পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১০১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


53 সবিশেষ বৃত্তান্ত বলিল – বলিল যে, “আমি সেই দস্থ্যর গৃহ দেখাইয়া দিতে পারি।” আমিয়ট সাহেবের মুখ প্রফুল্প হইল—কুঞ্চিত ক্র ঋজু হইল—তিনি চারি জন সিপাহী এবং এক জন নাএককে বকাউল্লার সঙ্গে যাইতে অনুমতি করিলেন। বলিলেন যে, "রাত্মাদিগকে ধরিয়া আমার নিকটে লইয়া আইস • বকাউল্লা কহিল, -“তবে দুই জন ইংরেজ সঙ্গে দিউন— প্রতাপ রায় সাক্ষাৎ সয়তান –এ দেশীয় লোক তাহাকে ধরিতে পারিবে না ।" গলুণ্ঠন ও জমৃসন নামক দুই জন ইংরেজ অমিয়টের আজ্ঞামত বকাউল্লার সঙ্গে সশস্ত্রে ঢলিলেন । গমনকালে গল্‌ষ্টন্‌ বকাউল্লাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি সে বাড়ীর মধ্যে কখনও গিয়াছিলে ?” বকাউল বলিল, “ন৷ ” গল্‌ষ্টন জনসনকে বলিলেন, “তবে বাতি ও দেশলাইও লও। হিন্দু তেল পোড়ায় ন-খরচ হুইবে ।" - জনসন পকেটে বাতি ও দীপশলাক। গ্রহণ করিলেন । র্তাহারা তখন ইংরেজদিগের রণযাত্রার গভীর পদনিক্ষেপে রাজপথ বহিয়া চলিলেন । কেহ কথা কহিল না । পশ্চাৎ পশ্চাৎ ঢারি জন সিপাহী, না এক ও বকাউল্ল চলিল । নগরপ্রহরিগণ পথে তাহাদিগকে দেখিয়া ভীত হইয়। সরিয়া দাড়াইল । গলষ্টন ও জনৃসন সিপাহী লইয়। প্রতাপের বাসার সম্মুখে নিঃশব্দে আসিয়া দ্বারে ধীরে ধীরে করাঘাত করিলেন । রাম চরণ উঠিয়া দ্বার খুলিতে আসিল । রামচরণ অদ্বিতীয় ভৃত্য । পা টিপিতে, গা টিপিতে তৈল মাখাইতে সুশিক্ষিত হস্ত । বস্ত্ৰকুঞ্চনে অঙ্গরাগকরণে বড় পটু। রামচরণের মত ফরাশ নাই—তাহার মত দ্রব্যক্রেতা দুল্লভ । কিন্তু এ সকল সামান্ত গুণ । রামচরণ লাঠিবাজিতে মুরশিদাবাদপ্রদেশে প্রসিদ্ধ— অনেক হিন্দু ও যবন তাহার হস্তের গুণে ধরাশয়ন করিয়াছিল । বন্দুকে রামচরণ কেমন অভ্রাস্তলক্ষ্য এবং ক্ষিপ্ৰহস্ত, তাহার পরিচর ফষ্টরের শোণিতে গঙ্গাজলে লিখিত হইয়াছিল । কিন্তু এ সকল অপেক্ষ রামচরণের আর একটি সময়োপযোগী গুণ ছিল—ধূৰ্ত্ততা । রামচরণ শৃগালের মত ধূৰ্ত্ত । অথচ অদ্বিতীয় প্রভুভক্ত এবং বিশ্বাসী । রামচরণ দ্বার খুলিতে আসিয়া ভাবিল, ‘এখন ফুয়ারে যা দেয় কে ? ঠাকুর মশায় বোধ হয় ; কিন্তু যা হোক, একটা কাণ্ড করিয়া আসিয়াছি—রাত্রিকালে না দেখিয়া দুয়ার খোলা হক্টবে না।’ করিয়া—ইণ্ডিল মিণ্ডিলে যে ২৭ এই ভাবিয়া রামচরণ নিঃশব্দে আসিয়া কিয়ৎক্ষণ দ্বারের নিকট দাড়াইয়া শব্দ শুনিতে লাগিল। শুনিল, দুই জনে অস্ফুটস্বরে একটা বিকৃতভাষায় কথা কছি তেছে—রামচরণ তাহাকে ‘ইণ্ডিল-মিণ্ডিল’ বলিত— এখনকার লোক বলে, ইংরেজি । রামচরণ মনে মনে বলিল, “রসো বাবা ! দুয়ার খুলি ত বন্দুক হাতে বিশ্বাস করে, সে শু্যালা ।” রামচরণ আরও ভাবিল, “বুঝি একটা বন্দুকের কাজ নয়, কৰ্ত্তাকেও ডাকি । এষ্ট ভাবিয়। রামচরণ প্রতাপকে ডাকিবার অভিপ্রায়ে দ্বার হইতে ফিরিল। এই সময়ে ইংরেজদিগেরও ধৈর্য্য ফুরাইল । জনৃসমৃ বলিল, “অপেক্ষ কেন, লাথি মার, ভারতবর্ষীয় কবাট ইংরেজি লাথিতে টিকিবে না ।" গল্‌ষ্টন্‌ লাথি মারিল । দ্বার খড় খড়, ছড়াছড়, ঝনৃঝন্‌ করিয়া উঠিল ; রামচরণ দৌড়িল । শব্দ প্রতাপের কানে গেল। প্রতাপ উপর হইতে সোপান অবতরণ করিতে লাগিলেন । সেবার কবাট ভাঙ্গিল না । পরে জনৃসন লাথি মারিল । পড়িয়া গেল । - “এইরূপে ব্রিটিশ পদাঘাতে সকল ভারতবর্ষ ভাঙ্গিয় পডুক", বলিয়া ইংরেজেরা গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন । সঙ্গে সঙ্গে সিপাহীগণ প্রবেশ করিল। সিড়িতে রামচরণের সঙ্গে প্রতাপের সাক্ষাৎ হইল । রামচরণ চুপি চুপি প্রতাপকে বলিল, “অন্ধকারে লুকাও —ইংরেজ আসিয়াছে—বোধ হয়, আমবাতের কুঠী কবাট ভাঙ্গিয়া থেকে ” রামচরণ অমিয়টের পরিবর্তে আমবাত বলিত । প্র । ভয় কি ? রী । আট জন লোক । প্র । আপনি লুকাইয়া থাকিব—আর এই বাড়ীতে যে কয় জন স্ত্রীলোক আছে, তাহাদের দশা কি হইবে ? তুমি আমার বন্দুক লইয়া আইস । রামচরণ যদি ইংরেজদিগের বিশেষ পরিচয় জানিত, তবে প্রতাপকে কখনই লুকাইতে বলিত না । তাহারা যতক্ষণ কথোপকথন করিতেছিল, ততক্ষণে সহসা গৃহ আলোকে পূর্ণ হইল। জনসন জালিত বৰ্ত্তিক এক জন সিপাহীর হস্তে দিলেন। বৰ্ত্তিকার আলোকে ইংরেজেরা দেখিল, সিড়ির উপর দুই জন লোক দাড়াইয়া আছে। জনসন বকাউল্লাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন এই ?"