পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১১৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88 অৰ্দ্ধনিদ্রাভিভূত, অৰ্দ্ধজাগ্ৰদবস্থায় রহিল । উপলখণ্ড সকলে পৃষ্ঠদেশ ব্যথিত হইতেছিল। সম্পূর্ণরূপে চৈতন্য বিলুপ্ত হইলে, শৈবলিনী দেখিল, সম্মুখে এক অনস্তবিস্তৃতা নদী। কিন্তু নদীতে জল নাই—দুই কুল প্লাবিত করিয়া রুধিরের স্রোতঃ বহিতেছে। তাহাতে অস্থি-গলিত নরদেহ, নৃমুণ্ড, কঙ্কালাদি ভাসিতেছে । কুম্ভীরাকৃতি জীবসকল চৰ্ম্মমাংসাদিবর্জিত—কেবল অস্থি ও বৃহৎ ভীষণ উজ্জ্বল চক্ষুদ্ব বিশিষ্ট—ইতস্ততঃ বিচরণ করিয়া, সেই সকল গলিত শব ধরিয়া খাইতেছে । শৈবলিনী দেখিল যে, ষে মহাকায় পুরুষ তাহাকে পৰ্ব্বত হইতে ধৃত করিয়া আনিয়াছে, সেই আবার তাহাকে ধৃত করিয়া সেই নদীতীরে আনিয়া বসাইল । সে প্রদেশে রৌদ্র নাই, জ্যোৎস্না নাই, তারা নাই, মেঘ নাই, আলোকমাত্র নাই, অথচ অন্ধকার নাই । সকলই দেখা যাইতেছে –কিন্তু অস্পষ্ট । রুধিরের নদী, গলিত শব, স্রোতোবাহিত কঙ্কালমাল, অস্থিময় কুম্ভীরগণ সকলষ্ট ভীষণান্ধকারে দেখা যাইতেছে। নদীতীরে বালুক নাই -তৎপরিবর্তে লৌহস্থচ সকল অগ্রভাগ উদ্ধ করিয়া রহিয়াছে। শৈবলিনীকে মহাকায় পুরুস সেইখানে বসাইয়। নদী পার হইতে বলিলেন । পারের কোন উপায় নাই । নৌকা নাই, সেতু নাই । মঙ্গাকায় পুরুষ বলিলেন, “সঁতার দিয়া পার হ তুই সাতার জানিস —গঙ্গায় প্রতাপের সঙ্গে অনেক সাতার দিয়াছিস্ " শৈবলিন এই রুধিরের নদীতে কি প্রকারে স; তার দিবে ? মহাকায় পুরুষ তখন হস্তস্থিত বের প্রহাল জঙ্গ উথি ত করিলেন । শৈবলিনা সভয়ে দেখিল যে, সেই বেত্ৰ জলন্ত লোহিত লৌহনিৰ্ম্মি ত ৷ শৈবলিনীর বিলম্ব দেখিয়। মহাকায় পুরুষ শৈবলিনীর পৃষ্ঠে বেরাঘাত করিতে লাগিলেন। শৈবলিনী প্ৰহারে দগ্ধ হইতে লাগিল । শৈবলিনী প্রচার সহা করিতে ন পারিয়া রুপিরের নদীতে ঝাপ দিল । অমনি অস্থিময় কুষ্ঠার সকল তাহাকে ধরিতে আসিল, কিন্তু ধরিল না । শৈবলিনা সাভার দিয়া চলিল ; রুপির-স্রোত বদনমধ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল । মহাকায় পুরুষ তাকার সঙ্গে সঙ্গে রুধিরস্রোতের উপর দিয়া পদব্রজে চলিলেন –ভুবিলেন না । মধ্যে মধ্যে পূতিগন্ধবিশিষ্ট গলিত শব ভাসিয়৷ আসিয়া শৈবলিনীর গাত্রে লাগিতে লাগিল । এইরূপে শৈবলিনী পরপারে উপস্থিত হইল ; সেখানে কুলে উঠিয়া