

    যশোধর্ম্মের নামান্তর, এবং গোপচন্দ্র দ্বিতীয় কুমারগুপ্তের পুত্র। The evidence of the Faridpur Grants নামক এসিয়াটিক্ সোসাইটীর জর্ণেলে প্রকাশার্থ প্রবন্ধে বন্ধুবর শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নানাবিধ যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করিতে যত্ন করিয়াছেন,—এই চারিখানি তাম্রশাসনই জাল বা কূট-শাসন। রাখাল বাবু প্রাচীন লিপিতত্ত্বে বিশেষ পারদর্শী এবং তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী ডাঃ হর্ণলি এই ক্ষেত্রে একজন মহারথী। এই উভয় বিশেষজ্ঞের মধ্যে উপস্থিত তর্কের মীমাংসা না হইলে, এই সকল তাম্রশাসন হইতে ইতিহাসের উপাদান সঙ্কলন সুকঠিন।

  1. বাণভট্ট প্রণীত “হর্ষচরিতষষ্ঠ উচ্ছ্বাস
  2. “पुण्ड्राः स्यु र्वरेन्द्री-गौड़-नीवृति” इति त्रिकाण्डशेषः।