পাতা:দেবী চৌধুরানী - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.djvu/১৫৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তৃতীয় খণ্ড-চতুর্দশ পরিচ্ছেদ $80 - কোন্দল করিতে আসিত না। বরং প্রফুল্লের ভয়ে আর কাহারও সঙ্গে কোন্দল করিতে সাহস করিত না। প্রফুল্লের পরামর্শ ভিন্ন কোন কাজ করিত না। দেখিল, নয়নতারার ছেলেগুলিকে প্রফুল্ল যেমন যত্ন করে, নয়নতারা তেমন পারে না। নয়নতারা প্রফুল্লের হাতে ছেলেগুলি সমর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইল। সাগর বাপের বাড়ী অধিক দিন থাকিতে পারিল না—আবার আসিল । প্রফুল্লের কাছে থাকিলে সে যেমন সুখী হইত, এত আর কোথাও হইত না। এ সকল অন্যের পক্ষে আশ্চৰ্য্য বটে, কিন্তু প্রফুল্লের পক্ষে আশ্চৰ্য্য নহে। কেন না, প্রফুল্ল নিষ্কাম ধৰ্ম্ম অভ্যাস করিয়াছিল। প্রফুল্প সংসারে আসিয়াই যথার্থ সন্ন্যাসিনী হুইয়াছিল। তার কোন কামনা ছিল না—কেবল কাজ খুজিত। কামনা অর্থে আপনার সুখ খোজা—কাজ অর্থে পরের মুখ খোজা। প্রফুল্ল নিষ্কাম অথচ কৰ্ম্মপরায়ণ, তাই প্রফুল্ল যথার্থ সন্ন্যাসিনী। তাই প্রফুল্ল যাহা স্পর্শ করিত, তাই সোনা হইত। প্রফুল্ল ভবানী ঠাকুরের শাণিত অস্ত্র— সংসার-গ্রস্থি অনায়াসে বিচ্ছিন্ন করিল। অথচ কেহই হরবল্লভের গৃহে জানিতে পারিল না যে, প্রফুল্ল এমন শাণিত অস্ত্র। সে যে অদ্বিতীয় মহামহোপাধ্যায়ের শিন্যা—নিজে পরম পণ্ডিত— সে কথা দূরে থাক, কেহ জানিল না যে, তাহার অক্ষর-পরিচয়ও আছে। গৃহধৰ্ম্মে বিদ্যা প্রকাশের প্রয়োজন নাই। গৃহধৰ্ম্ম বিদ্বানেই সুসম্পন্ন করিতে পারে বটে, কিন্তু বিদ্যা প্রকাশের স্থান সে নয়। যেখানে বিদ্যা প্রকাশের স্থান নহে, সেখানে যাহার বিদ্যা প্রকাশ পায়, সেই মূখ। যাহার বিদ্যা প্রকাশ পায় না, সেই যথার্থ পণ্ডিত। - প্রফুল্লের যাহা কিছু বিবাদ, সে ব্রজেশ্বরের সঙ্গে। প্রফুল্ল বলিত, “আমি এক তোমার স্ত্রী নহি । তুমি যেমন আমার, তেমনি সাগরের, তেমনি নয়ান বৌয়ের। আমি একা তোমায় ভোগ-দখল করিব না। স্ত্রীলোকের প্রতি দেবতা; তোমাকে ওরা পূজা করিতে পায় না কেন ?” ব্ৰজেশ্বর তা শুনিত না। ব্রজেশ্বরের হৃদয় কেবল প্রফুল্লময়। প্রফুল্ল বলিত, “আমায় যেমন ভালবাস, উহাদিগকেও তেমনি ভাল না বাসিলে, আমার উপর তোমার ভালবাসা সম্পূর্ণ হইল না। ওরাও আমি।” ব্ৰজেশ্বর তা বুঝিত না । প্রফুল্লর বিষয়বুদ্ধি, বুদ্ধির প্রাথর্য্য ও সদ্বিবেচনার গুণে, সংসারের বিষয়কৰ্ম্মও তাহার হাতে আসিল । তালুক মুলুকের কাজ বাহিরে হইত বটে, কিন্তু একটু কিছু বিবেচনার কথা উঠিলে, কৰ্ত্ত আসিয়া গিল্পীকে বলিতেন, নুতন বোমাকে জিজ্ঞাসা কর দেখি, তিনি কি বলেন?” প্রফুল্লের পরামর্শে সব কাজ হইতে লাগিল বলিয়া, দিন দিন লক্ষ্মী-শ্ৰী বাড়িতে লাগিল। শেষ যথাকালে ধন জন ও সৰ্ব্বমুখে পরিবৃত হইয়া হরবল্লভ পরলোকে গমন করিলেন । - ર૪