চাহিয়া দেখিয়া “রক্ষা কর ” “রক্ষা কর!” বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। সম্মুখে যাহা দেখিল, তাহার সীমা নাই, আকার নাই, বর্ণ নাই, নাম নাই। তথায় আলোক অতি ক্ষীণ, কিন্তু এতাদৃশ গুহাতলস্থ বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী উত্তপ্ত যে, তাহ চক্ষে প্রবেশমাত্র শৈবলিনীর চক্ষু বিদীর্ণ হইতে লাগিল—বিষসংযোগে যেরূপ জালা সম্ভব, চক্ষে সেইরূপ জালা ধরিল । নাসিকায় এরূপ ভয়ানক পূতিগন্ধ প্রবেশ করিল যে, শৈবলিনী নাসিকা আবৃত করিয়াও উন্মত্তার দ্যায় হইল । কণে অতি কঠোর কর্কশ ভয়াবহ শব্দ সকল এককালে প্রবেশ করিতে লাগিল—হৃদয়বিদারক আৰ্ত্তনাদ, পৈশাচিক হাস্ত, বিকট হুঙ্কার, পৰ্ব্বতবিদারণ, অশনিপতন, শিলাঘর্ষণ, জলকল্লোল, অগ্নিগর্জন, মুমুঘর ক্ৰদন সকলই এককালে শ্রবণ বিদীর্ণ করিতে লাগিল । সম্মুখ হইতে ক্ষণে ক্ষণে ভামনাদে এরূপ প্রচণ্ড বায়ু বহিতে লাগিল যে, তাহাতে শৈবলিনীকে অগ্নিশিখার দ্যায় দগ্ধ করিতে লাগিল । কখনও বা শীতে শতসহস্র ছুরিকাঘাতের ন্যায় অঙ্গ ছিন্নবিছিন্ন করিতে লাগিল । শৈবলিনী ডাকিতে লাগিল, “প্রাণ যায় রক্ষা কর!” তখন অসহ পূতিগন্ধবিশিষ্ট এক বৃহৎ কদৰ্য্য কীট আসিয়া শৈবলিনীর মুখে প্রবেশ করিতে প্রবৃত্ত হইল । শৈবলিন তখন চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, “রক্ষ কর । এ নরক । এখান হইতে উদ্ধারের কি উপায় নাই ?” মহাকায় পুরুষ বলিলন, “আছে ।" স্বপ্লাবস্থায় আত্মকত চীৎকারে শৈবলিনীর মোহনিদ্র। ভঙ্গ হইল । কিন্তু তখন ও লাস্তি যায় নাই-পুষ্ঠে প্রস্তর ফুটিহেছে । শৈবলিন: ভ্ৰান্তিবশে জাগ্রতেও ডাকিয় ধ{লল, “আমার কি হবে ? অামার উদ্ধপুরর কি উপায় নাই ?" গুeামধ। শুষ্টতে গগু:র শব্দ হইল, “আছে ।" এ পি এ ? শৈবলিনা কি সত্য সত্যক্ট নরকে ? শৈপলিন বিস্মিত, বিমুগ্ধ, ভীগুচিন্তে জিজ্ঞাস করিল, “কি উপায় ?” গুইমপ্য ইষ্টতে উত্তর হইল, “দ্বাদশবাৰ্যিক ব্ৰত অবলম্বন কর ।” এ কি দৈববাণী ? শৈবলিণ। কাতর হইয়। বলিতে লাগিল, “কি সে রত ? কে আমায় শিখাইবে ?" উত্তর । আমি শিখাইল । শৈব । তুমি কে ? উত্তর । ব্রত গ্রহণ কর । শৈ । কি করিব ? উত্তর । তোমার ও চরবাস ত্যাগ করিয়া আমি যে বসন দিই, তাই পর। হাত বাড়াও । শৈবলিন হাত বাড়াইল । প্রসারিত হস্তের উপর একখণ্ড বস্ত্র স্থাপিত হইল। শৈবলিনী তাছা