পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৭৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শৈবলিনী বাড়িতে লাগিল—সৌন্দর্য্যের ষোলকলা ; পুরিতে লাগিল—কিন্তু বিবাহ হয় না। বিবাহের ব্যয় আছে—কে ব্যয় করে ? সে অরণ্যমধ্যে সন্ধান করিয়া ,"র্কে সে রূপরাশি অমূল্য বলিয়ভুলিয়া লইয়া আসিবে ? পরে শৈবলিনীর জ্ঞান জন্মিতে লাগিল। বুঝিল যে, প্রতাপ ভিন্ন পৃথিবীতে স্থখ নাই। বুঝিল, এ জন্মে প্রতাপকে পাইবার সম্ভাবনা নাই । দুই জনে পরামর্শ করিতে লাগিল। অনেক দিন ধরিয়া পরামর্শ করিল। গোপনে গোপনে পরামর্শ " করে, কেহ জানিতে পারে না । পরামর্শ ঠিক হইলে তুই জনে গঙ্গাস্বানে গেল । গঙ্গায় অনেকে সাতার দিতেছিল। প্রতাপ বলিল,—“আয় শৈবলিনি ! সাতার দিই।" দুই জনেই সাতার দিতে আরম্ভ করিল। সন্তরণে দুই জনেই পটু—তেমন সাতার দিতে গ্রামের কোন ছেলেই পারিত না । বর্ষাকাল –কুলে কুলে গঙ্গার জল—জল ফুলিয়া দুলিয়া, নাচিয় -লাচিয়া, ছুটিয়া চুটিয়া যাইতেছে। দুই জনে সেই জলরাশি ভিন্ন করিয়া, মথিত করিয়া, উৎক্ষিপ্ত করিয়া সাতার দিয়া চলিল ; ফেনচক্রমধ্যে সুন্দর নবীন বপুদ্ধয় রজতাঙ্গুরীয়মধ্যে রত্ন যুগলের ন্যায় শোভিতে লাগিল । সাতার দিতে দিতে ইহার অনেক দূর গেল দেখিয়৷ ঘাটে যাহারী ছিল, তাহার। ডাকিয়া ফিরিতে বলিল । তাহার শুনিল না—চলিল । আবার সকলে ডাকিল—তিরস্কার করিল-গালি দিল—দুই জনের কৈহ শুনিল না—চলিল। অনেক দূরে গিয়া প্রতাপ ধ্ৰুবলিল “শৈবলিনি, এই আমাদের বিয়ে !" শৈবলিনী বলিল, “আর কেন, এইখানেই ।” প্রতাপ ডুবিল। e শৈবলিনী ডুবিল না । সেই সময় শৈবলিনীর ভয় ইইল, মনে ভাবিল—কেন মরিব ? প্র তাপ আমার কে ? আমার ভয় করে আমি মরিতে পারিব ন! । শৈবলিনী ডুবিল ন-ফিরিল। সস্তরণ করিম। কুলে ফিরিয়া আসিল । তৃতায় পরিচ্ছেদ বর মিলিল যেখানে প্রতাপ ডুবিয়ছিল, তাহার অনতিদূরে একখানি পান্সী বাহিয়া যাইতেছিল । নৌকারোহী এক জন দেখিল—প্ৰতাপ ডুবিল। সে লাফ দিয়া জলে পড়িল। নৌকারোহী চন্দ্রশেখর শৰ্ম্ম । চন্দ্রশেখর সন্তরণ করিয়া, প্রতাপকে ধরিয়া নৌকায় উঠাইলেন। তাহাকে নৌকায় লইয়া তীরে নৌকা লাগাইলেন। সঙ্গে করিয়া প্রতাপকে তা গৃহে রাখিতে গেলেন । * প্রতাপের মাতা ছাড়িল না চন্দ্রশেখরের পদপ্রান্তে পতিত হইয়া, সে দিন তাহাকে আতিথ্য স্বীকার করাইলেন। চন্দ্রশেখর ভিতরের কথা কিছু জানিলেন না । শৈবলিনী প্রতাপকে আর মুখ দেখাইল না । কিন্তু চন্দ্রশেখর তাহাকে দেখিলেন –দেখিয়া বিমুগ্ধ হইলেন । চন্দ্রশেখর তখন নিজে একটু বিপদগ্ৰস্ত। তিনি বত্রিশ বৎসর অতিক্রম করিয়াছিলেন তিনি গৃহস্থ, অথচ সংসারী নহেন। এ পর্যন্ত দারপরিগ্রহ করেন নাই ; দারপরিগ্রহে জ্ঞানোপার্জনের বিঘ্ন ঘটে বলিয়। তাহাতে নিতান্ত নিরুৎসাহী ছিলেন । কিন্তু সম্প্রতি বৎসরাধিককাল গত হইল, র্তাহার মাতৃবিয়োগ হইয়াছিল। তাহাতে দার-পরিগ্রহ না করাই জ্ঞানার্জনের বিপ্ন বলিয়। বোধ হইতে লাগিল । প্রথমতঃ স্বহস্তে পাক করিতে হয়, তাহাতে অনেক সময় যার ; অপায়ন-অধ্যাপনার বিঘ্ন ঘটে। দ্বিতীয়তঃ দেবসেব। আছে, ঘরে শালগ্রাম আছেন। তৎসম্বন্ধীয় কার্য্য স্বহস্তে করিতে হয়, তাহাতে কালাপহত হয়— দেবতার সেবার সুশৃঙ্খলা ঘটে না-গৃহকৰ্ম্মে বিশৃঙ্খলা ঘটে—এমন কি, সকল দিন আহারের ব্যবস্থা হইয়। উঠে না । পুস্তকাদি ছারাইয়া যায়, খুজিরা পান না । প্রাপ্ত অর্থ কোথায় রাখেন, কাহাকে দেন, মনে থাকে ন। । খরচ নাই অথচ অর্থে কুলায় না। চন্দ্রশেখর ভাবিলেন, বিবাহ করিলে কোন কোন দিকে সুবিধা হইতে পারে । কিন্তু চন্দ্রশেখর স্থির করিলেন, যদি বিবাহ করি, তবে সুন্দরী বিবাহ করা হইবে না। কেন না, সুন্দরীর দ্বারা মন মুগ্ধ হইবার সম্ভাবনা । সংসারবন্ধনে মুগ্ধ হওয়া হইবে না । মনের মূখন এষ্টরূপ অবস্থা, তখন শৈবলিনীর সঙ্গে চন্দ্রশেখরের সাক্ষাৎ হুইল । শৈবলিনীকে দেখিয়া সংযমীর রতভঙ্গ হইল। ভাবিয়া চিন্তিয়া, কিছু ইতস্ততঃ করিয়া, অবশেষে চন্দ্রশেখর আপনি ঘটক হইয়া শৈবলিনীকে বিবাহ করিলেন। সৌন্দর্য্যের মোহে কে ন মুগ্ধ হয় ? এই বিবাহের আট বৎসরের পরে এই আখ্যা য়িক। আরম্ভ হইতেছে । - -