পাতা:দুই বোন - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৩৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


পঞ্চম পত্র তাকে কোন দিকে তার ঠিকানা নেই। আপনাকে আপন সর্বাঙ্গে সর্বাস্তাকরণে ভরপুর মেলে দিয়ে বসে আছি, নিবিড় তরুপল্লবের শু্যামলতায় আবিষ্ট রোদ-পোয়ানো ওই ছোটো দ্বীপটির মতো । আমার মধ্যে এই ঘনীভূত অনুভবটিকে বলা যেতে পারে হওয়ার আনন্দ ৷ রূপে রঙে আলোয় ধ্বনিতে আকাশে অবকাশে ভরে ওঠা একটি মূর্তিমান সমগ্রতা আমার চিত্তের উপরে ঘা দিয়ে বলছে ‘আছি’ ; তারই জগতে আমার চৈতন্য উছলে উঠছে ; সমুদ্রকল্লোলেরই মতো একতান শব্দ জাগছে, ওম, অর্থাৎ এই-যে আমি। বিরাট একটা না, হা-করা তার মুখগহ্বর, প্রকাণ্ড তার শূন্ত— তারই সামনে ওই নারকেলগাছ দাড়িয়ে, পাতা নেড়ে নেড়ে বলছে, এই-যে আমি । তুঃসাহসিক সত্তার এই স্পর্ধা গভীর বিস্ময়ে বাজছে আমার মনে, আর ধীরেন ওই-যে ভৈরবীতে মীড় লাগিয়েছে সেও যেন বিশ্বসত্তার আত্মঘোষণা, আপন কম্পমান সুরের ধ্বজাটিকে অসীম শূন্যের মাঝখানে তুলে ধরেছে। এই তো হল ‘হওয়া’। এইখানেই শেষ নেই। এর সঙ্গে আছে করা । সমুদ্র আছে অন্তরে অন্তরে নিস্তব্ধ, কিন্তু তার উপরে উপরে উঠছে ঢেউ, চলছে জোয়ার ভাটা । জীবনে করার বিরাম নেই। এই করার দিকে কত প্রয়াস, কত উপকরণ, কত আবর্জনা । এরা সব জমে জমে কেবলই গণ্ডি হয়ে ওঠে, দেয়াল হয়ে দাড়ায় । এরা বাহিরে সমগ্রতার ক্ষেত্রকে, অস্তরে পরিপূর্ণতার উপলব্ধিকে, টুকরো টুকরো করতে থাকে। অহমিকার উত্তেজনায় কর্ম উদ্ধত হয়ে, একান্ত হয়ে, আপনাকে সকলের আগে ঠেলে তোলে ; হওয়ার চেয়ে করা বড়ো হয়ে উঠতে চায়। এতে ক্লাস্তি, এতে অশান্তি, এতে মিথ্যা। বিশ্বকৰ্মার বঁাশিতে নিয়তই যে ছুটির সুর বাজে এই কারণেই সেটা শুনতে পাই নে ; সেই ছুটির মুরেই বিশ্বকাজের ছন্দ বাধা । ૨૯: