পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/১২২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8ના শৈবলিনী কঁাদিতে লাগিল, উচ্চৈঃস্বরে কঁাদিতে কাদিতে চন্দ্রশেখরের চরণে পুনঃপতিত হইয়া বলিল, “এখন আমার দশা কি হইবে ?” চন্দ্রশেখর বলিলেন, “তুমি আমাকে দেখিতে চাহিয়াছিলে কেন ?” শৈবলিনী চক্ষু মুছিল, রোদন সম্বরণ করিল—স্থির হুইয়া বলিতে লাগিল,“বোধ হয় আমি আর অতি অল্প দিন বাচিব ।” শৈবলিনী শিহরিল, স্বপ্নদৃষ্ট ব্যাপার মনে পড়িল—ক্ষণেক কপালে হাত দিয়া নীরব থাকিয়! আবার বলিতে লাগিল—“অল্পদিন বাচিব—মরিবার আগে তোমাকে একবার দেখিতে সাধ হইয়াছিল । এ কথায় কে বিশ্বাস করিবে ? কেন বিশ্বাস করিবে ? ষে ভ্রষ্টা হইয়া স্বামী ত্যাগ করিয়৷ আসিয়াছে, তাহার আবার স্বামী দেখিতে সাধ কি ? শৈবলিনী কাতরতার বিকট হাসি হাসিল । চন্দ্র । তোমার কথায় অবিশ্বাস নাই – আমি জানি, তোমাকে বলপূৰ্ব্বক ধরিয়৷ আনিয়াছিল । শৈ। সে মিথ্যা কথা ; আমি ইচ্ছাপূৰ্ব্বক ফষ্টরের সঙ্গে চলিয়া আসিয়াছিলাম ! ডকাইতির পূৰ্ব্বে ফষ্টর আমার নিকট লোক প্রেরণ করিয়াছিল । চন্দ্রশেখর অধোবদন হইলেন । ধীরে ধীর শৈবলিনীকে পুনরপি শুয়াষ্টলেন ; ধীরে ধীরে গাত্রোথান করিলেন, গমনোন্মুখ হইয়া মুছমধুরস্বরে বলিলেন, “শৈবলিনী! দ্বাদশ বৎসর প্রায়শ্চিন্ত কর। উভয়ে বাচিয়া থাকি, তবে প্রায়শ্চিত্তান্তে আবার সাক্ষাৎ হুইবে । এক্ষণে এই পৰ্য্যস্ত " শৈবলিনী হাত যোড় করিল ;–বলিল, “আর একবার বসে। বোধ হয়, প্রায়শ্চিন্তু আমার অদৃষ্টে নাই ।” আবার সেই স্বপ্ন মনে পড়িল—“ধসে{—তোমায় ক্ষণেক দেখি।" চন্দ্রশেখর বসিলেন । শৈবলিনা জিজ্ঞাসা করিল, “আত্মহত্যায় পাপ আছে কি ?” শৈবলিনী স্থিরদৃষ্টিতে চন্দ্রশেখরের প্রতি চাহিয়া ছিল, তাহার প্রফুল্ল নয়নপদ্ম জলে ভাসিতে ছিল । চন্দ্র ৷ আছে । কেন মরিতে চা ৪ ? শৈবলিনী শিহরিল । বলিল, “মরিতে পারিব না সেই নরকে পড়িব ।" চন্দ্র । প্রায়শ্চিত্ত করিলেই নরক হইতে উদ্ধার হুইবে । শৈ। এ মনোনরক হইতে উদ্ধারের প্রায়শ্চিত্ত কি ? চন্দ্র । সে কি ? - বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী' শৈ । এ পৰ্ব্বতে দেবতারা আসিয়া থাকেন । র্তাহারা আমাকে কি করিয়াছেন, বলিতে পারি না ; —আমি রাত্রিদিন নরক স্বপ্ন দেখি । চন্দ্রশেখর দেখিলেন, শৈবলিনীর দৃষ্টি গুহাপ্রান্তে স্থাপিত হইয়াছে—ষেন দুরে কিছু দেখিতেছে। দেখিলেন, তাহার শীর্ণ বদনমণ্ডল বিশুষ্ক হইল, চক্ষু বিস্ফারিত, পলকরহিত হইল—নাসারন্ধ্র সঙ্কুচিত, বিস্ফারিত হইতে লাগিল—শরীর কণ্টকিত হুইল— কঁাপিতে লাগিল । চন্দ্রশেখর জিজ্ঞাস করিলেন, “কি দেখিতেছ?” শৈবলিনী কথা কহিল না, পুৰ্ব্ববৎ চাহিয়া রছিল। চন্দ্রশেখর জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন ভয় পাইতেছ?” শৈবলিনী প্রস্তরবৎ । চন্দ্রশেখর বিস্থিত হইলেন—অনেকক্ষণ নীরব হইয়া শৈবলিনীর মুখপ্রতি চাহিয়া রছিলেন । কিছুই বুঝিতে পারিলেন না । অকস্মাৎ শৈবলিনী বিকট চাংকার করিয়া উঠিল—“প্ৰভু রক্ষা কর! রক্ষা কর! তুমি আমার স্বামী ! তুমি ন রাখিলে কে রাখে ?” শৈবলিনী মূচ্ছিত হুইয়া ভূতলে পড়িল । - চন্দ্রশেখর নিকটস্থ নিঝর হইতে জল আনিয়! শৈবলিনীর মুখে সিঞ্চন করিলেন, উত্তরায়ের দ্বার ব্যঞ্জন করিলেন । কিছুকাল পরে শৈবলিনা চেতন। প্রাপ্ত হইল ; শৈবলিনা উঠিয়া বসিল । নীরবে বসিয়। কঁদিতে লাগিল । চন্দ্রশেখর বলিলেন, “কি দেখিতেছিলে ?" শৈ । সেই নরক । চন্দ্রশেখর দেপিলেন, জাবনেই শৈবলিনীর নবকভোগ আরম্ভ হইয়াছে । শৈবলিনা ক্ষণপরে বলিল, “আমি মরিতে পারিব না--তামার ঘোরতর নরকের ভয় হইয়াছে, মরিলেই নরকে যাচব, আমাকে বাচিতেই হইবে কিন্তু আমি একাকিনা, আমি দ্বাদশ বৎসঃ কি প্রকারে বাঢ়িব ? আমি চেতনে অচেতনে কেবল নরক দেখিতেছি ।” চন্দ্রশেখর বলিলেন, “চিন্তা নাই—উপবাসে এবং মানসিক ক্লেশে এ সকল উপস্থিত হইয়াছে। বৈদ্যেরা ইহাকে বায়ুরোগ বলেন । তুমি বেদগ্রামে গিয়া গ্রামপ্রাস্তে কুটীর নিৰ্ম্মাণ কর । সেখানে সুনারী আসিয়া তোমার তত্ত্বাবধান করিবেন—চিকিৎসা করিতে পারিবেন ।" সহসা শৈবলিনী চক্ষু মুদিল,—দেখিল, গুহাগ্রাস্তে সুন্দরী দাড়াইয়া, প্রস্তরে উৎকীর্ণী—অঙ্গুলি তুলিয়৷ দাড়াইয়৷ আছে। দেখিল, সুন্দরী অতি দীর্ঘাকৃতা, ক্রমে